Jadavpur University Neha Srijan

সঙ্ঘের হুমকি উড়িয়ে ভিড় উপচে পড়ল যাদবপুরের ছাত্র কনভেনশন

সম্পাদকীয় বিভাগ

সোমবার যাদবপুরে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির কনভেনশন হয় গান্ধী ভবন চত্বরে।

 মাঝপথেই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির যৌথ কনভেনশনের জায়গা বদল করতে হলো। সোমবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কে পি বসু মেমোরিয়াল হলে অনুষ্ঠান শুরু হলেও, ভিড় সামলাতে না পেরে অনুষ্ঠান সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো গান্ধী ভবনের চত্বরে। এবিভিপি’র তৈরি করা একের পর এক বাধা মাড়িয়েই সোমবার ছাত্র-ছাত্রীদের কনভেনশন হলো। বিষয় ছিল ‘জেনজি আন্দোলন: প্রজন্ম ও প্রতিরোধের ঐক্য’।
ভোটাধিকার থেকে শিক্ষাব্যবস্থা রক্ষার দাবিতে ছাত্রদের কনভেনশন হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। উপস্থিত ছিলেন এসএফআই’র সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য, আইসা’র সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা, সিজেপি’র রাজ্য কনভেনর দেদীপ্য গাঙ্গুলি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ স্কলার্স অ্যাসোসিয়েশন (জুর্সা)-র সম্পাদক শিল্পী আফরিন, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের ছাত্র নেতা সহ বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। 
এদিন সকালেই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করে কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয় এবিভিপি। বিক্ষোভ বা আক্রমণের নানা আশঙ্কা থাকলেও সে পথে হাঁটার সাহস করেনি তারা। কনভেনশনে ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। কে পি বসু মেমোরিয়াল হলে ঠাসা ভিড়, অন্যদিকে হলের বাইরের ভিড় বাড়তে থাকায় মাঝপথেই অনুষ্ঠান থামিয়ে জায়গা বদল করতে বাধ্য হয় আয়োজকরা। 
দিল্লির যন্তর-মন্তরে এসআইআর বিরোধী আন্দোলনে আটক করা হয়েছিল নেহা বোরা এবং সৃজন ভট্টাচার্যকে। রবিবার তাঁরা কনভেনশনে যোগ দিয়েছেন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে এসআইআর’র তীব্র সমালোচনা করেন সৃজন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৮০ বছর পর আমরা আবার সেই অন্ধকার যুগে পিছিয়ে গেছি। বর্তমান সরকারের দৌলতে নাগরিকরা তাঁদের ভোটদানের অধিকার হারাতে বসেছে। পরিকল্পিতভাবে ওরা রাজনীতির বিষয়বস্তু পালটে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা, সমাজ সংস্কারকরা, গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ, নেহরু-আম্বেদকর, সুভাষচন্দ্র বসু সহ আরও অনেকে মিলে ধাক্কা দিয়ে আমাদের দেশটাকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে গেছেন। সেই দেশটাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের কাজ ছিল। তার জন্য জন্য তর্ক-বিতর্ক হতো। সংবিধান প্রদত্ত কথা বলার অধিকারটুকু আমরা দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে অর্জন করেছি। এবার এখান থেকে খেতে পাওয়ার লড়াই, কাজ পাওয়ার লড়াই, শিক্ষা পাওয়ার লড়াই, কম পয়সায় চিকিৎসা পাওয়ার লড়াইয়ের দিকে কিভাবে দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে  বিতর্ক হতে পারত। কিন্তু বর্তমানে আম্বেদকরের সংবিধানে শপথ নিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে আম্বেদকরকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। তার উলটো দিকে আম্বেদকরের ছবি নিয়ে আম্বেদকরকে রক্ষা করার জন্য লড়তে হবে।
নেহা বোরা এদিন বলেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রক্তের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সেই গণতন্ত্র ও সংবিধানকে ধ্বংস করতে চাইছে আরএসএস-বিজেপি। দেশের সাধারণ মানুষ তাদের এই উদ্দেশ্য ব্যর্থ করবেন। বর্তমান সরকার মনে করছে, তারা ক্ষমতায় এসেছে মানে সাধারণ মানুষকে মারধর করে দমিয়ে দিতে পারবে। তাই ভেবেই যাদবপুরে একের পর এক আক্রমণ করে, এসআরএফটিআই’তে লাগাতার হামলা। তারপরেও ছাত্র-ছাত্রীদের তাঁরা দমিয়ে দিতে পারেনি। ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে উলঙ্গ হয়ে তামাশা করে। ওরা কি করে জানবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বই এবং জ্ঞানের রাজনীতি হয়। বামপন্থীদের এভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া যায় না। এরা ইতিহাস পড়ে না তাই জানে না। যখন ফ্যাসিবাদী শক্তি সব কিছু ধ্বংস করে মাথা চারা দেয়, ফ্যাসিবাদের সেই দর্প চূর্ণ করে বামপন্থীরাই। 
