post editorial

বিদ্যাসাগর চর্চার ধারা এবং উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী

সম্পাদকীয় বিভাগ

শুভংকর চক্রবর্তী


সংবাদে প্রকাশ রাজ্য বিদ্যাসাগর আকাদেমি আয়োজিত ২০৬ বছরের বিদ্যাসাগর জয়ন্তী অনুষ্ঠানে রাজ্যের মাননীয় উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জানিয়েছেন— ‘গত ৫০ বছরে রাজ্যে বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের ধারা ছিল বামপন্থী ধারা। আমরা তা ভাঙবো। রাষ্ট্রবাদী আলোকে বিদ্যাসাগরকে প্রতিষ্ঠিত করব।’ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র শিক্ষক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রাররা।
মাননীয় উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ছাত্র-শিক্ষকদের এই সমাবেশে অসাবধানবশত একটি ভ্রান্ত তথ্য পরিবেশন করেছেন— ‘বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন’। মাননীয় মন্ত্রীর অবগতির জন্য জানাই— সংস্কৃত কলেজ যখন প্রতিষ্ঠিত হয় (১৮২৪) বিদ্যাসাগরের বয়স তখন মাত্র ৪বছর। বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃত কলেজের নতুন ভবনে ছাত্র হিসাবে প্রবেশ করেন (১৮২৯) তখন তাঁর বয়স মাত্র ৯ বছর। কোনও শক্তিতেই বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেননি। সে যা হোক, ‘বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের বামপন্থী ধারাটির কী রূপ, ‘রাষ্ট্রবাদী আলোকেরই বা রূপটি কী, মাননীয় মন্ত্রী কিছু বলেননি সে সম্বন্ধে।
আজ থেকে শত বছর পূর্ব থেকেই ‘বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের’ একটি ধারা সুস্পষ্ট ছিল। ধারাটি নির্দেশ করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বিদ্যাসাগর অনুজ শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন, বিদ্যাসাগর জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রিয় অধ্যাপক ক্ষিতীশপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, বিদ্যাসাগর চরিত লেখক বিহারীলাল সরকার, মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউটের তর্কশাস্ত্রের অধ্যাপক বিদ্যাসাগর প্রিয় ক্ষুদিরাম বসু,  সাহিত্যসাধক চরিতমালার মতো গবেষণাগ্রন্থ লেখক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পত্রিকা সম্পাদক দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী, মহাত্মা গান্ধী, রমেশচন্দ্র দত্ত, সে সময়ের তত্ত্ববোধিনী, সঞ্জবনী, সর্ব্কশুভকরী, সোমপ্রকাশ, The Indian Spectator-এর মতো পত্র-পত্রিকার লেখকগণ।
এই সব জ্ঞানীগুণীর ‘বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের ধারা’ ছিল এরকম— ‘বিদ্যাসাগর ছিলেন সবরকম কুসংস্কারের বিরোধী।’ দেশের হিতকর সকল বিষয়েই মনোনিবেশ করেছিলেন। এরূপ সর্বতো সুন্দর স্বদেশপ্রিয়তা প্রায় দেখা যায় না। শিবনাথ শাস্ত্রী ‘বিদ্যাসাগরের চরিত্রে যাহা সর্বপ্রধান গুণ, যে গুণে তিনি পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালি জীবনের জড়ত্ব ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া— হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে— করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়েছিলেন আমি যদি অদ্য তাঁহার গুণকীর্তণ করিতে বিরত হই, তবে আমার কর্তব্য একেবারেই অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়।’
‘স্ত্রী জাতির প্রতি যে আর্তি প্রকাশ করিয়াছেন তাহা সবল সমূলক ও অকৃত্রিম। আজকাল যাঁহারা স্ত্রী জাতির প্রতি আধ্যাত্মিক দেবত্ব আরোপ করিয়া বাক্‌চাতুরি প্রকাশ করিয়া থাকেন, তাহাদের সহিত কি প্রভেদ।’ —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘দুঃখ-দাবানলের কেন্দ্রস্থলে উপবেশন করিয়া জগতের মঙ্গলপ্রয়ত্ব সম্বন্ধে বক্তৃতা করা তাঁহার প্রকৃতির বিরুদ্ধ ছিল। বোধ করি, সেই জন্যই ঈশ্বর ও পরকাল সম্বন্ধে নিজমত প্রকাশ করিতে তিনি চাহিতেন না’ - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
