Ashis Banerjee

প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক আশিস ব্যানার্জির অস্বাভাবিক মৃত্যু , চাঞ্চল্য রামপুরহাটে

রাজ্য জেলা

রামপুরহাট বিধানসভার পাঁচ বারের বিধায়ক প্রাক্তন মন্ত্রী ও রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস ব্যানার্জি প্রয়াত হয়েছেন। বয়স হয়েছিল ৭৫। স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে,  রবিবার সকালে রামপুরহাট শহরের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের নিজের বাসভবনের কাছে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে তাঁর ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে রামপুরহাট থানার পুলিশ। দেহের সঙ্গে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবর। তাতে তিনি লিখে গিয়েছেন, ‘‘‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’’ নিজের রাজনীতিতে আসা নিয়ে আক্ষেপও করেছেন আশিস ব্যানার্জি। পরিবারের সদস্যদের কাউকে ভবিষ্যতে রাজনীতিতে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পুলিশ তাঁর দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। তাঁর দেহের সঙ্গে যে ‘সুইসাইড নোট’টি পাওয়া গিয়েছে, সেখানে তিনি বার বার দাবি করেছেন, তিনি কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। দলের অন্যায়কে মেনে নিতে না পারলেও তিনি কখনও প্রতিবাদ করতে পারেননি। নোটে তিনি লিখেছেন, ‘‘ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কোনও দিনই কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। রাজনৈতিক বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছে। কখনও শত্রুতার রূপ নেয়নি। সর্বদা সব দলীয় অন্যায়কে মেনে নিতে না পারলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। সারাজীবন এক পয়সা কোনও কাজের বিনিময়ে নিইনি।’’ তারাপীঠ রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি-তে (টিআরডিএ) তাঁর তেমন কোনও ক্ষমতা ছিল না, চিঠিতে দাবি করেছেন। অভিযোগ, তাঁকে ছোট করার জন্য অনেক কিছু করা হয়েছে। সেই প্রচেষ্টাকে ধিক্কার জানিয়েই আশিস ব্যানার্জি উপলব্ধি রাজনীতিতে আসা ভুল হয়েছে। চিঠিতে লিখেছেন, ‘‘টিআরডিএ-তে জেনারেল মিটিং ছাড়া আর কোনও দায়িত্ব ছিল না। আমি টেন্ডার কমিটিতে ছিলাম না। আমার চেক পাওয়ার ছিল না। আমি প্ল্যান পাস বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট ইস্যুর ব্যাপারেও ছিলাম না। আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনও দিন কেউ আলোচনা করেননি। আমাকে অপমান (ম্যালাইন) করার জন্য যা সব করা হল, তাকে ধিক্কার জানাই। আজ তাই মনে হচ্ছে, রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছে। আমার বংশের ছেলেদের রাজনীতি না করার পরামর্শ দিচ্ছি। ওরা ওদের নিজ নিজ কাজের মধ্যে থাক। তিনি রামপুরহাট কলেজের অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ বছর ধরে। মৃত্যুর আগে লেখা চিঠিতে ছাত্রছাত্রীদেরও স্মরণ করেছেন প্রবীণ নেতা। লিখেছেন, ‘‘সারা জীবন শিক্ষকতা করেছি। কোনও দিন ক্লাস ফাঁকি দিইনি। স্পেশাল ক্লাস নিয়েছি। ছাত্রদের অনেককে বিনা পয়সায় পড়িয়েছি। ওদের প্রচুর ভালবাসা পেয়েছি।’’ এর পর পরিবারের সদস্যদের নাম করে করে তাঁদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। শেষে লিখেছেন, ‘‘তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’’ চিঠিতে রাজনীতিতে যুক্ত কারও নাম উল্লেখ করেননি। সরাসরি কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আনেননি। কে বা কারা তাঁকে অপমান করার চেষ্টা করেছেন, তা-ও খোলসা করেননি। আশিস ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা রামপুরহাটের বিধায়ক ছিলেন। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর মমতার মন্ত্রিসভাতেও ঠাঁই পেয়েছিলেন। তিনি রাজ্যের প্রাক্তন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী এবং কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিধানসভায় ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২২ সালে রামপুরহাটের বগটুইতে গণহত্যার ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। তবে নিজের এলাকায় ভোট সম্পর্কে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। ২০২৬ বিধানসভা ভোটে তাঁকেই টিকিট দিয়েছিলেন মমতা ব্যানর্জি। বিজেপি প্রার্থীর কাছে তিনি হেরে যান ২৪ হাজারের বেশি ভোটে। তার পর থেকে রাজনীতিতে তাঁকে আর তেমন সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। ‘সুইসাইড নোট’টি তাঁরই লেখা কি না, কী কারণে কী ভাবে তাঁর মৃত্যু হল, পুলিশ খতিয়ে দেখছে।
রবিবার দুপুরে ময়না তদন্তের পর রামপুরহাট হাসপাতাল থেকে দেহ আনা হয় তাঁর বাড়িতে। সেখান থেকে দেহ নিয়ে যাওয়া হয় রামপুরহাট কলেজে। সেখানে দলীয় ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সহ অধ্যাপক, অধ্যাপিকা ও শহরের বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তি বর্গ তাঁর দেহতে মাল্যদান করেন। সেখানে মাল্যদান করে শেষ শ্রদ্ধা জানান সিপিআই(এম) নেতা সঞ্জীব মল্লিক, অভিতাভ সিং প্রমুখ। প্রয়াত আশিস ব্যানার্জি রেখে গেছেন স্ত্রী ও ছেলেকে। তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় তারাপীঠ মহা শ্বশানে।

Comments :0

Login to leave a comment