ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আগামীকালের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত এবার পৌঁছল সুপ্রিম কোর্টে। সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের আগে দিল্লিতে আরোপিত বিধিনিষেধকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। দিল্লিগামী ট্রেন বাতিল, মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধের মতো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তার এই আইনি পদক্ষেপ।
এই মামলায় এমএ বেবির হয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করছেন প্রবীণ আইনজীবী তথা সাংসদ কপিল সিব্বল। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের সামনে রাজধানীর পরিবহণ ব্যবস্থা কার্যত স্তব্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি আদালতের হস্তক্ষেপের আবেদন জানান।
আদালতে কপিল সিব্বল বলেন, “সমস্ত ট্রেন বাতিল, মেট্রো স্টেশন বন্ধ। কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না। আমার দেশে কী হচ্ছে? এটা তো শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ।”
বিক্ষোভের আগে রাজধানীতে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণনও এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, “আপনারা অক্ষম বলে গোটা শহর বন্ধ করে দিতে পারেন না।”
শনিবার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ওই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। বিক্ষোভ ঘিরে ৫৭টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ এবং দিল্লিগামী একাধিক ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমএ বেবির আবেদনে এই পদক্ষেপগুলির বৈধতা ও নাগরিকদের অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নই গুরুত্ব পেয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের পদক্ষেপের বিবরণ তুলে ধরে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে ১৬ পাতার একটি নথি পেশ করা হয়। তাতে দিল্লি পুলিশের নির্দেশিকা, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারির বিজ্ঞপ্তি এবং ট্রেন বাতিল ও অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি পরিষেবায় বিধিনিষেধ সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এ ছাড়াও, বিক্ষোভের আগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলির (আরডব্লিউএ) সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ এবং হোটেল ও হস্টেলে তল্লাশি চালানোর বিষয়ও নথিতে তুলে ধরা হয়েছে।
আইনজীবীরা আদালতকে জানান, বিক্ষোভের আয়োজকরা পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই আবেদন খারিজ করা হয়।
শুনানিতে বিক্ষোভ ও জমায়েতের অধিকারের গুরুত্ব স্বীকার করে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, প্রতিবাদ কর্মসূচি অবশ্যই আইনের আওতার মধ্যে হতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, “সংগঠিত হওয়ার অধিকার অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার আইন মেনেই ব্যবহার করতে হবে।”
বিক্ষোভের অনুমতি ও তার আইনি বৈধতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিচারপতি বাগচী বলেন, প্রথমে বিক্ষোভের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে আদালতকে স্পষ্ট ধারণা পেতে হবে। অনুমতি নিয়ে বিক্ষোভ হলে তা আইনসম্মত কর্মসূচি। তবে আইন পুরোপুরি মেনে না চললেও মানুষের প্রতিবাদের অধিকার একেবারে অস্বীকার করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আয়োজকদের নিজেদের ঝুঁকিতে কর্মসূচি চালানোর বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দিল্লিতে আরোপিত বিধিনিষেধের প্রসঙ্গে আদালত উভয় দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। বিচারপতি বাগচী বলেন, “আমরা যদি এই বিষয়টিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করি, তা হলে সংগঠিত হওয়ার অধিকারেও বাধা দেওয়া হবে। সেটা কি ন্যায্য হবে? না, কারণ প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে।”
আবেদনকারীদের উদ্দেশে আদালত জানতে চায়, এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা সম্ভব, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য আদালতের সামনে পেশ করা হোক।
বিক্ষোভের আয়োজক কারা এবং কতজন মানুষ এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন, তা-ও জানতে চায় শীর্ষ আদালত। বিচারপতি বাগচীর বক্তব্য, ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার একদিকে নিজেদের মৌলিক অধিকার দাবি করা নাগরিকেরা, অন্যদিকে যে সংগঠন বিক্ষোভ করতে চায়, তাদের বক্তব্য। কিন্তু বিক্ষোভের আয়োজক পক্ষ আদালতের সামনে উপস্থিত না থাকায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানায় বেঞ্চ।
আইনজীবীরা জানান, বিক্ষোভের আয়োজক এবং সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করে তারা আদালতে ফিরে আসবেন।
১০ অক্টোবরের কর্মসূচির আগে দিল্লিতে ট্রেন বাতিল, মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ইন্টারনেট পরিষেবায় বিধিনিষেধ এবং পুলিশের অনুমতি প্রত্যাখ্যান সব মিলিয়ে নাগরিক স্বাধীনতা ও জননিরাপত্তার প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবির সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ফলে এই বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ আরও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা পেল।
একদিকে প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি, অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, এখন সেই প্রশ্নের দিকেই নজর রয়েছে।
MA Baby
দিল্লিতে বিক্ষোভে বিধিনিষেধ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, সওয়াল কপিল সিব্বলের
×
Comments :0