মৃত্যুর পর মায়ের চোখ দান করেছিলেন। মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ প্রাপ্তি স্বীকারও করেছে। অথচ বিজ্ঞানকর্মী এবং পরিবেশ কর্মী আমির চাঁদ শেখ ও তার পরিবারকেই পাঠানো হয়েছে জেলে। তীব্র প্রতিবাদে সকলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বুধবার কলকাতার মৌলালি মোড়ে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে গণদর্পন, বিজ্ঞানমঞ্চ, অঞ্জনা নদী বাঁচাও কমিটি সহ অন্যান্য বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠনগুলি।
মায়ের ইচ্ছাকে সন্মান জানিয়ে মরণোত্তর চক্ষুদানের সিদ্ধান্ত নেন কৃষ্ণনগরের আমির চাঁদ শেখ এবং তাঁর পরিবার। চক্ষুদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়ম মেনেই করা হয় শেষকৃত্য। তারপরেও ওই পরিবারে উপর চড়াও হয় ওই এলাকার মৌলবাদীদের একাংশ, পরিবারটির উপরে আনা হয় অঙ্গপাচারের অভিযোগও। এমনি উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে তার জেরে খবর দেওয়া হয় স্থানীয় পুলিশকে। বাঁচানোর নাম করে ওই আমির চাঁদ শেখ সহ পরিবারটিকেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সমস্ত নথি পেশ করার পরেও দেওয়া হয়নি জামিন।
এদিন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চ, গণদর্পন, অঞ্জনানদী বাঁচাও কমিটি, কিশোর বাহিনী, পিআরসি, চিকিৎসক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ সহ ৩৭টি বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠনের কর্মীরা।
গোটা ঘটনাটির প্রতক্ষ্যদর্শী দীপক রায় বলেন, "রবিবার সকালে আমির চাঁদ শেখের মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে আমরা যত দ্রুত সম্ভব সেখানে পৌঁছাই। তখন আমির চাঁদ মায়ের কর্নিয়া দানের জন্য উৎসাহ প্রকাশ করে। আমরা ওকে পরিবারের সম্মতি নিতে বলি এবং বাবা সহ তার ভাইবোন সম্মত হয় গোটা বিষয়েই। আমির চাঁদ শেখ নিজেই একজন সরকারি লাইসেন্স প্রাপ্ত কর্নিয়া সংগ্রাহক। সুতরাং তাঁর পরিবার গোটা বিষয়টি সম্মতি জানায়। কর্নিয়াদানের জন্য যে ফর্ম তাতে সাক্ষরও করেন তাঁরা। তার পরই কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়। গোটা দিনে কোনও সমস্যা হয়নি। সন্ধ্যার দিকে এলাকার কিছু মানুষ বিভিন্নরকম অভিযোগ করতে থাকেন। তখন পুলিশ ডাকা হলে পরিবারকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ সেদিন কিছুই বলেনি। পরেরদিন এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায় পুলিশ। আমরা তার পাশে দাঁড়িয়ে সমস্ত বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠনকে একত্রিত করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।"
পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সম্পাদক সৌরভ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘দেহদান, চক্ষুদানের ঘটনায় অঙ্গীকার থাকলেও মৃত্যুর পর অনেক সময় পরিবার পিছিয়ে যায়। এক্ষেত্রে একেবারেই বিষয়টি তা নয়। তা সত্ত্বেও গ্রেপ্তার করা হলো। সরকারের নীতিতে বলা হয়েছে এমন উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে হবে। দেখা গেল পরিবারকে রক্ষা করার অজুহাত দিয়ে গ্রেপ্তার করা হলো। মুক্তি দিতে হবে আমির চাঁদএবং তাঁর পরিবারকে।’’
পাশাপাশি, কিশোর বাহিনীর সাধারণ সম্পাদক পীযূষ ধর বলেন, "সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার অঙ্গ এই ঘটনা। আমাদের দেশ তথা রাজ্য তাকে উত্তর প্রদেশের মডেলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। দেশের সরকার যেভাবে চলছে সেই পথেই হাঁটছে রাজ্য সরকার। এই ধরণের ঘটনায় আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে এর বিরুদ্ধে আমরা কত মানুষকে সংগঠিত করতে পারলাম সেটাই আসল কথা।"
চিকিৎসক আন্দোলনের নেতা ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী বলেন, "১৯৯৪ সালে বিধানসভার একটি আইন রয়েছে যেখানে মানব অঙ্গের বাণিজ্যিক পাচার নিষিদ্ধ। কিন্তু স্বেচ্ছায় দানকে উৎসাহিতও করা হয়েছে। সেই আইন লঙ্ঘন করেছে এই পুলিশ। এই পুলিশের বিরুদ্ধে আমরা চিকিৎসক সংগঠন, বিজ্ঞান সংগঠন এবং জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ সমন্বয় মঞ্চের তরফ থেকে দাবি করছি এই পুলিশ অফিসারদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে শাস্তি দিতে হবে। আমির চাঁদ শেখের মতো মানুষ যারা সমাজের সম্পদ তাদের পুরস্কৃত করার বদলে চারদিন ধরে যেভাবে হেনস্তা করা হল তা নিন্দনীয়।"
Scientist arrested,protest in Kolkata
চক্ষুদানে বন্দি বিজ্ঞানকর্মী, আইন ভাঙছে পুলিশই, সোচ্চার প্রতিবাদ কলকাতায়
×
Comments :0