ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ফায়দা তুলতে গিয়ে রাজ্যের নবগঠিত আরএসএস-বিজেপি সরকার গ্রামীণ অর্থনীতিকে শুধু বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়নি একটা বড় অংশের মানুষের রুজি রোজগার বন্ধ করে অসহায় অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ধর্মান্ধ রাজনীতির অত্যুৎসাহে সদ্য গঠিত সরকার গোরু কেনাবেচা ও হত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে হিন্দু গোপালক, দুগ্ধ উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের পথে বসানোর ব্যবস্থা করেছে। শুভেন্দু সরকারের নির্দেশ একমাত্র ১৪ বছর পার করবার পরই কোনও গোরুকে বধ করা যাবে। অবশ্য তার আগে পৌরসভার চেয়ারম্যান অথবা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের সংশাপত্র লাগবে। মুসলিমদের ঈদ উৎসবের আগে তড়িঘড়ি এমন নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে গ্রামে পশুপালন ও দুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদক ও চর্মশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিপুল অংশের মানুষ তাদের রুজি রোজগারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম আতঙ্কে আছেন।
পশুপালনকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির অনেকগুলি শাখা পুষ্ট হয়। তাতে কর্মসংস্থান হয় এক কোটিরও বেশি মানুষের। আর গোটা পরিসরে জড়িয়ে আছে হিন্দু মুসলিম সব সম্প্রদায়ের মানুষ। বাংলার অর্থনীতিতে কৃষির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পশুপালনের। প্রধানত হিন্দুরাই পশুপালনের সঙ্গে বেশি যুক্ত। গ্রামে এমন অসংখ্য পরিবার আছে পশুপালনই একমাত্র রোজগার। পরিবারের সকলেই এই কাজে যুক্ত থাকে। গোরু দুধ দেওয়া বন্ধ করলে অথবা অসুস্থতা ও অন্যান্য কারণে ব্যবহারের উপাযোগী না থাকলে তাদের বিক্রি করে দেয় গোপালকরা। মোষের ক্ষেত্রেও তাই। সাধারণত বিক্রির সর্বোৎকৃষ্ট সময় ঈদ। এই সময় যেমন বিক্রি করা সহজ হয় তেমনি দামও পাওয়া যায় বেশি। অনেক ক্ষেত্রে আগাম অর্থের বিনিময়ে গোরু কেনার বায়নাও হয়ে থাকে। অনেকে ঋণ নিয়ে অনেক বেশি গোরু পালন করে এই সময়ে বিক্রি করে লাভ করার জন্য আবার পারিবারিক বিপদে অর্থের জন্যেও অনেককে গোরু বিক্রি করতে হয়। এবার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে সর্বত্র এমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে যে রাজ্যের সর্বত্র পশুর হাটগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারা বিজেপি জেতার পরই জায়গায় জায়গায় গো পাচার, গো হত্যা ইত্যাদি অজুহাতে হামলা চালানোয় কেউ আর গোরু নিয়ে রাস্তা বেরোবার সাহস পাচ্ছেন না। গোরু কিনতেও কেউ আসছেন না। এই অবস্থায় ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছেন গোপালকরা। দুধ না দেওয়া বা কোনও কাজে না লাগা গোরুগুলিকে তাদের আজীবন খাওয়াতে হবে। আয় বন্ধ হয়ে খরচা বেড়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই পশুপালন পেশা থেকে তারা সরে যাবেন বিকল্প পেশায়।
তখন দুগ্ধ উৎপাদন কমে যাবে। দুধের জোগান কমলে দাম বাড়বে। ছানা, পনির সহ দুগ্ধজাত পণ্য মহার্ঘ হবে। চোখে সরষে ফুল দেখবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন শিল্প। দুধ, ছানা, পনির ইত্যাদির ব্যবসা এবং মিষ্টির সঙ্গে উপার্জন জড়িয়ে আছে লক্ষাধিক কর্মীর। সর্বোপরি পশু বধ বন্ধ হয়ে গেলে চামড়ার সঙ্কট দেখা দেবে। পূর্ব ভারতের বৃহত্তম ট্যানারি রয়েছে বানতলায়। বাংলা তথা প্রতিবেশী রাজ্য থেকেও চামড়া আসে বানতলায়। চামড়ার অভাবে এখানকার লক্ষাধিক কর্মীর রুজি-রুটি বিপন্ন হবে। এককথায় ক্ষমতা দখল করেই বাংলার বিপুল অংশের মানুষের রুটি রুজি কেড়ে নেবার ব্যবস্থা নিয়েছে বিজেপি সরকার। অথচ ভোটের আগে কাজ দেবার, রুজির ব্যবস্থা করার গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে নেতা-মন্ত্রীরা। একইভাবে ক্ষমতার দণ্ড হাতে নিয়েই হকার উচ্ছেদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নতুন শাসক। লক্ষ লক্ষ হকার রেল স্টেশনে কিছু বিক্রি করে কোনোরকমে বেঁচে আছে। বিজেপি তাদের উচ্ছেদ করে পথে বসাতে চায়। এটা কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। মানুষ চোর-দুর্নীতিবাজদের তাড়াতে বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন। তাদের মুখের গ্রাস কেড়ে নেবার জন্য নয়।
editorial
রুজি কাড়তে বেপরোয়া
×
Comments :0