‘অগ্রজ মহাশয় শৈশবকাল হইতে কাল্পনিক দেবতার প্রতি কখনই ভক্তি বা শ্রদ্ধা করিতেন না। জগতের মধ্যে কেবল হিন্দুগণ দেবদেবী প্রতিমার প্রতি যেরূপ হৃদয়ের সহিত ভক্তি প্রকাশ করেন, তিনি জনকজননীকে বাল্যকাল হইতে তদ্রূপ আন্তরিক শ্রদ্ধা ও দেবতাস্বরূপ জ্ঞান করিতেন।’ শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন।
‘সূক্ষ্ণতর রূপে পরীক্ষা করিয়া দেখিতে গেলে তাঁহার নিত্যজীবনের আচার ব্যবহার, ক্রিয়াকলাপ, সম্পন্ন হিন্দুর অনুরূপ ছিল না। অপরদিকে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের লক্ষণের পরিচয় কখনও পাওয়া যায় নাই।’ চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আচার অনুষ্ঠানাদি সম্বন্ধে দুই-এক কথা বলি। তিনি তো পিতামহীর নিকট মন্ত্র গ্রহণ করেন নাই; পরশু সন্ধ্যাহ্নিক পূজাদিতেও তাঁহার প্রবৃত্তি ছিল না। তবে অপর কাহারও সন্ধ্যাহ্নিক ক্রিয়া দেখিয়া তিনি নাসিকা সঙ্কুচিত করিতেন না। আপন পরিবারের মধ্যে কাহারও প্রতি তৎসম্বন্ধে তাঁহার নিষেধও ছিল না।’ বিহারীলাল সরকার।
তাঁর ধর্মজীবন সম্বন্ধে এই বলা যায় যে, তাঁর ধর্মজীবন কর্মগত ছিল। কাজই তাঁর কাছে ধর্ম...। প্রতিমা পূজা তিনি লৌকিকভাবেই দেখতেন। কেন না বাড়িতে তো কোনও পূজা হতে দেখেননি। মোটের উপর মনে হয় তিনি Agnostic (সংশয়বাদী) ছিলেন। তিনি বলতেনও — ‘‘যেটা পারবি সেইটে কর।’’ লোক সেবাই তাঁর ধর্ম ছিল। তাঁর নীতি ছিল লোককে না ঠকানো।
এক সম্প্রদায়ের উপাসনা দেখে এসে তিনি বলেছিলেন — ‘‘তারা বলছে শুনলুম আমরা মুশারও পায়ের ধুলো নিচ্ছি। ঈশ্বরের পায়ের ধুলো নিচ্ছি, শ্রীচৈতন্যেরও পায়ের ধুলো নিচ্ছি— আরে বাপু ঈশা মুশা শ্রীচৈতন্য মরে’ত ভূত হয়ে গিয়েছে — পায়ের ধুলো কিরে বাবা?’’ আর এক সময় তিনি বলেছিলেন — ‘‘বয়স ঢের হয়েছে, ঈশ্বরবিশ্বাসী লোক একটি দেখিনি। সকলে নিচের দিকে তাকায়, উপরের দিকে কেউ তাকায় না।’’ ক্ষুদিরাম বসু।
‘‘আসলে বিদ্যাসাগর দেবত্ব ও ব্রাহ্মণ্যের সকল গৌরববর্জ্জিতভাবে মানুষকে মানুষরূপেই মহৎ ও মহনীয় দেখিতে চাহিয়াছিলেন এবং তাহা চাহিয়া ছিলেন বলিয়াই এই গুরু ও শালগ্রাম শিলার দেশে তাঁহাকে অপরিসীম লাঞ্ছনা ভোগ করিতে হয়েছিল। ... বিদ্যাসাগর চরিত্রে এই মানবপ্রীতিই সর্বাপেক্ষা বিস্ময়ের বস্তু।’’ ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘There have been few in this World like him.’ “We was Hindu and a Brahmin too. But to him Brahmin and Sudra. Hindu and Muslim were all alike’  মহাত্মা গান্ধী।
‘মহামতি বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন — ‘‘এদেশের নিম্নশ্রেণীর গতি না ফিরিলে দেশের গতি ফিরিবে না। নিম্নশ্রেণীর গতিও ফিরিবে না, সুতরাং দেশের মঙ্গলও হইবে না।’ — দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরী।
‘ঈশ্বরচন্দ্রের কথা স্মরণ করিয়া আমরা বোধ হয় একটু সোজাপথে চলিতে শিখিতে পারি— একটু কর্তব্য অনুষ্ঠানে উদ্যম করিতে পারি— একটু ভণ্ডামি ত্যাগ করিতে পারি।’ রমেশচন্দ্র দত্ত।
‘বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতাগণ যোগ দেবার জন্য প্রতিনিধি পাঠিয়ে অনুরোধ করেন। তিনি ওদের সোজাসুজি প্রশ্ন করেন, ‘‘দেশের স্বাধীনতা পেতে গেলে শেষ পর্যন্ত যদি দরকার হয় তারা কি তলোয়ার ধরতে পারে?’’ তাঁর এই প্রশ্নে, যারা এসেছিলেন, বিব্রত হয়ে পড়েন। তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন, ‘‘আমাকে বাদ দিয়েই তোমরা এই কাজে এগোও।’’ বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রতীক পূজা ও স্বস্ত্যয়ন প্রভৃতি অ‍‌যৌক্তিক এই হিসাবে কোনও দিন প্রশ্রয় দেন নাই।’ — ক্ষিতীশ প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
