Thakurpukur hospital

ঠাকুরপুকুরে অমানবিক ছবি, গেস্টহাউস থেকে উচ্ছেদের পর ফুটপাতেই ক্যান্সার রোগী

রাজ্য কলকাতা

চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্ত থেকে কলকাতায় আসা অসহায় রোগীদের মাথার উপর থেকে সরে গিয়েছে আশ্রয়ের ছাদ। গেস্টহাউসের বিরুদ্ধে নথিপত্র সংক্রান্ত ত্রুটির অভিযোগে পুলিশি অভিযানের পর ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালের সামনে ফুটপাতেই রাত কাটাতে হচ্ছে গুরুতর অসুস্থ রোগী ও তাদের পরিজনদের। এমনই হৃদয়বিদারক ছবি ধরা পড়েছে দক্ষিণ কলকাতার ঠাকুরপুকুর এলাকায়।
সরোজ গুপ্ত ক্যানসার হাসপাতাল, যা ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতাল নামেই পরিচিত, সেখানে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা তো বটেই, ভিন্‌রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকেও বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য আসেন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার কারণে রোগীদের পরিবারের সদস্যদেরও দিনের পর দিন কলকাতায় থাকতে হয়। হাসপাতাল চত্বরে থাকার জন্য তুলনামূলক বেশি খরচ হওয়ায় আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলির অনেকেই হাসপাতালের আশপাশের বেসরকারি গেস্টহাউসে কম খরচে থাকার ব্যবস্থা করেন।
অভিযোগ, সম্প্রতি হরিদেবপুর থানার পুলিশ ওই এলাকার কয়েকটি গেস্টহাউসে অভিযান চালায়। সরকারি নিয়ম মেনে গেস্টহাউসগুলি চলছিল না এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ত্রুটি ছিল এমন অভিযোগে সেগুলি খালি করে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। এরপর গেস্টহাউসে থাকা রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরও বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়।
এরপরই তৈরি হয় চরম মানবিক সংকট।
স্থানীয়দের দাবি, সিউড়ি থেকে চিকিৎসার জন্য আসা এক ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর চোয়ালে সদ্য অস্ত্রোপচার হয়েছে। নাকে লাগানো রয়েছে রাইলস টিউব। সেই অবস্থাতেই তাকে বৃষ্টির মধ্যে ফুটপাতে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। খোলা জায়গায় এইভাবে থাকার ফলে গুরুতর সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে বলে চিকিৎসকদের একাংশের মত।
শুধু ওই রোগীই নন। বাংলাদেশ থেকে বায়োপসি করাতে আসা পেটে টিউমারে আক্রান্ত এক রোগীকেও আশ্রয় নিতে হয়েছে বাসস্টপে। আরও বহু রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের রাত কাটাতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। অভিযোগ, তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার বা ন্যূনতম থাকার ব্যবস্থাও।
পুলিশের বক্তব্য, সরকারি নিয়ম ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র না মেনে ওই গেস্টহাউস গুলি চলছিল। ফলে নিয়ম মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের এই পদক্ষেপ ঘিরে উঠছে মানবিকতার প্রশ্ন। গেস্টহাউস মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও গুরুতর অসুস্থ রোগী ও তাদের পরিজনদের বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করে রাতের অন্ধকারে বাইরে বের করে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রশ্ন উঠছে, বেআইনি বা নিয়মবহির্ভূত ভাবে গেস্টহাউস গড়ে ওঠার দায় কার? দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে এই ধরনের গেস্টহাউসগুলি চলছিল, তা নিয়ে নজরদারির দায়িত্বে থাকা প্রশাসন ও কলকাতা পৌরসভার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি বা গেস্টহাউস মালিকের অনিয়মের খেসারত কেন মুমূর্ষু রোগী ও তাদের পরিবারকে দিতে হবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
চিকিৎসার জন্য বাইরে থেকে আসা রোগীরা কোনও বিলাসিতার জন্য কলকাতায় আসেন না। গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসার প্রয়োজনেই তাদের হাসপাতালে আসতে হয়। ফলে হাসপাতালের আশপাশে কম খরচে থাকার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের জন্য বিকল্প মানবিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর অসুস্থ রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য প্রশাসনের তরফে কোনও বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
ঠাকুরপুকুরের এই ঘটনা তাই শুধু একটি গেস্টহাউস উচ্ছেদের ঘটনা নয় এটি গুরুতর অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের ন্যূনতম মানবিক অধিকার ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment