জলপথ পরিবহণ থেকে আকাশপথ পরিবহণ, গঙ্গাসাগর মেলা ঘিরেও ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গঙ্গাসাগর মেলায় ১ কোটির বেশি যাত্রীর অংশগ্রহণের দাবি সরকারি তরফে করা হলেও তথ্যের অধিকার আইনে পরিবহণ দপ্তরে পাঠানো প্রশ্নের উত্তরে জানা গেছে, মেলায় ঢোকা এবং বের হওয়ার জন্য মাত্র ৫ লক্ষ টিকিট ছাপিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ভূতল পরিবহণ নিগম। অথচ সোমবারই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘গঙ্গাসাগর মেলার প্রথম দিনেই ৪৫ লক্ষ পুণ্যার্থীর আগমন ঘটে গেছে।’ প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কী জাল টিকিটের কারবারে সরকারি কোষাগারের টাকা অন্য কোথাও ঢুকছে?
একদিকে জলপথ পরিবহণের টিকিটের হিসাবেই গরমিল যাচ্ছে। অন্যদিকে গঙ্গাসাগর মেলায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স হিসাবে হেলিকপ্টারের ব্যবহার ও তার খরচ নিয়ে এবং সিসিটিভি ব্যবহারের জন্য খরচ নিয়ে তথ্যের অধিকার আইনে জানতে চাওয়া হলেও প্রশ্নের জবাবই দেওয়া হয়নি সরকারের তরফ থেকে।
গঙ্গাসাগর মেলা সংগঠিত করতে রাজ্য সরকারের খরচের পরিমাণ প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে সক্রিয় সমাজ ও আইন গবেষক বিশ্বনাথ গোস্বামী জানিয়েছেন, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলকে (সিএজি) দিয়ে মেলাবাবদ পূর্ণ খরচের অডিট করানো হয়নি। সিএজি’র কাছ থেকে প্রাপ্ত আংশিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, মেলার জন্য লজিস্টিক খরচ যা ২০১২-১৩ সালে ছিল মাত্র ২৫ কোটি টাকা, সেটা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে বিশেষ করে নির্বাচনের বছরে। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৫২ কোটি টাকা হয়েছিল, ২০২১ সালে লাফিয়ে বেড়ে ১০৯ কোটি টাকা হয়ে যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এখন তা দেড়শো কোটি টাকার বেশি। বিশেষ করে আইপ্যাক রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলিতে জাঁকিয়ে বসার পরে খরচ বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু এই টাকা কোথায় কীসের জন্য খরচ হচ্ছে তা পুরোপুরি অস্বচ্ছ।
বিশ্বনাথ গোস্বামী তথ্যের অধিকার আইনে পরিবহণ দপ্তরের কাছে বিস্তারিতভাবে জানতে চেয়েছিলেন গঙ্গাসাগর মেলায় হেলিকপ্টারের ব্যবহার সম্পর্কে, কতজন রোগী এবং কতজন ভিআইপি’কে নিয়ে হেলিকপ্টার যাতায়াত করেছে এবং তার জন্য খরচের হিসাব চেয়েছিলেন। সেই প্রশ্ন, ভূতল পরিবহণ নিগম, দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দপ্তর ঘুরে দপ্তরে ফেরত গেছে কিন্তু উত্তর আসেনি। গোস্বামী জানিয়েছেন, হেলিকপ্টার সংক্রান্ত তথ্য চাওয়ায় আমাকে হেনস্তা হতে হয়েছে, কিন্তু উত্তর পাইনি। আর মেলায় সিসিটিভি’র সংখ্যা, সেগুলির আইপি অ্যাড্রেস, ডিভিআর সম্পর্কে তথ্য চাইলে প্রশ্নটাই উধাও হয়ে যায়। পুনরায় প্রশ্ন পাঠালেও আজ পর্যন্ত জবাব হোল্ডে