দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনের ৫০ দিনেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এবছরের বর্ষা এখনও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি। দীর্ঘ বিরতি এবং অসম বৃষ্টিপাতের জেরে দেশের সামগ্রিক বর্ষা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। কৃষিনির্ভর ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
পুনের সেন্টার ফর সিটিজেন সায়েন্স-এর সচিব এবং বর্ষা বিষয়ক গবেষক ময়ূরেশ প্রভুণের মতে, ১ জুন থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ২১ শতাংশ কম হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তবে শুধু জাতীয় পরিসংখ্যান দেখলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবছর বৃষ্টির বণ্টন অত্যন্ত অসম। দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ এলাকা বৃষ্টির ঘাটতি বা তীব্র ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, কোনকান উপকূলের মতো কয়েকটি অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে বহু জেলা খরার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি।
প্রভুণে জানান, মহারাষ্ট্রে সামগ্রিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের কাছাকাছি হলেও জেলা-ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের ২১টি জেলায় এখনও বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে। ফলে বহু কৃষিপ্রধান অঞ্চলে জলসংকট অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবছরের দুর্বল বর্ষার প্রধান কারণ এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠজলের অস্বাভাবিক উষ্ণতা ভারতীয় মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দেয়।
প্রভুণে জানান, এবছর এল নিনোর শক্তি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়েই নিনো ৩.৪ অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বেড়েছে, যেখানে সাধারণত এতটা বৃদ্ধি নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে দেখা যায়।
এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টিবাহী নিম্নচাপের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে। জুন-জুলাই মিলিয়ে সাধারণত অন্তত পাঁচটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও এবছর হয়েছে মাত্র দুটি। গত বছর একই সময়ে ৮ থেকে ১০টি নিম্নচাপ তৈরি হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে ম্যাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন (MJO)-এর মতো বৃষ্টিবাহী মেঘ ভারত মহাসাগরের বদলে প্রশান্ত মহাসাগরেই সক্রিয় থাকছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের বর্ষার উপর।
স্কাইমেট ওয়েদারের আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট মহেশ পালাওয়াত জানান, জুন মাসের শেষে সারা দেশে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ায় ঘাটতি কমে ১৯ শতাংশে নেমে এলেও পরে 'ব্রেক মনসুন'-এর কারণে তা আবার বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছে যায়।
তবে ২০ জুলাইয়ের পর মৌসুমি অক্ষরেখা হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে সরে আসায় উত্তর ভারত, গঙ্গা সমভূমি, মধ্য ভারত এবং পশ্চিম উপকূলের কোনকান, গোয়া ও উপকূলীয় কর্ণাটকে বৃষ্টিপাতের পুনরুজ্জীবন ঘটে।
বর্তমানে বর্ষা সক্রিয় থাকায় জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত উত্তর ও মধ্য ভারতে ভালো বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন মহেশ পালাওয়াত। এতে খরিফ ফসল কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
তবে তার আশঙ্কা, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে, যদিও পূর্ব ও মধ্য ভারতের অনেক অংশে বৃষ্টিপাত মোটামুটি স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ময়ূরেশ প্রভুণের ব্যাখ্যায়, 'ব্রেক মনসুন' এমন একটি পর্যায়, যখন ভারী বৃষ্টিপাত মূলত হিমালয় ও তার পাদদেশে সীমাবদ্ধ থাকে, আর দেশের বাকি অংশে বৃষ্টি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
সাধারণত ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (IOD) বা ইন্ডিয়ান নিনা এল নিনোর প্রভাব কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে এ বছর ইতিবাচক আইওডি আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের আগে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে চলতি বর্ষায় তার বিশেষ প্রভাব পড়বে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্ষার প্রথম ৫০ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষজ্ঞদের মত, ২০২৬ সালের বর্ষা অনিশ্চয়তা, অসম বৃষ্টিপাত এবং এল নিনোর প্রভাবের কারণে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। জুলাইয়ের শেষের সক্রিয় বর্ষা কিছুটা স্বস্তি দিলেও আগামী দুই মাস জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি পরিকল্পনায় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া জরুরি বলে মত আবহাওয়াবিদদের।
Monsoon
দেশে বৃষ্টির ঘাটতি ২১% — শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে উদ্বেগ বাড়ছে
×
Comments :0