ELECTRICITY BILL

সর্বনাশের রাস্তা তৈরি করছে বিদ্যুৎ বিল

উত্তর সম্পাদকীয়​

Electricity ammendment act BJP Privatisation

বিশ্ব জুড়ে পুঁজিপতি ও পুঁজিপোষিত রাজনীতিকদের মধ্যে চলছে চমৎকার বোঝাপড়া। তারই মাধ্যমে পুঁজিপতিরা বৈধ-অবৈধ উপায়ে সেইসকল রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে অবাধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করার বিনিময়ে তাদের ক্ষমতায় টিঁকিয়ে রাখে। সারা দুনিয়াটাই আজ খোলাবাজার, বিভিন্ন দেশের সীমারেখা লুপ্ত। বিকিকিনির বাজারে সবকিছুই পণ্য। পরিষেবা নামক শব্দটা থাকবে শুধু অভিধানে সেটা অত্যাবশকীয় হলেও।


জলের যদি এক নাম হয় জীবন তবে সভ্যতা ও উন্নতির সোপানের অন্যতম উপাদান হলো বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অগ্রগতি ঘটানো ও গ্রাহক পরিষেবা সুনিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। 


আমাদের দেশে প্রথম বিদ্যুৎ আইন প্রণীত হয় ১৯১০ সালে। সেইসময় শহরের কিছু এলিট সম্প্রদায় ছিলেন বিদ্যুৎ ভোক্তা। সে আইনে আপামর জনগণের স্বার্থ ছিল দৃষ্টির আড়ালে। দেশের মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে স্বাধীনোত্তর ভারতে প্রণীত হয় বিদ্যুৎ আইন, ১৯৪৮। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুলভে দেশের গরিব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো। এই সময়ে আম্বেদকর বলেছিলেন, খাদ্য ও জলের মতো বিদ্যুৎ মৌলিক পরিকাঠামো যা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে রাখা হলো কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ তালিকায়। রাজ্যে রাজ্যে গড়ে উঠল রাজ্যের তত্ত্বাবধানে বিদ্যুৎ পর্ষদ। 


স্বাধীন ভারতে বি আর আম্বেদকর, প্রশান্ত চন্দ্র মহালানবিশ, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ জাতীয় বিদ্যুৎ নীতি গ্রহণ ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে। নীতি নির্ধারকরা বুঝেছিলেন বিদ্যুৎ উৎপাদন করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিতে যে দাম পড়বে সেই অর্থ গরিব- নিম্নবিত্তরা দিতে পারবেন না। সুতরাং দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে গ্রহণ করা হলো পারস্পরিক ভরতুকির ব্যবস্থা।  


এই পদ্ধতি হলো দরিদ্র মানুষ, ক্ষুদ্র কৃষক যারা কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তারা বিদ্যুতের দাম কম দেবেন এবং যারা অনেক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, বিত্তবান তারা বিদ্যুতের দাম বেশি দেবেন। এটাই হলো পারস্পরিক ভরতুকি ব্যবস্থা। না লাভ না ক্ষতি এই নীতিতেই বিদ্যুৎ পর্ষদ চলবে নতুবা বিদ্যুতের ব্যবহার প্রসারিত হবে না, এটিই ছিল মূল ভাবনা। এই ব্যবস্থা গ্রহণের ফলেই গ্রাম-গ্রামান্তরে বিদ্যুতের ব্যবহার বিস্তৃত হতে পেরেছে। 


এছাড়াও এই বিদ্যুৎ নীতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে, ফসল উৎপাদনে কৃষকদের সাহায্যকারী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কৃষকেরা কৃষিকাজে যে সেচ পাম্প ব্যবহার করেন সেখানে বিদ্যুতের দাম কম হওয়ার ফলে একফসলা জমি তিনফসলা হয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতায় উল্লেখযোগ্য স্থান অর্জন করেছিল দেশ, কৃষিজাত পণ্য থেকেছিল অনেকটাই ক্রয়সাধ্যে। গ্রামের দলিত, আদিবাসী সম্প্রদায়, দুঃস্থ মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন স্বল্পমূল্যে।  স্কুল,কলেজ,হাসপাতালে বিদ্যুতের দাম কম থাকার ফলে সাধারণ মানুষ প্রভূত উপকৃত হতেন। 


