Post editorial

সমাজজীবনে নয়া উদারবাদী নীতির প্রভাব এবং আমাদের দায়িত্ব

উত্তর সম্পাদকীয়​

অচিন্ত্য মল্লিক


সম্প্রতি কেন্দ্রের সরকার বর্তমান অর্থ বছরের বাজেট পেশ করেছেন। আর এই বাজেট নিয়ে চলছে দেশজুড়ে নানা আলোচনা৷ সংবাদমাধ্যমের একাংশ (বৃহৎ অংশ) সহ পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষক অর্থনীতিবিদরা তারস্বরে ঢাক পেটাচ্ছেন, এই বাজেট দেশের বৃহত্তর অংশের মানুষের সমৃদ্ধি এবং দেশকে অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবার নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। বিরোধীরা এই বাজেটকে জনবিরোধী এবং দিশাহীন বলে বর্ণনা করেছেন। এই বাজেটকে জনগণের সাথে নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) ৷ মূল কথা হলো কর্পোরেটদের তৈরি, কর্পোরেটের স্বার্থেই এই বাজেট ৷
বর্তমান বাজেট নিয়ে কোনও বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয় ৷ যে অর্থনৈতিক নীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হয়, সেই নীতির বাধ্যবাধকতা অনিবার্যভাবেই বাজেটেও প্রতিফলিত হবে, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই মূল মর্মবস্তুকে বাদ দিয়ে কোনও আলোচনাই প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি গড়ে তুলতে পারে না। কোন অর্থনৈতিক নীতির উপর ভিত্তি করে আমাদের দেশ পরিচালিত হচ্ছে, এটাই মূল প্রশ্ন।
অর্থনৈতিক পথ 
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক পথকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। বিগত শতাব্দীর মধ্য পঞ্চাশ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভরশীলতা। দ্বিতীয় পর্যায় হলো সোভিয়েত রাশিয়ার বিপুল অগ্রগতির ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির ওপর নির্ভরশীলতা বেশ খানিকটা হ্রাস পায়। ১৯৯০-৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পরে দুনিয়ার ভারসাম্য সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে যাওয়ার ফলে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক নীতি সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে সাথে কর্পোরেটের স্বার্থবাহী নয়া উদারবাদী নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং তারপর থেকে টানা সাড়ে তিন দশক এই নীতির দ্বারাই পরিচালিত হয়েছে আমাদের দেশ। 
ভিত্তি ও উপরিকাঠামো 
মার্কসবাদ-লেনিনবাদ আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিই হলো প্রধান এবং তা সমাজের উপরিকাঠামোকে প্রভাবিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে। আবার কখনো কখনো উপরিকাঠামোও ভিত্তিকে প্রভাবিত করে। এই শিক্ষা থেকে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্ত আসতে পারি, অর্থনৈতিক নীতি অর্থনীতি ছাড়াও বৃহত্তর সমাজজীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। স্বভাবতই রাজনীতিতে, সামাজিকক্ষেত্রে, শিক্ষা, সংস্কৃতি সহ ব্যক্তি মননেও নানাভাবে তা প্রতিফলিত হয় ৷
পুঁজিবাদের সঙ্কট চিরস্থায়ী 
পুঁজিবাদ কখনো সঙ্কট থেকে মুক্ত হতে পারে না। সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পেতে পুঁজিবাদ নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করে৷ নয়া উদারনৈতিক নীতির মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের প্রয়াস নিলেও ক্রমশ পুঁজিবাদ অনিবার্য সঙ্কটের জালে জড়িয়ে পড়ছে। ২০০৮ সালের পর থেকে বিশ্ব পুঁজিবাদ ভয়ঙ্কর সঙ্কটে জর্জরিত এবং তা ক্রমবর্ধমান। বর্তমান সময়ে পুঁজিবাদের স্বরূপ হলো ফাটকা পুঁজিতে রূপান্তর ৷ যাকে বলা হচ্ছে ধান্দার ধনতন্ত্র। এককথায় লুটেরা পুঁজিবাদ ৷
ধান্দার ধনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য 