রেখে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। মেলা ঘুরে আমি নিশ্চিত বহু ক্ষেত্রে পুলিশের লাগানো সিসিটিভি’কেই মেলার জন্য লাগানো পৃথক সিসিটিভি বলে চালানো হয়েছে এবং সেগুলির সবকটিও কার্যকর নেই। হেলিকপ্টার এবং সিসিটিভির বরাতে বড় ধরনের দুর্নীতি আছে বলেই তথ্য চেপে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু দুটি তথ্য পেয়েছেন তিনি, আর তাতেই দুধে জলের পরিমাণ আন্দাজ করা যাচ্ছে। সাগরদ্বীপে গঙ্গাসাগর মেলায় নদীপথে প্রবেশ ছাড়া এখনও উপায় নেই। ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভূতল পরিবহণ নিগমের ছাপানো ও বিক্রি হওয়া টিকিটের সংখ্যা থেকে মেলায় সমাগতদের সংখ্যা সহজেই অনুমেয়। গতবারের গঙ্গাসাগর মেলায় ১ কোটি ১০ লক্ষ যাত্রী সমাগম হয়েছিল এবং এবারের মেলায় সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করেছেন। কিন্তু এবারে গঙ্গাসাগর মেলার জন্য পশ্চিমবঙ্গ ভূতল পরিবহণ নিগম কত টিকিট ছাপিয়েছে? বিশ্বনাথ গোস্বামী জানিয়েছেন, তথ্যের অধিকার আইনে প্রশ্নের জবাবে নিগম জানিয়েছে গত কয়েক বছরের মতো এবারও প্রেস থেকে গঙ্গাসাগর মেলার দিনগুলির জন্য ৫ লক্ষ টিকিট ছাপানো হয়েছে। গতবছর টিকিট বিক্রি হয়েছিল ১লক্ষ ৯৩ হাজার, বাকি ৩লক্ষ ৭ হাজার ফেরত এসেছিল। এবারও যে টিকিট বিক্রির হাল এমনই হবে তার নমুনাও পেয়েছি, মেলায় সোমবার বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত ৩০ হাজার টিকিট বিক্রি হয়েছে বলে জানতে পেরেছি পরিবহণ দপ্তর সূত্রেই। যাতায়াত ধরলে টিকিট বিক্রির অর্ধেক সংখ্যক যাত্রী মেলায় প্রবেশ করেছেন।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে এক দেড় কোটি যাত্রী কি বিনা টিকিটে যাতায়াত করছেন মেলায়? এটা তো হতেই পারে না! এর পিছনে নিশ্চিতভাবে বড় ধরনের দুর্নীতির কারবার রয়েছে। কারা কাদের মদতে কীভাবে জাল টিকিট বেচে সরকারি কোষাগারের কয়েকশো কোটি টাকা লুট করছে তা তদন্ত করে বের করা হোক। এর সঙ্গে হেলিকপ্টার, সিসিটিভি এবং অন্যান্য আর্থিক অস্বচ্ছতার অনুসন্ধান করলে কয়েক বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি কেলেঙ্কারি নিশ্চিতভাবে প্রকাশিত হবে।
নমুনা হিসাবে তিনি সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করেই দেখিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর প্রচারের উদ্দেশ্যে গঙ্গাসাগর মেলায় যাত্রীদের ‘বন্ধন’ নামের একটি সার্টিফিকেট দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে যাত্রীদের নিজের ফটোও থাকবে। প্রতিটি সার্টিফিকেট দিতে কত খরচ ধরা হয়েছে সরকারি খাতায় এবং এর জন্য কত ব্যয় হয়েছে? গতবারের মেলায় ১৫ লক্ষ সার্টিফিকেট বণ্টনের দাবি করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু তথ্যে দেখা যাচ্ছে মোট ৯টি ‘ফটো বুথ’ কেন্দ্র থেকে মাত্র ৪৪১২টি সার্টফিকেট প্রদান করা হয়েছে। তাহলে বাকি সার্টিফিকেটের টাকা কোথায় চলে গেছে?
ganga sagar mela
গঙ্গাসাগরেও বিপুল দুর্নীতি
×
Comments :0