নয়ের দশকে, নয়া উদারীকরণের ঝোড়ো হাওয়ার তাণ্ডব আছড়ে পড়ল বিদ্যুৎ শিল্পেও। ১৯৯৮ সাল, ব্যবসাদাররা বুঝে নিল মাসুল নির্ধারণে যতদিন রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ করার অধিকার থাকবে অবাধ মুনাফায় সেটা প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির জন্য তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। 

ইতিমধ্যে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার চলে আসে। মাসুল নির্ধারণে রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ বিচ্ছিন্ন করতে নতুন একটি আইন সংযোজিত হয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন আইন, ১৯৯৮। এই আইনের মধ্য দিয়ে বলা হলো বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন হচ্ছে একটি বিচারবিভাগীয় স্বয়ংশাসিত সংস্থা। প্রত্যেক রাজ্যকে এখন থেকে রাজ্য বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন করতে হবে। যে রাজ্য এই সংস্থা গঠন করবে না তাকে কেন্দ্রীয় সরকার আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য থেকে বঞ্চিত করবে। রাজ্যের এই কমিশন বিদ্যুতের দাম স্থির করবে, পারস্পরিক ভরতুকি ব্যবস্থা থাকবে না ইত্যাদি জনবিরোধী নীতি গৃহীত হলো। 

সাল ২০০৩, অটলবিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার। লোকসভা ও রাজ্যসভায় বামপন্থীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সংখ্যাধিক্যের জোরে বিজেপি-কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেস সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি জনস্বার্থ বিরোধী বিদ্যুৎ আইন, ২০০৩ পাশ করিয়ে নিল সম্পূর্ণ  বেসরকারিকরণের লক্ষ্য নিয়ে। 


 তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তি ছিল রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ কেবল ক্ষতির মুখ দেখছে, ক্ষতির পরিমাণ সারা দেশে ২৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছছে। বলা হলো, নয়া বিদ্যুৎ আইনের মধ্য দিয়ে বেসরকারি সংস্থার প্রবেশ ঘটলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে,  ক্ষতির পরিমাণ কম হবে, পরিষেবার উন্নতি ঘটবে এবং বিদ্যুতের দাম হ্রাস পাবে। এটা যে নিতান্তই বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর  ব্যাখ্যা এবং পুঁজিপতিদের মুনাফা স্ফীত করার উদ্দেশ্য নিয়ে আইন সংশোধন করা হয়েছিল তার প্রমাণ মেলে বিগত ২০০৩ থেকে ২০২২-এর মার্চ পর্যন্ত ১৯ বছরে দেশের বণ্টন কোম্পানিগুলির দেনা রয়েছে ১.১ লক্ষ কোটি টাকা এবং বণ্টন কোম্পানিগুলির সরকারের কাছ থেকে ভরতুকি ও বিল বাবদ পাওনা ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ আইন, ২০০৩ প্রণয়নের পর ১৯ বছরে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ বেসরকারি মালিকানাধীন হয়েছে। এই সমস্ত বেসরকারি সংস্থা বিদেশ থেকে কয়লা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমদানির দাম বেশি করে দেখিয়ে বণ্টন কোম্পানিগুলোর থেকে বেশি দাম লুট করছে যার মাসুল গুনতে হচ্ছে রাজ্যের বণ্টন কোম্পানি ও সাধারণ মানুষকে। গ্রাহকদের পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেশি অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। 


বিদ্যুৎ শিল্পকে বেসরকারিকরণের মূল পরামর্শ দাতা ছিল বিশ্বব্যাঙ্ক। বিদ্যুৎ শিল্পের সার্বিক অধোগামিতা দেখে তাদের কিছুটা বোধদয় হলো। তারা বলল, “এককথায়, দক্ষতা ও গুণমান বজায় রেখে গ্রাহক পরিষেবা প্রদানের প্রশ্নে বেসরকারি ও সরকারি সংস্থার মধ্যে কোনও  উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি”। 


