আরএসএসের শাখা সংগঠন বিদ্যাভারতীর স্কুল বাড়ানোর লক্ষমাত্রা বেঁধে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গোলপার্কে বিদ্যাভারতীর অনুষ্ঠানে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে বিদ্যাভারতীর বিদ্যামন্দির এক হাজারে পৌঁছাক।’ উল্লেখ্য রাজ্যে আট হাজারের বেশি সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়ার মুখে। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা। শিক্ষক নেই, ছাত্র নেই। এই পরিস্থিতিতে সরকারি স্কুল তৈরি করার কথা না বলে আরএসএসের শাখা সংগঠনের বৃদ্ধি করার কথা বললেন মুখ্যমন্ত্রী।
তবে এরাজ্যে আরএসএসকে তার শাখা বিস্তার করতে সাহায্য করেছিল তৃণমূল সরকার। বাঁকুড়ার গঙ্গাজল ঘাঁটি ব্লকে বন্ধ হওয়ার মুখে ৩২টি স্কুল। ৩০-এর নিচে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা থাকার কারণে বন্ধ হওয়ার পথে স্কুলগুলি। উল্টো দিকে ওই ব্লকেই রমরমিয়ে চলছে সরস্বতী বিদ্যামন্দির। আরএসএস পরিচালিত স্কুল সরস্বতী বিদ্যামন্দির।
মাত্র দু’বছরের (২০২১-২৩) মধ্যে মাথা ছাড়া দিয়েছে এই তিনটি স্কুল। তিনটি স্কুলেই পড়ুয়ার সংখ্যা সরকারি স্কুলগুলির চেয়ে বেশি।
বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন বামফ্রন্ট সরকারের সময় বাংলা ভাষার প্রসারে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘৩৪ বছরে বাবার হইলো আবার জ্বর শিখিয়েছে। বন্দে মারতম শেখায়নি।’
পরিসংখ্যান দেখলে জানান যাবে ১৯৭৭ সালের পর রাজ্যে বেড়েছিল সরকার স্কুল। কমে ড্রপ আউটের হারও। মাধ্যমিক পরীক্ষায় বাড়ে ছাত্র ছাত্রীদের পাশের হার। প্রতিটা ব্লকে পাড়ায় তৈরি হয় সরকারি স্কুল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ব্লকে ব্লকে সরকারি স্কুল তৈরি করার কথা না বলে এদিন বলেন বিদ্যামন্দির তৈরি করার কথা।
শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, বিদ্যাভারতী একমাত্র পারে এরাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে। শিক্ষা দপ্তর এবং বিদ্যাভারতী একসাথে কাজ করবে বলেও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বামপন্থীরা প্রথম থেকেই বলে আসছিল এনইপির মাধ্যমে শিক্ষাকে গৈরিকীকরণ করা হচ্ছে। এবার আর এনইপি নয় সরাসরি আরএসএসের সাথে কাজ করার কথা ঘোষণা করলো নির্বাচীত একটি সরকার।
শুভেন্দু বলেন, ‘ইতিহাস বইতে টাটাকে তাড়ানোর ইতিহাস লেখা আছে। শ্যামাপ্রসাদ, প্রণবানন্দদের কথা লেখা নেই।’ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইতে টাটাকে তাড়ানোর কথা লেখা আছে। সেখানে মমতা আর রাজনাথ সিংয়ের ছবিও আছে। মজার বিষয় বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী যখন এই কথা গুলো বলছেন তখন তার পাশে ছিলেন রাজনাথ সিং।
শুধু ইতিহাস নয়। রাজ্যের স্কুল শিক্ষার গোটা পাঠ্যক্রমেই বদল এনেছিল মমতা ব্যানার্জির সরকার। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আলাদা করে বিজ্ঞান, ভুগোল, ইতিহাস বলে কোনও বিষয় নেই। সব একসঙ্গে করে একটিই পাঠ্য বই হয়েছে যার নাম ‘পরিবেশ’। সেখানে আবার এক একটি অধ্যায় গল্পের ছলে লেখা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণি থেকেই একজন পড়ুয়া ইতিহাস, ভুগোল, বিজ্ঞানের মতো বিষয় আলাদা আলাদা ভাবে পড়তে শুরু করে। অল্প অল্প করে তাদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি হতে থাকে। কিন্তু আমাদের রাজ্যে উল্টো। ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে একজন ছাত্র জানতে পারছে আকাশ গঙ্গা কি? মুঘল সাম্রাজ্য কে কবে প্রতিষ্ঠা করে? বৃষ্টি কি ভাবে হয়? বায়ুমন্ডল কি?
