সৌরভ চক্রবর্তী
নেপালের বিপর্যয় মানুষের মনে অসহায়তা আর যন্ত্রণার গভীর দাগ কেটে যাচ্ছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি-ঘর, কাদার প্লাবনে আবৃত ভূমিখণ্ড, মৃত মানুষের সারি, প্রিয়জন হারাবার যন্ত্রণায় বুকফাটা আর্তচিৎকার, পানীয় জল, ওষুধ, চিকিৎসার করুণ আর্তি, নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজে অসহায়। একের পর এক বিরতিহীনভাবে ঘটে চলা বিপর্যয়ে নৈরাশ্য গ্রাস করছে চারধারে। এখনো পর্যন্ত ১১২৭ জন মানুষ মৃত, ৪৮৫৮ জন মানুষ নিখোঁজ, এরমধ্যে ১১-১২টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে যুক্ত মানুষ ৯০০ জন, ৫০০জন টানেলের মধ্যে আটকে থাকার সম্ভাবনা। ক্ষতিগ্রস্ত ৮টি জেলা— রসুয়া,নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা,তানাহুন, চিতওয়ান এবং ত্রিশূলী— নারায়ণী নদী ব্যবস্থার নিম্ন প্রবাহে নওয়ালপরাসি পূর্ব, নওয়ালপরাসি পশ্চিম জেলা। সব থেকে ক্ষতিগ্রস্তরা রসুয়া জেলা। পনেরোটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত তার মধ্যে ১০ টি চালু, মোট ক্ষমতা ৩৫১ মেগাওয়াট, ৫টি নির্মীয়মাণ ৩৯৪ মেগাওয়াট— মোট উৎপাদন ৭৫৩ মেগাওয়াট। এর সাথে গবাদিপশু, কৃষি জমি-ফসল, দোকান, ব্যবসা সহ মানুষের ধন সম্পত্তির ক্ষতি।
হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত, স্যানিটেশন ব্যবস্থা বিনষ্ট, মানুষের দেহ গবাদি পশু নদীতে ভাসছে, পানীয় জল দূষণের সম্ভাবনা— সঙ্কট এবং জলবাহিত রোগের হাতছানি এখন সেখানে। ক্ষতিগ্রস্ত ছটি জেলায় খাদ্য, পানীয় জল, চিকিৎসার জন্য হাহাকার। সেখানে এখন পনেরোটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে তৎপরতা, মৃত এবং নিখোঁজের খোঁজে পরিবারগুলির আর্তনাদ। নেপালের বিপর্যয়ের বলি তুলনামূলকভাবে পাহাড়ি এলাকার স্থানীয় ও জীবিকা নির্ভর নিম্ন আয়ের মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ, যাদের সামর্থ্য ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ কম— যারা এই ক্ষতি সামাল দিতে অপারগ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বিপর্যয় এর প্রথম কানুনই হলো— যে মানুষ পরিবেশ ধ্বংসে সবচেয়ে কম দায়ী সেই মানুষই হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের বলি।
কি ঘটেছিল?
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-র তথ্য অনুসারে লাংটাং পর্বতগুচ্ছের উচ্চভূমিতে হিমবাহ যুক্ত একটি ঢালের বৃহৎ অংশ দ্রুত ধসে পড়ে। তাদের মতে ধসটি এত শক্তিশালী ছিল যে তার থেকে উৎপন্ন ভূকম্পন শক্তি প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল। এই কারণে মনে করা হচ্ছে যে,ভূমিকম্প থেকে ধস নয় বরং ধস থেকেই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ধসের সঙ্গে বরফ শিলা মাটি ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে লহেন্দে খোলায় প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে প্রবল ধ্বংসাবশেষবাহী স্রোত ভোটে কোশী নদী ব্যবস্থা এবং পরে ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংস যজ্ঞ সৃষ্টি করে - হড়পা বান ছিল সেই বিপর্যয়ে নিম্ন অববাহিকায় প্রধান প্রকাশ।
এটি ছিল উচ্চ পর্বতীয় ঢালের ভরধস থেকে শুরু হওয়া বহুধাপীয় ' কাসকেডিং বিপর্যয় ' যেখানে প্রাকৃতিক বরফ- শিলা ধ্বংসাবশেষ নদীতে প্রবেশ ক'রে নিজের ভর ও ধ্বংস ক্ষমতা বাড়িয়েছে। তারপর শুরু হয় একটা বরফের গোলা গড়াতে গড়াতে যেমন নিজের আকৃতি ও ভর বাড়িয়ে চলে তেমনি ' স্নোবল এফেক্ট ' - নদী পারও পাহাড়ের ঢাল ক্ষয় করেছে, একই সঙ্গে রাস্তা সেতু বাড়ি কংক্রিটের কাঠামো জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেঙে সেই মানব সৃষ্ট অবকাঠামোর ধ্বংসাবশেষকেও গ্রাস ক'রে স্রোতের অংশ করেছে। সেই স্রোতে মিশেছে অরণ্য ধ্বংসসৃষ্ট এবং ঢল ভাঙা মাটি। উপর থেকে নিচে বহু ধারায় ধ্বংস, নিচে এসে বিপুল কাদার প্লাবন— এটাই 