এই যুক্তিবাদী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুক্তমনা, নির্ভীক বলিষ্ঠ, সত্যাচারী, দেশপ্রেমিক, আত্মনির্ভর সাম্প্রদায়িক শাস্ত্র মেনে না-চলা, মনুষ্যত্বের প্রাচুর্যেপূর্ণ ‘ভারতবর্ষী‌য় বিদ্যাসাগর’-কে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন — ‘‘তুমি তো অবিদ্যার সাগর নয়, তুমি যে বিদ্যার সাগর, তুমি ক্ষীরসমুদ্র।’’ স্বামী বিবেকানন্দ এই ক্ষীরসমুদ্র বিদ্যাসাগরকেই শ্রীরামকৃষ্ণের পরে দ্বিতীয় হিসাবে অনুসরণ করতে চেয়েছেন— ‘‘After Ramkrishna, I follow Vidyasagar.’’
‘‘বর্ধমানে যখন বড় ম্যালেরিয়া জ্বরের ধুম, তখন আমরা কলিকাতাতে বসিয়া শুনিলাম যে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজ ব্যয়ে ডাক্তার ও ঔষধ লইয়া সেখানে গিয়াছেন, এবং ডাক্তার ও ঔষধ সঙ্গে হাড়ি, শুড়ি, জেলে, মালা, জাতিকা নির্বিশেষে সকলের দ্বারে দ্বারে ফিরিয়া চিকিৎসা করাইতেছেন। তিনি গাড়িতে বসিয়াছেন, একটি মুসলমানের বালক হয়ত তাঁহার ক্রোড়ে বসিয়াছে। এই জাতিভেদ প্রপীড়িত দেশে এমন উদার বিশ্বজনীন প্রেম আর দেখি নাই।’’ সঞ্জীবনী পত্রিকা।
‘It is no secret that Vidyasagar despaired of his Countryman and was utterly sick of their double facedness and hypocrisy. The Indian Spectator. 
সেদিন বিদ্যাসাগর প্রতিভার এরূপ মূল্যায়ন তাঁরা করেছেন হিন্দুত্ববাদী ধর্মধ্বজী, বিচারজ্ঞানহীন হিন্দুসমাজের সংস্কার বিরোধী শাস্ত্রবাদগ্রস্ত, বিদ্যাসাগর বিরোধীদের প্রবল সক্রিয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে এই জ্ঞানীগুণীদের বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের ধারাকেই বামপন্থীরা অনুসরণীয় ধারা বলে গ্রহণ করেছেন। তাকে তথ্যে, গবেষণায় সমৃদ্ধ করেছেন। ‘গত ৫০ বছরে’ কেন, কোনো সময়েই রাজ্যে বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের কোনো স্বতন্ত্র ধারা বামপন্থীরা তৈরি করেননি।’
দেশের বরেণ্য জ্ঞানীগুণীদের বিদ্যাসাগর চর্চার বিশ্লেষণের এই ধারাকেই কি বামপন্থী ধারা আখ্যা দিয়ে ‘আমরা তাকে ভাঙব’ বলে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ঘোষণা করলেন ২০৬ বছরের বিদ্যাসাগর জয়ন্তী অনুষ্ঠানে। ছাত্র-শিক্ষকদের সমাবেশে! ভেঙে দিয়ে ‘রাষ্ট্রবাদী‍‌ আলোকে বিদ্যাসাগরকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, জানালেন। মাননীয় মন্ত্রীর অবধানের জন্য নিবেদন করব — ‘রাষ্ট্রবাদী আলোক’ কথাটির অর্থ যদি হয় ভারতবর্ষীয় হবার আলোক। স্বাদেশিকতার, দেশপ্রেমের আলোক— তবে তো বিদ্যাসাগরের মধ্যে সে আলোকের কীর্তন করেছেন পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। শিবনাথ শাস্ত্রী বলেছেন বিদ্যাসাগরের ‘সর্বতো সুন্দর স্বদেশপ্রিয়তা প্রায় দেখা যায় না।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ’বিদ্যাসাগর ছিলেন ভারতবর্ষীয়।’ বামপন্থীরা যখন এই মনীষীদের বিদ্যাসাগর বিশ্লেষণকে গ্রহণ ও অনুসরণ করেন তখন মাননীয় মন্ত্রীর বামপন্থী ধারা ভাঙার ঘোষণা নিয়ে বিদ্যাসাগর চিন্তক, বিদ্যাসাগর প্রেমী দেশবাসীর মনে শঙ্কিত প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?

 

শিবনাথ শাস্ত্রী বলেছেন বিদ্যাসাগরের  ‘সর্বতো সুন্দর স্বদেশপ্রিয়তা প্রায় দেখা যায় না।’ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ’বিদ্যাসাগর ছিলেন ভারতবর্ষীয়।’ বামপন্থীরা যখন এই মনীষীদের বিদ্যাসাগর বিশ্লেষণকে গ্রহণ ও অনুসরণ করেন তখন মাননীয় মন্ত্রীর ‘বামপন্থী ধারা’ ভাঙার ঘোষণা নিয়ে বিদ্যাসাগর চিন্তক, বিদ্যাসাগর প্রেমী দেশবাসীর মনে শঙ্কিত প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয়?

Comments :0

Login to leave a comment