২০২৫ সাল থেকে এরাজ্যে অবৈধভাবে বসবাসরত অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার করে বিএসএফ’র হাতে তুলে দেবে পুলিশ। বুধবার এই ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বস্তুত, সিএএ আইনে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ধর্মীয় নিপীড়নের মুখে পড়া সাতটি ধর্মপালনকারীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে দেশে। এরাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে এখন মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের চিহ্নিত করে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট ডিপোর্ট’ করার আইন এরাজ্যে কার্যকর করা হবে। নির্বাচনী প্রচারে এসে একথাই বলে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ।
এদিন নবান্ন সভাঘরে সাংবাদিকদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ‘‘সাতটি ধর্মপালনকারী সম্প্রদায় সিএএ অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মধ্যে ২০০৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা এরাজ্যে এসেছেন তাঁদের পুলিশ কোনোভাবেই হেনস্তা করবে না। সিএএ’র আওতায় যাঁরা নেই তাঁরাই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে বিএসএফ’র হাতে তুলে দেবে। বিএসএফ এই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিডিআর’র সঙ্গে কথা বলে ডিপোর্ট করবে।’’ নবান্ন সভাঘরের সাংবাদিক বৈঠক থেকেই শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ ও রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর এদিন থেকেই রাজ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সমস্ত থানাকে এদিন থেকেই আইন কার্যকর করার জন্য ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, তৃণমূল সরকারের আমলে গত বছর ১৪ মে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের আন্ডার সেক্রেটারি প্রতাপ সিং রাওয়াত রাজ্য সরকারকে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফ’র হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিগত সরকার সেই আইন কার্যকর করেনি। এখন সেই আইন কার্যকর করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়ে জানান, ‘‘এবার থেকে রাজ্যে ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট চালু হলো।’’
গত বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের প্রচারে অনুপ্রবেশকে সামনে রেখে সংখ্যালঘূ সম্প্রদায়কে নিশানা করে প্রচার চালিয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। সংখ্যালঘুদের নিশানা করে ঘৃণা ছড়ানোর পথ থেকে ক্ষমতায় আসার পরও যে সরকার নারাজ তা এদিন স্পষ্ট করেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে এরাজ্যে অনুপ্রবেশের প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী এদিন বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ বর্ডার আমাদের দেশের ও রাজ্যের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই রাজ্যে এবং দেশের নানা জায়গায় যে ধরনের দেশবিরোধী কাজ, আইনশৃঙ্খলাজনিত অপরাধ, লাভ জেহাদ, ল্যান্ড জেহাদ , জোর করে ধর্ম পরিবর্তন বিশেষ করে আমাদের নারী নিরাপত্তা, শিশুকন্যাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে যে ধরনের অসামাজিক কাজকর্মের বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছি, তারসঙ্গে যুক্ত যারা, বিভিন্ন প্রদেশে এমনকি এরাজ্যেও যারা ধরা পড়েছে তাদের বড় অংশই বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।’’ মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, এরাজ্যে সঙ্কটের মূলে আছে ভিনদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীরাই। আবার সেই অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে সিএএ আইন করে আগেই ফারাক করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ফলে এরাজ্যে সব ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে যুক্তরা সকলেই বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমান অনুপ্রবেশকারী বলে মনে করে বিজেপি।
সেই বাংলাদেশের সঙ্গে এরাজ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ কিমি এলাকা সীমান্ত আছে। রাজ্য মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠক থেকে বিজেপি সরকার সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতার দেওয়ার সঙ্গে বিএসএফ’র আউটপোস্ট ও অন্যান্য পরিকাঠামো গড়ার জন্য জমি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এদিন বিএসএফ’র ডিজি পরভীন কুমার সহ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পদস্থ কর্তাদের উপস্থিতিতে সেই জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করল রাজ্য সরকার। এতদিন সীমান্তে জমি তুলে দেওয়ার কাজ থমকে ছিল। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও জমি তুলে দেওয়ার বিষয়ে মমতা ব্যানার্জির সরকারে গড়িমসি ছিল।
গোটা দেশের চারটি রাজ্যের মধ্যে বাংলাদেশ সীমানা আছে প্রায় ৪ হাজার কিমি এলাকাজুড়ে। তারমধ্যে এরাজ্যের ২ হাজার ২০০ কিমি এলাকার মধ্যে ১ হাজার ৬০০ কিমি এলাকায় কাঁটাতার আছে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানিয়েছেন, ‘‘বাকি ৬০০ কিমি এলাকার মধ্যে বিগত রাজ্য সরকার ৫৫৫ কিমি এলাকায় চাইলেই জমির ব্যবস্থা করতে পারতো। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে, ভোটব্যাঙ্কের জন্য তোষণের জন্য করেনি।’’ ২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র রাজনাথ সিং, তারপরে বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ নবান্নে এসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে বিএসএফ’র হাতে জমি তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন বিগত রাজ্য সরকারের কাছে চিঠি দেন ও পাঁচ থেকে ছয়বার সভা করেও সীমান্তে জমির ব্যবস্থা করতে পারেননি।
এদিন রাজ্য সরকারের তরফ থেকে ২৭ কিমি এলাকার কাঁটাতার দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি জমির কাগজ তুলে দেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, ‘‘আগামীদিনে সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে যতটা জমি দেওয়া দরকার তা আমরা বিএসএফ’এর হাতে তুলে দেব।’’ সীমান্তে জমি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি এতদিন রাজ্যে সীমান্তবর্তী জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বিএসএফ সহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার সমন্বয় বৈঠক থমকে ছিল। এবার থেকে নিয়ম মেনে সেই বৈঠকের আয়োজন করবে জেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যেই রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলা প্রশাসন বৈঠক শুরু করেছেন। বিএসএফ’র ডিজি জানিয়েছেন, রাজ্য সরকারের কাছে আমরা আমাদের হাতে আসা চোরাকারবারি সহ অন্যান্য তথ্য প্রতিনিয়ত সরবরাহ করব। যাতে রাজ্য প্রশাসনের কাজের সুবিধা হবে।’’
deport infiltrators
২০২৪-র পর আসা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে রাজ্য
×
Comments :0