নেহা বলেন, বিজেপি ভাবছে এতদিন দেশ শাসনের পর বাংলাতেও একইরকম শাসন কায়েম করবে। আর ক্ষমতায় আসার জন্য বিশেষ হাতিয়ার ছিল এসআইআর। ক্ষমতায় এসেই গরিবের ওপর বুলডোজার, শিক্ষাঙ্গনে হামলা, মব লিঞ্চিং শুরু হয়ে গিয়েছে। এরা ভেবেছিল বিশাল জনসমর্থন পেয়েছে। কিন্তু এখন প্রমাণ হয়েছে, সেই সব মিথ্যে। সাধারণ মানুষের জন্য গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ভোটদানের অধিকার। তা কেড়ে নিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করছে এই সরকার। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে বামপন্থীরাই প্রথম সারিতে আছে। আরএসএস বিজেপি’র এই অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে, প্রগতিশীল পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলতে চাই ঐক্যবদ্ধ বাম আন্দোলন। 
সৃজন বলেন, আমরা কখনও ভাবিনি যে নাথুরাম গডসের ছবিতে মালা দেওয়া একদল লোক তাণ্ডব করে বেড়াবে চারদিকে। আর তার উলটো দিকে গান্ধীজীর ছবি ধরে দীপ্সিতাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমরা আজকে যে বাংলায় বাস করছি, সেখানে সুভাষচন্দ্র বসুকে গুন্ডা বললে পার পেয়ে যাওয়া যায়, আর ভণ্ড বাবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে জেলে যেতে হয়। এখন লড়াইটা দাঁড়িয়েছে এতদিন যেটুকু অর্জন করেছিলাম সেটুকুকে রক্ষা করার। সেই রক্ষা করার লড়াইয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে এসেছি। এই ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এই প্রজন্মের হাতিয়ার ঈশ্বরচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, আম্বেদকর, গান্ধীজীরা। 
এদিন বক্তব্য রাখেন জুরসা’র সম্পাদক আফরিন বেগম। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সহ রাজ্যের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বেহাল পরিকাঠামো, সরঞ্জাম, তহবিল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সেই সঙ্গে শিক্ষকদের শাস্তিমূলক বদলি বিল নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, যাদবপুরের মতো উৎকর্ষের কেন্দ্রগুলিকে শেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বিজেপি সরকার। কারণ এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বল্প খরচে প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েরাও শিক্ষার্জনের সুযোগ পায়। সেই সুযোগকেই শেষ করতে চাইছে বর্তমান সরকার। তাই নানা ভাবে আক্রমণ করে চলেছে। যাদবপুর প্রতিবারের মতোই সেই আক্রমণকে প্রতিহত করেছে। আগামী দিনেও এমন আক্রমণের পালটা লড়াইয়ের কথা বলেন ছাত্র নেতারা।
এসআরএফটিআই’র ছাত্র সংসদের সভাপতি ব্লসম হাজারিকা আরএসএস’র হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তাঁর কথায়, যতই আক্রমণ করুক এই ফ্যাসিবাদী শক্তি, ছাত্র-ছাত্রীদের স্বরকে যতই দমন করার চেষ্টা করুক,  তাদের ভাবনা-কল্পনা-মতবাদ কিংবা তাদের উদ্ভাবনকে দমাতে পারবে না। শিল্পের মাধ্যমে প্রত্যেক হামলার তারা জবাব দেবে। 
আইএসআই বিলের মাধ্যমে কীভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত করে তাকে বেসরকারিকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার তার কথা তুলে ধরেন ছাত্র প্রতিনিধিরা। যেখানে এখনও নিখরচায় শিক্ষার্জন করতে পারেন পড়ুয়ারা। সেই প্রতিষ্ঠানকে এই বিলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ঢালাও বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিস্ত শক্তির বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলেন ছাত্র-ছাত্রীরা।

Comments :0

Login to leave a comment