Editorial

মহা ফ্যাসাদে ট্রাম্প

সম্পাদকীয় বিভাগ

ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন বা ইরানের সঙ্গে চুক্তি কয়েক দিনের মধ্যে হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিন না কেন পরিস্থিতি যে ট্রাম্পের পক্ষে মোটেই সুখকর নয় বরং ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে তা ট্রাম্পের অস্থির আচরণ থেকেই স্পষ্ট। গোটা ব্যাপারটাকে তিনি যতটা সহজে সামাল দেবেন বলে ভেবেছিলেন বাস্তবে তা হচ্ছে না। পরিস্থিতি অনেকটাই তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এদিকে যুদ্ধকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ার অস্বাভাবিক অবস্থা আশু স্বাভাবিক হবার ক্ষীণ লক্ষ্মণও দৃশ্যগোচর না হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি মার্কিন অর্থনীতিতেও নেতিবাচক চাপ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি ঘরোয়া রাজনীতিতেও তিনি বেশ বেকায়দায়। তাই পদে পদে তার ভাষ্য বদলাচ্ছে। আজ যা বলছেন কাল তার উল্টোটা বলছেন। ক্রমাগত বিভ্রান্তির জেরে মানুষের কাছে ট্রাম্পের ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকছে না।
ট্রাম্প ভেবেছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতি ও সমর শক্তির রাষ্ট্রপতি হিসাবে দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলবেন। তাঁর মরজিতেই চলবে দুনিয়া। তিনি যা বলবেন এবং যা করবেন সকলেই তাতে সায় দেবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে তার উল্টো। বিশ্বের প্রায় সব দেশের পণ্যের উপর একতরফা উচ্চ হারে শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে বললেন মার্কিন পণ্যের জন্য সেই সব দেশের বাজার খুলে দিতে হবে এবং শুল্ক কমাতে হবে। জবরদস্তি বিদেশি পণ্যে শুল্ক চাপিয়ে মার্কিন পণ্যের বাজার প্রসারের এই প্রক্রিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে প্রায় সব দেশেরই সম্পর্কে তিক্ততা বাড়তে থাকে। ন্যাটোকে কেন্দ্র করে ইউরোপের সঙ্গে বিরোধ বাড়ে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করেও ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব বাড়ে। বস্তুত দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পরই ট্রাম্প ধরাকে সরা জ্ঞান করে বিশ্বজুড়ে কার্যত জুলুমবাজি শুরু করে দেন। তার ধাক্কায় বিশ্ববাণিজ্যের গতি মন্থর হয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুতর ধাক্কা লাগে।
এরসঙ্গে যুক্ত হয় গাজায় গণহত্যার নায়ক ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানেয়াহুর পৃষ্ঠপোষকতা। গোটা বিশ্ব এই গণহত্যা অভিযানের সমালোচনা ও নিন্দ করলেও ট্রাম্প দৃঢ়ভাবে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়ান এবং অর্থ, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়ে যান। ইজরায়েলি দখলদারি ও আগ্রাসনের অঙ্গ হিসাবেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামনের সারিতে এসে যায় আমেরিকা।
এই যুদ্ধের ফলে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল তথা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে তৈলক্ষেত্রে অচলাবস্থা নেমে আসে। বন্ধ হয়ে যায় হরমুজ প্রণালী। ফলে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। হু হু করে বেড়ে যায় তেলের দাম। দেশে দেশে জ্বালানি মূল্য বেড়ে গিয়ে সাধারণ পণ্যের দামও উর্ধ্বমুখী হয়। আমেরিকা ইউরোপ সহ সব দেশেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। শেয়ার বাজারে ধাক্কা লাগে। দেশীয় মুদ্রার মূল্য পতন ঘটতে থাকে। বিশ্বের এমন অস্থির পরিস্থিতির দায় চাপতে থাকে ট্রাম্পের উপর। তেমনি আমেরিকার মানুষও চাননি এই যুদ্ধ। ঘরে বাইরে প্রবল চাপে বিচলিত ট্রাম্প। চাইছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা সম্মানজনক ফয়সালা করে তিনি জিতেছেন এটা দেখাতে। কিন্তু ট্রাম্পের শর্ত ইরান মানতে নারাজ। আবার ট্রাম্পকে বিপাকে ফেলছেন নেতানেয়াহু। ট্রাম্পের নিষেধ অমান্য করে তিনি গাজায় এবং লেবাননের যথারীতি ধ্বংস চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরান তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনাই বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্প ফের যুদ্ধের হুমকি দিয়েও ইরানকে বাগে আনতে পারছেন না। অবশেষে তাঁর ক্ষোভ আছড়ে পড়ে নেতানেয়াহুর ওপর। ফোনে তাকে ধমক দেবার পরও ট্রাম্পকে অগ্রাহ্য করার পথে হাঁটছেন। এই অবস্থায় ট্রাম্প মহা সঙ্কটে। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তিও বিশ বাঁও জলে। শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে না তাঁকে ফিরতে হয় ইরান থেকে।

Comments :0

Login to leave a comment