লুটেরা পুঁজির বৈশিষ্ট্যই হলো উৎপাদনে পুঁজির বিনিয়োগ নয়, মুনাফার লক্ষ্যে দুনিয়াজুড়ে অবাধে ছুটে বেড়ানো এবং বিভিন্ন দেশের সম্পদকে লুট করা। আর এই লুঠ করার পথকে মসৃণ করতেই দুনিয়ার দেশে দেশে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তির উদ্ভব। এই পথ বেয়েই আমাদের দেশেও অতি দক্ষিণপন্থার আবির্ভাব ৷
আমাদের দেশে নয়া উদারবাদী নীতি লাগু হয় ১৯৯১ সালে। তারপর থেকেই দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলির ওপর আক্রমণ শুরু হয়। ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে এই ক্ষেত্রে লাগামছাড়া আক্রমণ শুরু হয়েছে। লগ্নিপুঁজির স্বার্থ রক্ষাই এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর সেই কারণেই তো খনি থেকে ইস্পাত শিল্প, রেল, উড়ান ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা শিল্পও কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত হচ্ছে। বিমাক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বিনিয়োগের অধিকার দেওয়া হচ্ছে।
এসবের মধ্যে দিয়ে দেশে বৈষম্য বাড়ছে দ্রুতহারে। কর্পোরেটদের মুনাফা বৃদ্ধির গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলছে মজুরি সঙ্কোচন। লক্ষ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ নেই। ঠিকা শ্রমিক, ক্যাজুয়াল শ্রমিকদের অল্প মজুরিতে নিয়োগ করে কাজ করানো হচ্ছে। শ্রমিকদের ১০-১৪ ঘণ্টা কাজ করার ফতোয়া জারি করা হচ্ছে।  নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান। কর্মহীনদের সংখ্যা সমস্ত রেকর্ডকে অতিক্রম করে গেছে। কৃষিক্ষেত্র ভয়ঙ্করভাবে বিপন্ন। কৃষিক্ষেত্রকেও কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ৷
এই অর্থনীতির শেষ পথ 
এই পরিস্থিতিতে সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন সংগ্রামের ব্যাপ্তি ঘটায় নির্মমভাবে তাকে দমন করা হচ্ছে৷ প্রকৃত বাস্তবে দুনিয়াজুড়ে যে নতুন চেহারায় ফ্যাসিবাদী পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে, আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নেই৷ আমাদের দেশ সহ দুনিয়াজুড়ে নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষায় তৎপর ৷
আমাদের দেশে ফ্যাসিস্তধর্মী আরএসএস পরিচালিত যে বিজেপি দল সরকার পরিচালনা করছে কার্যত তা কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক শক্তির মিশেলে পরিচালিত হচ্ছে। হিন্দুত্বের নাম করে দেশের ইতিহাস, যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানকে বিকৃত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
ফ্যাসিবাদ শুধু আক্রমণের কিংবা দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়েই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে এমনটা নয়। এমনকি ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদী শক্তিও হিটলার কিংবা মুসোলিনির মানুষের মনন, চিন্তা-চেতনাকেও দখল নেওয়ার ইতিহাস আমাদের অজানা নয়৷ এ কারণেই তো লেনিন এবং গ্রামসিকে বারবার হেজিমনি বা অধিপত্যবাদের কথা বলতে হয়েছে। বর্তমান নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের মগজের দখল নিতে অনেক বেশি তৎপর ৷
মগজ দখলে তৎপর 
নয়া ফ্যাসিবাদের পরিচালকেরা জানে, আমাদের মতো দেশে তাদের নীতিতে সৃষ্ট সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে মানুষের ক্রমবর্ধমান আন্দোলনকে দমন-পীড়ন করা ছাড়াও একই সঙ্গে কিছু ‘জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি’ মানুষের সামনে হাজির করতে হবে। আর এই জন্য নানানভাবে অনুদানের রাজনীতিরও আশ্রয় নেয়, যা আমাদের দেশে, আমাদের রাজ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। এ ধরনের কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে তিনটি লক্ষ্য তারা পূরণ করতে চায়।
(১) নানা ধরনের অনুদানের মধ্যে দিয়ে (যার সাথে প্রকৃত উন্নয়নের কোনও সম্পর্ক নেই) মানুষকে আকৃষ্ট করে উদারনীতিবাদের আক্রমণাত্মক চেহারাকে ভুলিয়ে দিতে চায় ৷ 
