রাজ্যজুড়ে গো-পালকরা আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়েছেন। গোরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তির পরই আর্থিক সঙ্কট চরমে উঠেছে তাঁদের। রাজ্যে পশুহাটগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার এনিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিসন বেঞ্চ এই মামলায় রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে ইন্সট্রাকশন তলব করেছে। বৃহস্পতিবার মামলাটি শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
মামলায় ১৯৫০সালের ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিম্যাল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্টের ধারা অনুযায়ী ধর্মীয় কারণে গোরু জবাইয়ে ছাড় দেওয়ার আবেদন যেমন জানানো হয়েছে, তেমনই এই আইন বাতিলের আরজিও রয়েছে। রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে পশু জবাইয়ের আগে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত এবং পৌরসভা থেকে শংসাপত্র আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখানেও সমস্যা হচ্ছে সাম্প্রতিক ভোটের ফলাফলের পর রাজ্যের অধিকাংশ পঞ্চায়েতে তৃণমূলের প্রধানরা আসছেন না। পৌরসভাগুলিতে প্রাণীসম্পদ বিভাগের পশু চিকিৎসক নেই। ফলে পশুর শরীর-স্বাস্থ্য দেখে যে শংসাপত্র হাতে পাওয়ার কথা তা রাজ্যের কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার ভাঙড়ের ঘোষ সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার মামলা করেছে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পক্ষ থেকে একটি জনস্বার্থের মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব ও রীতিকে সংবিধান বহির্ভূতভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র তথা হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে পশুপালকদের জীবন জীবিকাকে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে নতুন বিজেপি রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি। বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তিটির মাধ্যমে একটি সেকেলে আইনগত কাঠামোকে জবরদস্তি কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যার ফলে সমগ্র রাজ্যে বৈধ গবাদি পশুর ব্যবসা, পশুর হাট, ইদুজ্জোহার কুরবানি, মাংস সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট জীবিকাগুলি কার্যত ধ্বংসের চেষ্টা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ দুগ্ধচাষি সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পাঁচ দিনের মধ্যেই রাজ্য সরকার গত ১৩ মে তারিখে বিজেপি’র রাজনীতি অনুযায়ী গো-হত্যা সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে। এবার থেকে পশু হত্যার আগে শংসাপত্র জোগাড় করতে হবে। শহরে পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির সঙ্গে একজন পশু চিকিৎসকের শংসাপত্র আদায় করতে হবে। এই শংসাপত্রে চেয়ারম্যান কিংবা সভাপতির সঙ্গে পশু চিকিৎসক পশুটি হত্যার উপযুক্ত বললে তবেই মিলবে অনুমতি। সামনেই মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ উৎসব। সুযোগ বুঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় ইন্ধন জোগাতে তড়িঘড়ি পশুহত্যা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিজেপি ঝান্ডা নিয়ে রাস্তায় নেমে পশুপালক, পশুর ক্রেতা-বিক্রেতা, পশু পরিবহণকারীদের উপর জুলুম শুরু হয়েছে। ফলে গোটা রাজ্যে সর্বত্র পশুহাটগুলি রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় পশু নিয়ে কেউ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছেন না। ঈদের আগে পশুহাটগুলিতে ব্যাপক কেনাবেচা হয়। গ্রামবাংলার পশুপালকরা তাঁদের দুধ দেওয়া বন্ধ করা গোরু ও নানা কারণে কাজে লাগে না এমন গোরুগুলি হাটে বিক্রি করে দেন। এবার সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সমূহ আর্থিক সঙ্কটের মুখে। অনেক পশুপালক বাড়িতে তাদের পশু বিক্রির জন্য ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে রেখেছেন। এখন ক্রেতা গোরু না নিয়ে অগ্রিম দেওয়া টাকা ফেরত চাইছেন। যা ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা গরিব পশুপালকের নেই। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির পাশাপাশি পশুপালন একটি অন্যতম রোজগারের পথ। অসংখ্য পরিবারের পশুপালনই একমাত্র রোজগার। সেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই, সবারই রুজির পথ। বেশিরভাগ পশুপালক বিপুল টাকা ঋণ নিয়ে পশুপালন করেন। বছর বছর এই সময় অলাভজনক পশুগুলি বিক্রি করে ঋণ শোধ করেন। এবার নতুন সরকার তাঁদের সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিক্রি করতে না পারলে যেমন টাকার সংস্থান হবে না, তেমনি সেই পশুগুলিকে টাকা খরচ করে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে হবে। এটা তাঁদের কাছে দুঃসাধ্য। নতুন বিজ্ঞপ্তির কারণে চামড়ার জোগানে টান পড়বে। সঙ্কটে পড়বে চর্ম শিল্প ও সেখানকার শ্রমিকরা।
Cowherds
রাজ্যের নির্দেশে গো-পালকরা বিপদে, মামলার শুনানি আজ
×
Comments :0