Hakimpur

আজ জমি আমাদের, কাল বিএসএফ-এর হয়ে গেল!

রাজ্য জেলা

চন্দন দাস: হাকিমপুর (স্বরূপনগর)

প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো বিএসএফ-এর চৌকিতে। তারপর বিএসএফ জানালো,‘অনুমতি নেই। মিডিয়াকে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।’
হাকিমপুরে এখন ‘প্রেস’-এর যাওয়া নিষিদ্ধ!
হাকিমপুর ভারতে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত স্বরূপনগর ব্লক এলাকায় হাকিমপুর। স্বরূপনগরের আমুদিয়া থেকে আরশিকারি পর্যন্ত প্রায় ১৯কিমি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার নেই। দুই দেশের সীমান্ত হিসাবে একটি সরু খালের মতো নদী। তার নাম সোনাই। সেই নদী-সীমান্ত থেকে হাকিমপুরে বিএসএফ-এর চৌকি প্রায় এক কিমি দূরে। ওই এলাকার ১১টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার গ্রামবাসীর যাতায়াতও বিএসএফ-এর উপর নির্ভরশীল। বিএসএফ-এর চৌকিতে বসেই দেখা গেল গ্রামবাসীদের কীভাবে পরীক্ষা করছে বিএসএফ। পুরুষদের পকেট হাতড়ে শরীর-পরীক্ষা হয়। পাশে একটি ছোট ঘর আছে পর্দা ঘেরা। সেখানে নারীদের শরীর পরীক্ষা করা হয়, প্রয়োজন মনে করলে। হাকিমপুরে ঢুকতে গেলে দেশবাসীকে আধার কার্ড সঙ্গে রাখতেই হবে। ইদানীং ভোটার কার্ডও প্রবেশাধিকারের নথি হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সরকারের দেওয়া সাংবাদিকের পরিচয়পত্রর অনুমোদন নেই। সাংবাদিক হিসাবে একবার চিহ্নিত হয়ে গেলে আধার কার্ডও দেখা হবে না। হাকিমপুরে ‘প্রেস’-এর প্রবেশ ‘অনুপ্রবেশ’-এর শামিল।
কারণ—হাকিমপুর প্রতিবাদ করেছে।
ঘুরপথে, সাংবাদিক পরিচয় না দিয়ে হাকিমপুরে প্রবেশ করা গিয়েছিল গত মঙ্গলবার। সঙ্কীর্ণ পথে হাকিমপুর বাজারে পৌঁছানো গিয়েছিল। সেই বাজার মানে গোটা পনেরো দোকান বিশিষ্ট একটি এলাকা। সেই বাজার লাগোয়া সোনাই নদী। অর্থাৎ সোনাই নদীর পশ্চিম পারে হাকিমপুর। সরু, প্রায় থমকে থাকা জলরাশি নিয়ে দক্ষিণমুখী নদীর অপর পারে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার গাড়াখালি এবং দক্ষিণ ভাদালিয়া গ্রাম। এপার থেকে ইট ছুঁড়লে ওপারে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ কসরতের দরকার নেই। সোনাই নদীর পাড়ে, ভারতের দিকে রয়েছে সীমান্ত চিহ্নিত করা পিলার। নদীর পাড়ে বিএসএফ-এর পাহারা দেওয়ার মাচা, ক্যাম্প রয়েছে। তবে সে সবে বিএসএফ নেই—গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ‘‘বিএসএফ এখানে আর পাহারা দেয় না। পরিত্যক্ত।’’
সোনাইয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে জাকির মণ্ডল, রফিকুল বিশ্বাস, আসান সর্দাররা জানালেন তাঁদের বিরুদ্ধতার স্বর তোলার কারণ। এই কথা অবশ্য মনে করার কারণ নেই যে, হাকিমপুরে শুধু সংখ্যালঘু মুসলমানদের বসবাস। আছেন হিন্দুরাও—মোট জনসংখ্যার অন্তত ৩০ ভাগ তাঁরা। হাকিমপুরের একাংশ ছোট দোকানদার, ভ্যান চালক, অল্প কৃষক আছেন। আর অনেক বাড়ির পুরুষই পরিযায়ী শ্রমিক।
ছোট মনোহারি দোকানের মালিক জাকির মণ্ডলের কথায়, ‘‘নদীর পাড়ে দেড় বছর আগেও বিএসএফ পাহারা দিত। হঠাৎ সেই পাহারা উঠে গেল। এখন বলছে সোনাইয়ের পাড় থেকে ১২০০ গজ দূরে কাঁটাতার লাগাবে। খুঁটিও পুঁতেছে কয়েক জায়গায়। অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্ত থেকে ১৫০গজ দূরে কাঁটাতার লাগানোর কথা। অর্থাৎ আমাদের গ্রামের মতো আরও অনেক গ্রাম পড়ে যাবে কাঁটাতারের বাইরে। বাংলাদেশ থেকে চোর, ডাকাত এসে মাঝেমাঝেই আমাদের গোরু, বাছুর নিয়ে যায় রাত বিরেতে। এখন তো আমরা আরও বিপদে পড়ে যাবো। আমরা কাঁটাতারের বিরুদ্ধে নই। আমরাও চাই সীমান্ত পোক্ত হোক। কিন্তু এইভাবে?’’