'কাসকেডিং বিপর্যয়।' জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলগুলিতে জল-কাদা ঢুকে উদ্ধার ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ঘটনাটি অত্যন্ত দ্রুত ঘটেছিল বলে প্রচলিত বন্যা সর্তকতা ব্যবস্থার পক্ষে এমন আকস্মিক বরফ শিলাধসের আগাম খবর দেওয়া কঠিন ছিল। হিমবাহ হ্রদ ( গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড) পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ছিল কিন্তু হিমবাহ যুক্ত ঢালধস, বরফ-শিলাধস এবং তার ফলে আকস্মিক নদী- বন্যার জন্য একই রকম কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ছিল না।
নুওয়াকোটের ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন কর্মচারী রসুয়ার আত্মীয়ের ফোন থেকে খবর পেয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিপর্যয়ের খবর জানান— তারা মাত্র ১৪ মিনিটের মধ্যে ৯০০রও বেশি ছাত্র এবং ১৬ জন শিক্ষক কর্মীকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন, তারপরে ভয়াবহ জলস্রোত স্কুলটাকে ধ্বংস করে দেয়। অর্থাৎ একটি কার্যকর স্থানীয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে আরও অনেক প্রাণ বাঁচতে পারত।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় না "উন্নয়ন" বিপর্যয়
এটা বাহ্যত প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিন্তু এর আসল কারণ মনুষ্যকৃত— মনুষ্যসৃষ্ট তথাকথিত পুঁজিবাদী " উন্নয়ন।” একথা বলার অধিকারী সেই অসহায় জলবায়ু অরক্ষিত প্রান্তিক নিম্ন আয়ের মেহনতি মানুষজন। কিন্তু এখনও তারা জলবায়ু পরিবর্তনে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাকে দায়ী করার উপলব্ধিতে উন্নীত হতে পারেনি। কেবলমাত্র সে কারণেই একে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে চিহ্নিত করা হয় মুনাফালোভী লুটেরা পুঁজিবাদী “উন্নয়ন”ই দায়ী এই স্বর চাপা পড়ে যায়।
সাম্প্রতিককালে হিমালয়ের বিপর্যয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস, টানেল বিপর্যয়, ভূমি অবনমন— ধস, হড়পা বানে কাদার স্রোতে ঘর-বাড়ি রাস্তা-ঘাট ভেসে যাওয়া বিরতিহীনভাবে ঘটে চলেছে। তথাকথিত উন্নয়নের বিস্ফোরণে হিমালয়ে ধ্বংসলীলা চলছে। চরম সঙ্কটে হিমালয়।
সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত রসুয়া ও নুওয়াকোট এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চালু জলবিদ্যুৎ ক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৫৯ মেগাওয়াট, রসুয়াতে তে ২৩৬ মেগাওয়াট এবং নুওয়াকোটে ১২৩ মেগাওয়াট ( দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত চালু উৎপাদন ক্ষমতা হলো ৩৫৯ মেগাওয়াট। আর দুই জেলার ২০২৪-ভিত্তিক গড় বিদ্যুৎ চাহিদা হলো ১১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, দুই জেলার সমস্ত মানুষের গড় বিদ্যুৎ-চাহিদার প্রায় ৩৩ গুণ সমপরিমাণ উৎপাদন ক্ষমতা সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে। তাহলে বিদ্যুৎ তুমি কার? এ প্রশ্ন আজ উঠবেই। প্রয়োজনের সীমা টানতেই হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাহীন নিষ্কাশন লুণ্ঠনের নামান্তর। তা বন্ধ করতে হবে।
হিমালয়ের মতো সক্রিয় টেকটনিক ভূমিতে স্থানীয় মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদার ৩৩ গুণ বিদ্যুৎ তৈরি হবে? আর তার জন্য এই ১৫টা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে এই ভয়ঙ্কর ধ্বংসের মুখে ফেলতে হবে? জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টানেলে টানেলে ৬৩৯ জন নিখোঁজ মানুষের জন্য হাহাকার ধ্বনি শুনতে হবে? এতোগুলো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কংক্রিট স্টিল কাঠামো, কালভার্ট, সেতুর , রাস্তার অবকাঠামো 'কাসকেডিং বিপর্যয়'কে ভয়ঙ্কর করে তুলবে? এই বাড়তি ওজন পাহাড় বহন করতে পারবে কিনা, ' পাহাড়ের ক্যারিং