তিস্তার পাড় ঘেঁষা দোমোহনী আজ যেন নীরব ইতিহাসের সাক্ষী। অথচ প্রায় আট দশক আগে এই রেল শহরেই গর্জে উঠেছিল শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদের কণ্ঠ। উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদ কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয় এটি বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক উজ্জ্বল ঐতিহাসিক সূতিকাগার। আগামী ১৭ জানুয়ারি কমরেড জ্যোতি বসুর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সেই সংগ্রামী ইতিহাসকে নতুন করে সামনে আনতে প্রস্তুত ময়নাগুড়ি ব্লকের দোমোহনীর মানুষ।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৪০ সালে বিলেত ফেরত তরুণ জ্যোতি বসু জননেতা মুজফফর আহমেদের (কাকাবাবু) চিঠি সঙ্গে নিয়ে প্রথম পা রাখেন দোমোহনীতে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রেল শ্রমিকদের সংগঠিত করাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। সেই সময় রেল শ্রমিক ও চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে যে ঐক্যের সেতু তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা পরবর্তী কালে উত্তরবঙ্গের বামপন্থী আন্দোলনের ভিতকে আরও মজবুত করে। ১৯৪৬-এর ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহের সমর্থনে আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭-এর তেভাগার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—দোমোহনী ও জ্যোতি বসুর নাম ইতিহাসে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
বর্তমান সময়ে যখন বিভাজনের রাজনীতির আড়ালে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজি, কাজ ও অধিকার প্রশ্নকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তখন জ্যোতি বসুর আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির বিপজ্জনক মিশ্রণ যে সামাজিক ও গণতান্ত্রিক সংকট তৈরি করছে, তার বিরুদ্ধে জ্যোতি বসুর আপসহীন ধর্মনিরপেক্ষতা আজও পথ দেখায়। সেই আদর্শকে সামনে রেখেই প্রয়াণ দিবসে আবার একত্রিত হচ্ছেন শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র-যুব এবং সাধারণ নাগরিকরা।
এই উপলক্ষে আগামী ১৭ জানুয়ারি দোমোহনীতে দিনভর নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ৭টায় সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে জনপদ পরিক্রমা করবে ম্যারাথন দৌড়। দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হবে ‘বসে আঁকো’ প্রতিযোগিতা, যেখানে আগামী প্রজন্ম তাদের ভাবনায় সংগ্রামের রঙ তুলে ধরবে। বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী এবং বিকেল ৫টায় রাজ্য আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার বিষয়— ‘ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি মিশিয়ে ফেলার বিপদ ও জ্যোতি বসু’।
সিপিআই(এম)’র ময়নাগুড়ি এরিয়া কমিটির সম্পাদক অপূর্ব রায় বলেন, ‘‘লড়াইয়ের ময়দান থেকেই জ্যোতি বসু মানুষকে একজোট করার শিক্ষা পেয়েছিলেন। আজকের কঠিন সময়ে সেই স্মৃতিই আমাদের পথ দেখাবে।’’ দোমোহনী স্টেশন সংলগ্ন ময়দানে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। স্মৃতির দোমোহনী যেন আবার এক নতুন শপথের সাক্ষী হতে চলেছে।
Comments :0