যেখানে এখন কাঁটাতার দিতে চাইছে বিএসএফ, সেখানে কাঁটাতার পড়লে দহরকন্দা, পদ্মবিলা, দক্ষিণ তারালি, উত্তর তারালি, মাঝের তারালি, হাকিমপুর দাস পাড়া, হাকিমপুর, হাকিমপুর রাজবংশী পাড়া, হাকিমপুর ঘোষ পাড়া, হাকিমপুর উত্তর পাড়া, আরশিকারী, এই গ্রামগুলি পড়ে যাবে কাঁটাতারের বাইরে। এই এলাকার মধ্যে মসজিদ আছে, মন্দির আছে, হাইস্কুল আছে, ৬টি স্কুল আছে। সিপিআই(এম) নেতা আবুল হোসেন গাজীর কথায়, ‘‘কী হবে এসবের? তাছাড়া চাষের জমি আছে। আমাদের এতদিনের বসবাস। জমি-জিরেত আছে। ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসনের নির্দিষ্ট আলোচনা ছাড়া এই কাজ কী করে করতে পারে সরকার।’’
‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল বিএসএফ-কে জমি দিয়ে দেওয়া। কিন্তু মানুষের কী হবে, সে ভাবনা সরকার মাথায় আনেনি, অভিযোগ গ্রামবাসীদের।
মোস্তফা সরদার তাঁর অভিজ্ঞতা জানালেন। বললেন, ‘‘আমার বাড়িতে চারদিন আগে বিডিও, বিএলআরও, সিভিক পুলিশ, থানার সাব ইনস্পেক্টর এসে হাজির। বিডিও বললেন, ‘আপনার ৭শতক জমি পড়েছে। সই করে দিন। আমি বললাম, আমি কেন সই করব। ওই জমিটুকু আমার সম্বল। সেই জমি আমি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেবো? কোনও আলোচনা নেই, কথাবার্তা নেই। জমি দিতে হবে বিএসএফ-কে। আমি বলেছি, আমি দেবো না।’’ হাকিমপুরের বাসিন্দা এমন আরও অনেকে এইভাবে জমি নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। ফাতিমা বিবির মতো অনেক মহিলার কথায়, ‘‘আমরাও দেশকে আমরাও ভালোবাসি। আমরাও ভারতীয়। দেশের সুরক্ষার জন্য জমি দিতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু নিয়ম মেনে হোক। যা আইন আছে। আজ জমি আমাদের, কাল বিএসএফ-এর হয়ে গেল! আর বিএসএফ বলেছে বলে যেখানে খুশি কাঁটাতার বসাবে?’’
গত বৃহস্পতিবার দহরকন্দায় জমি মাপজোক শুরু করে প্রশাসন। গ্রামবাসীরা সেখানে বিক্ষোভ দেখান। কয়েকদিন আগে দিন কৈজুড়িতে একই কারণে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন গ্রামবাসীরা। সেখানে গিয়ে তাঁদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ মন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া। প্রতিবাদ তবু থামেনি হাকিমপুর সহ অন্যান্য গ্রামে। 
স্বরূপনগরের বিধায়ক বীণা মণ্ডল—  তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ অংশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। হাকিমপুরের মানুষের সঙ্কট নিয়ে ভাবার ফুরসৎ তাঁর নেই। তিনি গ্রামবাসীদের কাছে যাননি।
গত বৃহস্পতিবার হাকিমপুরে প্রতিবাদ করেছে সিপিআই(এম)। সভায় আইনজীবী শামিম আহ্‌মেদ এবং পার্টিনেতা হামালউদ্দিন আহ্‌মদ বক্তব্য রাখেন। প্রায় তিন হাজার গ্রামবাসী জড়ো হয়েছিলেন। হামালউদ্দিন আহ্‌মদের কথায়, ‘‘সীমান্ত সুরক্ষার কাজের বিরোধী কেউ নয়। কিন্তু আইন মেনে এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেই তা করতে হবে।’’ 

Comments :0

Login to leave a comment