(২) এসবের মধ্যে দিয়ে তারা মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সরকার গরিবের বন্ধু এবং কর্পোরেটের স্বার্থরক্ষাকারী চরিত্রকে আড়াল করতে চায় ৷ 
(৩) এই চটকদারি রাজনীতির মধ্যে দিয়ে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি সহ সামগ্রিক সঙ্কটের বিরুদ্ধে মানুষের আন্দোলন সংগ্রামের পরিবর্তে তাদের জীবনকে কর্মহীন করে সরকার নির্ভর করে তুলতে প্রয়াসী হয়। 
সব মিলিয়ে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, এর ফলে উদারনীতিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে দেশজুড়ে দুর্নীতি একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। উদারনীতির সাথে দুর্নীতি কার্যত হাত ধরাধরি করে চলে। আমাদের রাজ্যে দুর্নীতি একটা প্রতিষ্ঠানিক চেহারা নিয়েছে। শাসকদলের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। মন্ত্রী, বিধায়ক থেকে সরকারের উচ্চপদস্থ আমলারা হয় জেলে না হয় বেলে ৷
বর্তমানের এই নয়া উদারনৈতিক ব্যবস্থা দেশের মানুষকে করে তুলছে চূড়ান্ত আত্মকেন্দ্রিক। সামাজিক স্বার্থ বা জনগণের স্বার্থের বিপরীতে মানুষকে ভোগবাদী দর্শনের শিকারে পরিণত করছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত কর্মীবাহিনীকেও আত্মকেন্দ্রিকতা প্রভাবিত করছে কিনা, এই বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার। মার্কস ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কিভাবে ‘পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ককে পণ্যায়িত করে।’আর আজকের পুঁজিবাদের বিকাশের বর্তমান স্তরে নয়া উদারনীতির সময়ে দুনিয়ার মানুষের মন ও মগজের ওপর আধিপত্য করছে পুঁজি ৷ নৈতিকতা-অনৈতিকতার ধারণার মধ্যে পার্থক্য হারিয়ে যাচ্ছে৷ সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রিত বিনোদন কর্পোরেট পুঁজির দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সব ধরনের গণমাধ্যম, যা সাধারণ মানুষের উপলব্ধিতে সবসময়ে থাকছে না। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি পুঁজির আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী করছে ৷
মতাদর্শের প্রচার চাই
সামগ্রিকভাবে এই প্রেক্ষাপটে মতাদর্শগত প্রচারের গুরুত্ব আমাদের অনুধাবন করতে হবে। পুঁজিবাদের বর্তমান স্তর নয়া উদারবাদ মানুষকে সঙ্কট থেকে মুক্ত করতে পারে না, এই চেতনা মানুষের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলন এবং শ্রেণি আন্দোলনকে প্রসারিত করতে হবে। নয়া উদারবাদী নীতির ফলে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সবকিছু যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, সেগুলিকে চিহ্নিত করে আন্দোলন গড়ে তুলতে  হবে। স্থানীয় আদায়যোগ্য দাবির আন্দোলনের লক্ষ্যে মানুষের ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, সাথে সাথে সুস্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বোধও মানুষের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। 
হেজিমনি বা আধিপত্যের প্রশ্নটি বর্তমান সময়ে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের চেতনা ও মগজের আধিপত্য থেকে উদারবাদকে হটিয়ে বিকল্প অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সমাজ চেতনার আধিপত্যের দখল নিতে মতাদর্শের প্রচারকে তীব্রতর করে তুলতে হবে ৷ 'সমাজতন্ত্রই একমাত্র বিকল্প', এই চেতনায় মানুষকে সমৃদ্ধ করতে সর্বব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করার লক্ষ্যেই রুটিরুজি, জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামজিক সুরক্ষা, ফসলের ন্যায্য দাম, সঠিক মজুরি ইত্যাদির দাবিতে, সর্বগ্রাসী দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং আশু দাবি আদায়ের লড়াইতে সব মানুষকে শামিল করতে হবে ৷
 

Comments :0

Login to leave a comment