ক্যাপাসিটি ' র হিসাব কষা হয়েছে? না হয়নি। উচ্চ হিমালয়ে উষ্ণায়ন-হিমবাহের আকার, বরফের স্থায়িত্ব এবং পাহাড়ের জল বিদ্যাগত ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে, পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করলে ঢালের প্রাকৃতিক জ্যামিতি বদলে যায়,মুনাফার জন্য কম খরচে ঢাল অতিরিক্ত খাড়া করলে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ে, নিকাশি ব্যবস্থা না থাকলে মাটিতে জল জমে ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়, অবাধে অরণ্য নিধনে ঢাল ন্যাড়া হয়ে ঝুঁকি বাড়ায়, নদী পারের নির্মাণের বিপদ, হিমালয়ের সক্রিয় টেকটনিক্স পটভূমি, বিশ্ব উষ্ণায়ন জনিত বরফ-তুষারের গলন, বহু যুগ ধরে হিমাঙ্কের নিচে শিলার মাঝে আটকে থাকা বরফ-মাটি ( পারমাফ্রস্ট)-এর গলনে ঢালের অস্থিতিশীলতা, মাটির তলার জল ভাণ্ডার ইত্যাদি না মেনে তথাকথিত মুনাফাগন্ধি উন্নয়ন হচ্ছে হিমালয়ে। আজ তাই হিমালয় জুড়ে কেবলই ধ্বংসলীলা।
কেউ মানে না চেতাবনি
ভারতীয় হিমালয়ে প্রায় ৭,৫০০টি হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত; তার মধ্যে ১৮৯টি উচ্চ ঝুঁকি হিসাবে চিহ্নিত। ISRO দেখিয়েছে, ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২,৪৩১টির মধ্যে ৬৭৬টি ১৯৮৪-এর পর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ৬০১টি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। নেপালের হিমবাহগুলি গত দশকের আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৬৫শতাংশ দ্রুত হারে গলছে। গত ৩১ বছরে তার বরফের এক তৃতীয়াংশ হারিয়েছে বলে বলছে ইউনাইটেড নেশনস,ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইউনাইটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট। হিমালয়জুড়ে চলছে আগ্রাসী " উন্নয়ন " বিপর্যয়।
কার্ল মার্কস ক্যাপিটাল এর ১ ম খণ্ডে বলেছেন, "পুঁজিবাদী উৎপাদন মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার বিপাকীয় আদান প্রদানকে ব্যাহত করে।" বলেছেন, " পুঁজিবাদী কৃষিতে প্রতিটি অগ্রগতি শুধু শ্রমিককে লুট করার কৌশলের অগ্রগতি নয়,মাটিকেও লুট করার কৌশলের অগ্রগতি।
এই বিশ্লেষণ আজ বাস্তবে বিভীষিকা হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে কৈফিয়ত চাইছে।
অবৈজ্ঞানিক চারধাম প্রকল্প
৮৮৯ কিলোমিটার পাহাড়ি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। পাহাড় কাটা, সুড়ঙ্গ সেতু কালভার্ট - ২০২৫ এর একটি গবেষণা ৮০০ কিলোমিটার বিশ্লেষণ করে ৮১১ টি ভূমিধসের স্থান শনাক্ত করেছে। গবেষণায় ৫০০ র বেশি ভূমি ধসকে অত্যন্ত খাড়া পাহাড় কাটার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। গবেষণাটি ৬৯০ হেক্টর বনভূমির ক্ষতি, ৫৫০০০ র বেশি বৃক্ষ ছেদন, ২ কোটি ঘন মিটারের মাটি সরাবার হিসাব দিয়েছে।
এই প্রকল্পের জন্য উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার যোশি মঠে ২০২৩ সালে ৮০০ রও বেশি বাড়িতে ফাটল তৈরি হয়। হেলাং–মারওয়াড়ি বাইপাসে পাহাড় কাটার, ড্রিলিং ও বিস্ফোরণের ফলে ঢালের পাদদেশ ক্ষয় ও অস্থিতিশীলতা বেড়েছিল। শহরটি প্রাচীন ধসের ধ্বংসাবশেষের ওপর অবস্থিত। আগ্রাসী নির্মাণ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, নিষ্কাশনের সমস্যা, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা না মেনে, বিশেষজ্ঞদের নিষেধ না শুনে চারধাম সড়ক প্রকল্প করার খেসারত দিতে হয়েছিল সেখানকার মানুষদের।
