West Bengal Budget

বাজেট যখন ভোটের ইশ্‌তেহার

সম্পাদকীয় বিভাগ

Budget or election manifesto

বিধানসভায় পেশ হয়েছে মমতা ব্যানার্জির বাজেট। চালু প্রথা অনুযায়ী ভোটের বছরে বিদায়ী সরকার পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করে না। তিন চার মাসের জন্য ভোট অন অ্যাকাউন্ট বা ব্যয় বরাদ্দের বাজেট পেশ করে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত কাজ চালাবার জন্য। কিন্তু মমতার অনুপ্রেরণায় চন্দ্রিমা ভোট অন অ্যাকাউন্টের নামে যেটা পেশ করলেন সেটা অন্যান্য বছরের বাজেটের থেকে আলাদা কিছু নয়। আয় ব্যয়, নানা প্রকল্প ঘোষণা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ, সরকারের নীতি, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি কোনও কিছুই বাদ যায়নি। অবশ্য, যেভাবে সামাজিক প্রকল্পের নামে যেভাবে দান-খয়রাতির ঢালাও ব্যবস্থা করা হয়েছে তাতে একে বাজেট না বলে শাসক তৃণমূলের নির্বাচনী ইশ্‌তেহার বলাই অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত। কারণ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই মাথায় ছিল শুধুমাত্র ভোটের কথা। কি করলে, কাদের কত টাকা দিলে ভোট আদায় সহজ হবে সেটাই বাজেটের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।
একটা বাজেট থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ কিছু আন্দাজ করতে পারে না। সরাসরি কোনও সুবিধা পাওয়ার থাকলে সেটুকুই তারা বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাজেট নিছক কিছু প্রকল্প ঘোষণা করা, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি টাকা দেওয়া, তথ্য-পরিসংখ্যানহীন সাফল্যের ভাষণ নয়। বাজেটে ধরা পড়ার কথা রাজ্যের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক বাস্তব অবস্থা, বিভিন্ন অংশের মানুষের নির্দিষ্ট সমস্যার কথা। রা‍‌জ্যের অর্থনীতি এবং রাজ্যবাসীর জীবন-জীবিকার সঙ্কট সম্পর্কে সরকার কতটা ওয়াকিবহাল তা ধরা পড়ে বাজেটে। কিন্তু যে বাজেট চন্দ্রিমা পড়লেন তাতে রাজ্যে মানুষের জ্বলন্ত সমস্যাগুলির কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই। সাফল্যের দাবির সঙ্গে বাজেটে গৃহীত পদক্ষেপ পরস্পরবিরোধী। দাবি করছে কৃষকের আয় চারগুণ পাঁচগুণ বেড়েছে। তারপর খেতমজুরদের জন্য বছরে চার হাজার টাকা দুই কিস্তিতে দেবার ঘোষণা হয়েছে। যদি কৃষকের আয় পাঁচ গুণ বাড়ে তাহলে খেতমজুরের আয় পাঁচ গুণ না হোক তিন গুণ তো বাড়বে। তবে টাকা দিতে হচ্ছে কেন? আসলে গ্রামে রোজগার নেই। খেতমজুরদের করুণ অবস্থা। তাই দলে দলে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী বাড়ছে। দাবি করছে দারিদ্র মোচন করেছে। তাহলে বিনামূল্যের রেশন দিতে হচ্ছে কেন? নানা প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা দিতে হচ্ছে কেন? আসলে দারিদ্র কমেনি বরং বেড়েছে। মানুষকে কাটাতে হচ্ছে দুঃসহ জীবন। তাই টাকা দিয়ে ক্ষোভ কমানোর মরিয়া চেষ্টা। বলা হচ্ছে কোটি কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে; বেকারির হার তলানিতে। অথচ এবছর চালু হচ্ছে বেকার ভাতা। বেকারই যদি না থাকে তাহলে কাদের জন্য বেকার ভাতা? এত কাজ যদি রাজ্যে থাকে তাহলে লক্ষ লক্ষ যুবক ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য রাজ্যে কাজের জন্য যাচ্ছে কেন?
আসলে এ রাজ্যে প্রচুর কাজ আছে। কিন্তু সে কাজে যে মজুরি জোটে তাতে সংসার চালানো দূরের কথা নিজের পেট চালানোও দায়। সিভিক পুলিশ, আশা-অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, পার্শশিক্ষক, শিক্ষাবন্ধু মিড ডে মিল কর্মী ইত্যাদি সরকারি ক্ষেত্রে যে ভাতা মেলে তাতে আজকের বাজারে সংসার চালানো যায় না। বেসরকারি কাজে তো আরও শোচনীয় অবস্থা। আসলে ন্যায্য মজুরির কাজ এ রাজ্যে নেই বললেই চলে। এটা নিম্ন মজুরি, অতি নিম্ন মজুরির রাজ্য। এখানে বেকারি আর আধা বেকারির ছড়াছড়ি। অথচ সত্যিকারের উন্নয়ন, স্থায়ী সম্পদ তৈরি, উন্নত পরিকাঠামো, শি‍‌ল্পের বিনিয়োগের পরিবেশ ইত্যাদি কোনও কিছুই নেই বাজেটে। ক্রমশ ধসে যাওয়া অর্থনীতি সরকারের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে না। ঋণের উপর নির্ভরশীল করে তোলে। ধার করে টাকা বিলিয়ে ভোটে জেতার অসহায় প্রয়াস ছাড়া এই বাজেটে আর কিছুই নেই।

Comments :0

Login to leave a comment