বেসরকারি স্কুলেও কি ষষ্ঠ শ্রেণিতে গিয়ে এই সব জানছে ছাত্রছাত্রীরা?
না। একদমই নয়।
তারা অনেক আগে থেকেই এই সব বিষয় জানছে। তারা ‘সিভিক্স’ আলাদা ভাবে পড়ে নিজেদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি করছে দেশ, সমাজ, রাজনীতির মতো বিষয়ে।
আমাদের রাজ্যে আট হাজার বেশি স্কুল বন্ধ হওয়ার মুখে।
আর এই সময়ের রাজ্যে মাথা চাড়া দিয়েছিল আরএসএসের স্কুল সরস্বতী বিদ্যামন্দির।
কী পড়ানো হয় এই স্কুলে? মাধ্যমিক উচ্চ-মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রম মেনে কী পড়ানো হয়?
না।
একই পাঠ্যক্রম নয়। আরএসএসের পাঠ্যক্রম চলে সেখানে। ইতিহাস, ভুগোল, বিজ্ঞান, ভুগোল, অঙ্কের মতো সব বিষয় পড়ানো হয়। কিন্তু তা আরএসএস’র তৈরি করা সিলেবাসে। যেই সিলেবাসে নেই কোন বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা।
অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ্যক্রম যদি দেখা যায় তাহলে ওপর থেকে দেখলে মনে হবে বাকি পাঁচটা বোর্ডের মতোই সিলেবাস। কিন্তু না।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ভিত্তিক বা পর্যায় ভিত্তিক কোন অধ্যায় নেই। আছে শুধু একটা অধ্যায়। যেখানে ১৮৭০-১৯৪৭ পর্যন্ত গোটা স্বাধীনতা আন্দোলনকে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে!
মাত্র একটি অধ্যায়। স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীর ভূমিকা কি? সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ কী করল? চিত্তরঞ্জন দাস, সূর্য সেন, ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদের ভূমিকা সব কিছু একটি অধ্যায়ে।
অন্যদিকে আমাদের রাজ্যের বা সিবিএসই, আইএসসি বোর্ডর অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের দিকে দেখি তাহলে দেখা যাবে অন্য চিত্র। ঘটনা ভিত্তিক বা পর্যায়ক্রমে অধ্যায়। যা পড়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্পর্কে একটা সম্যক ধারনা তৈরি হবে একজন ছাত্র বা ছাত্রীর মনে।
ভুগোলে আরএসএস কি পড়াচ্ছে ? অষ্টম শ্রেণিতে পড়ানে হচ্ছে কৃষি, শিল্প, মানব সম্পদ। যা অন্যান্য জায়গায় সাধারণত পঞ্চম শ্রেণিতে পড়িয়ে থাকা হয়। সাধারণত অষ্টম শ্রেণিতে জলবায়ুর পরিবর্তন, পৃথিবীর অন্দর, বিভিন্ন মহাদেশের সম্পর্কে পড়ানো হয়।
জীবন বিজ্ঞানে আরএসএস পড়াচ্ছে কী ভাবে ফসল ফলাতে হয় এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ কি ভাবে করা যেতে পারে।
রাজ্যের সরকারি স্কুল এবং আরএসএস পরিচালিত স্কুলের পাঠ্যক্রমে আকাশ পাতাল ফারাক। এবার সেই ফারাক তুলে দিতে চাইছে শুভেন্দু অধিকারী। শিশু মনের যাতে কোন বৈজ্ঞানিক বিকাশ না হয়, মানুষের মন থেকে যাতে যুক্তি বোধকে প্রথম থেকেই শেষ করে দেওয়া যায় সেই দিকেই এগিয়ে যেতে চাইছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। আর তাই এদিনও ‘গেরুয়া তান্ডব’এর সমালোচনা করলেন কিন্তু সংবাদপত্রের দপ্তরে হওয়া ঘটনার কোন প্রতিবাদ করলেন না। যাদবপুর নিয়ে ফের সরব হলেন। বললেন ‘ফ্রী প্যালেস্তাইন’ লেখা যাবে না। আসলে বিশ্বের মুক্তিকামী, প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী মানুষকে দমিয়ে দিতে চাইছে এরাজ্যের ফ্যাসিস্ট সরকার।
Suvendu Adhikari
সরকারি স্কুল নয়, আরএসএসের ‘বিদ্যামন্দির’ বাড়াতে চায় শুভেন্দু
×
Comments :0