শুধু নেপালের ক্ষেত্রে নয়, ২০২৫ এ উত্তরাখণ্ডের ধারালিতে কাদা ও জলস্রোতে ঘরবাড়ি - রাস্তাঘাট ভেসে যায়। ২০২৫-এর প্রথম সপ্তাহে, বিশেষ করে ৪–৫ অক্টোবরের প্রবল বৃষ্টি ও হড়পা বানের ঘটনায় ডুয়ার্সে প্রভাব ছিল যথেষ্ট ভয়াবহ। দার্জিলিং, কালিম্পঙ,আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; ডুয়ার্সের একাধিক জায়গায় রাস্তা, সেতু, চা-বাগান ও অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে নাগরাকাটা, বানারহাট ও কালচিনি এলাকায় প্রায় ৯৫০ হেক্টর চা বাগানের জমি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; প্রায় ২১০ হেক্টর জমি সম্পূর্ণভাবে ধুয়ে যাওয়ার খবর ছিল। রাস্তা, কালভার্ট, ফুটব্রিজ ও শ্রমিকদের ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাদায় ভরে উঠেছিল ঘরবাড়ি-কৃষিভূমি।
২০২৩ শে সিকিমের দক্ষিণ লোহনক হিমবাহ হ্রদের ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১৭৯ জনের মৃত্যু হয়, তিস্তা জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো চুংথাঙের ১২০০ মেগাওয়াট তিস্তা ৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়। ২০২৩-এ সিমলা, মান্ডি,সোলান, কুলু বিপর্যয়ে ৪০০-র বেশি মৃত্যু হয়, ১.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়, সিমলা, মান্ডিতে ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষে বাড়ি-ঘর রাস্তা চাপা পড়ে যায়।
উত্তরাখণ্ডে ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর নির্মীয়মাণ টানেলের একটি অংশ ধসে পড়ে এবং প্রায় ৬০ মিটার ধ্বংসাবশেষের পিছনে ৪১ জন শ্রমিক আটকা পড়েন। টানা ১৭ দিনের জটিল উদ্ধার অভিযানের পর ২৮ নভেম্বর সকলকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
তপোবন–বিষ্ণুগড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপর্যয় ঘটে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায়। রিশিগঙ্গা উপত্যকায় আকস্মিক হিম-শিলা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহে তপোবন–বিষ্ণুগড় প্রকল্পের নির্মাণস্থল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যুও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে।
হিমালয়ের মতো ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল ভূখণ্ডে প্রকৃতির ওপর কতটা হস্তক্ষেপ সহনশীল হবে তা সুনির্দিষ্ট, চুলচেরা এই হিসাবেই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র,সড়ক, সেতু কংক্রিট-স্টিলের অবকাঠামোর পরিসর স্থির করতে হবে। বিশাল জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পাশাপাশি অসংখ্য জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ,চওড়া সড়ক, অসংখ্য টানেল– তারজন্য“ ব্লাস্ট”, আজ বড় হুমকি।
সুপ্রিম কোর্টের লাল সতর্কতা
২০২৫ শে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট পরিবেশগত পরিস্থিতি নিয়ে ' সুয়ো মোটো ' মামলা নেয় এবং সতর্ক করে বলে যে, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে হিমাচল প্রদেশ রাজ্যটি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে, এই মনুতব্যের মর্মবস্তু ছিল— অর্থনৈতিক আয় বা পর্যটনের রাজস্ব পরিবেশ ধ্বংসের বিনিময়ে অর্জন করা যায় না।
শেষে যে কথা বলতেই হবে তাহলো তথাকথিত অবৈজ্ঞানিক আগ্রাসী " উন্নয়ন " হিমালয়কে বিপন্ন করে তুলেছে। নেপালের বিপর্যয় এর বাইরে নয়। আজ মানব সভ্যতা পরিবেশের চ্যালেঞ্জের মুখে না, পুঁজিবাদী মুনাফা তথাকথিত উন্নয়নে চ্যলেঞ্জের মুখে ? এর স্বরূপ প্রকাশ করবে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষক সমাজ ও সাধারণ মানুষই কারণ তারাই অরক্ষিত। তারাই পুঁজিবাদী “ উন্নয়ন” চালিত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শিকার। তারই মারা যায়, অসুস্থ হয়, জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়। পরিবেশ আন্দোলন তাই শ্রেণি আন্দোলনের অঙ্গ–পরিবেশ চেতনা, শ্রেণি চেতনায় অংশীভূত। হিমালয়ের বিপর্যয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় না " উন্নয়ন " বিপর্যয় - এর ফয়সালা শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের শ্রেণি আন্দোলন এবং সমাজের সব অংশের জোটই নির্ধারণ করবে নাহলে হিমালয় সহ মানব সভ্যতার কোনও ভবিষ্যৎ নেই।
Comments :0