বিদ্যুৎ আইন, ২০০৩ প্রণয়ন করে ১৯১০, ১৯৪৮, ১৯৯৮-এর সমস্ত বিদ্যুৎ আইনকে নস্যাৎ করা হলো। যেটুকু জনকল্যাণমুখী দৃষ্টিতে বিদ্যুৎ নীতি পরিচালিত হচ্ছিল তা বিপরীতগামী হতে শুরু করল। 
কথায় বলে,‘দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না ’।
জন্মলগ্ন থেকে আরএসএস দেশের মানুষের সাথে, দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। দেশপ্রেমের নাম করে দেশের সমস্ত সম্পদ লুট করে কর্পোরেট পুঁজির হাতে তুলে দিতে বদ্ধপরিকর তাদের রাজনৈতিক দল বিজেপি। জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সব বেচে দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। বিদ্যুৎ শিল্পের যাবতীয় সম্পত্তি আদানি, আম্বানি, টম-ডিক-হ্যারিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল, ২০২০ যা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল, ২০২২, আইনে পরিণত করতে মরিয়া অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজ্যে রাজ্যে সিআইটিইউ পরিচালিত ইউনিয়ন শুধু নয়, ভারতের জাতীয় বিদ্যুৎ কর্মী ফেডারেশন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারদের জাতীয় সমন্বয় কমিটি তথা দেশের লক্ষ লক্ষ বিদ্যুৎ কর্মী, ইঞ্জিনিয়ার এই বিলের বিরোধিতা করে রাস্তার আন্দোলনকে প্রশস্ত করছেন।

কী আছে বিদ্যুৎ বিল, ২০২২-এ ?

বিদ্যুৎ আইন, ২০০৩ এ বলা ছিল বেসরকারি কোম্পানিগুলি তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। এর মানে হলো নতুন যে কোম্পানি আসবে ব্যবসা করতে তাকে বিনিয়োগ করতে হবে যেমন মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে করা হয়। নয়া বিলে বলা হচ্ছে বিদ্যুতের সরকারি নেটওয়ার্ককে বিনা বিনিয়োগে যে কোনও ব্যবসাদার ব্যবহার করতে পারবেন। ৩৩ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার দেশের বিদ্যুতায়িত এলাকার ৯৯ শতাংশ রাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রিত বণ্টন কোম্পানির রাজ্য সরকারের অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা করবে কর্পোরেট পুঁজি। 


“এরিয়া অব সাপ্লাই’’- এ কোনও বিধিনিষেধ না থাকার ফলে শুধু লাভজনক ঘন জনবসতি পূর্ণ এলাকায় পুঁজি হাঙরেরা বিদ্যুৎ দেবে মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে, রাজ্য সরকারের হাতে থাকবে গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক ও প্রান্তিক মানুষ। এক্ষেত্রে গ্রামের প্রান্তিক মানুষ সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ভরতুকি পেলেও বিদ্যুৎ কেনার আর্থিক ক্ষমতা তার থাকবে না। দেশের কৃষক সমাজ এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই নয়া বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সংগ্রাম গড়ে তুলে ছিলেন। 


এই সর্বনাশা বিল আইনে পরিণত হলে গরিব- প্রান্তিক মানুষের ঘরে নেমে আসবে নিকষ কালো অন্ধকার। মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাবে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে, রুদ্ধ হবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি, সভ্যতার বিকাশের বদলে বর্বরোচিত অধ্যায় রচিত হবে। নেমে আসবে ক্ষুধা,দারিদ্র।  

এই সর্বনাশ রুখতে আবারও দেশের বিদ্যুৎকর্মী, ইঞ্জিনিয়ার এবং দিল্লির পার্শ্ববর্তী রাজ্যের মানুষ  আগামী ২৩নভেম্বর দিল্লির রাজপথকে কম্পিত করে তুলে মোদী সরকারকে জানান দিতে প্রস্তুত, হয় তুমি নীতি পালটাও নতুবা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আগামীদিনে।  এ লড়াই শুধুমাত্র বিদ্যুৎকর্মী, ইঞ্জিনীয়ারদের নয়, দেশের আপামর মানুষের। প্রয়োজন প্রতিটি মহল্লার বিদ্যুৎ গ্রাহক সহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কনভেনশন, পথসভা, মিছিল সংগঠিত করে সর্বনাশা বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা। আওয়াজ তুলতে হবে: “ বিদুতের অধিকার – মানবিক অধিকার, এ অধিকার ছাড়ছি না- ছাড়ব না ”।

 

0 Comments

Login to leave a comment