west bank

যুদ্ধ ছাড়াই ইজরায়েলের আগ্রাসন চলেছে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে

বিশেষ বিভাগ

নীলাদ্রি সেন

গাজায় ইজরায়েলের হানাদারিকে দীর্ঘায়িত করে কখনো যুদ্ধ কখনো বা যুদ্ধবিরতিতে দুনিয়ার নজর আটকে রেখে বিশ্বের অগোচরে অন্য এক যুদ্ধে মেতে উঠেছে হোয়াইট হাউস। যে যুদ্ধের কোনও খবর নেই মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়। ওয়াশিংটন এই নতুন কৌশলে দুনিয়ার নজরের বাইরে ইজরায়েলকে মদত দিয়ে প্রতিদিন  চালিয়ে যাচ্ছে নির্মম হানাদারি ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে। গত দু’বছর ধরে প্যালেস্তাইনের সন্ত্রাসবাদীদের দমন করবার অজুহাত দিয়ে ইজরায়েল বাহিনী ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে বিদ্রোহ দমন অভিযানের নামে অত্যাচার ক্রমশ বাড়িয়ে তুলেছে। কখনো অপারেশন আয়রন ওয়াল, কখনো অপারেশন সামার ক্যাম্পস, কখনো অপারেশন ফাইভ স্টোনস্ নাম দিয়ে পরিকল্পিতভাবে যখন তখন জঘন্য অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে ইজরায়েল।

চার হাজার বছর আগের সেই প্যালেস্তাইন মানচিত্র থেকে কবেই উধাও হয়ে গেছে। যার বিস্তৃতি লেবানন পাহাড়ের পাদদেশ ছুঁয়ে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আজকের ধ্বংস স্তূপেও মাথা উঠিয়ে থাকা প্যালেস্তাইন সীমাবদ্ধ গাজা স্ট্রিপ ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক মাত্র এই দুই ভূখণ্ডে। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের পূর্বদিকে জর্ডন নদী আর ডেড সি। যেটি আসলে একটি বিশাল আকৃতির লবণাক্ত জলাশয়। ডেড সির জলে লবণের ঘনত্ব এতটাই যে সাঁতার না জানলেও সেখানে কেউ ডুবে না গিয়ে ভেসে থাকে। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের পূর্ব তীরবর্তী এলাকা থেকে জোর করে প্যালেস্তিনীয় অধিবাসীদের বিতাড়িত করে দখল করে রেখেছে ইজরায়েল। এখানে প্যালেস্তাইনের জমি দখল করে ঘাঁটি গেড়ে বসে সিংহভাগটা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ইহুদিরা।

গত বছর ইজরায়েলের সেনারা ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক থেকে হিংস্রভাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ৫০ হাজার প্যালেস্তাইনবাসীকে উৎখাত করে। সেই ১৯৬৭ সাল থেকে ইজরায়েল এই জঘন্য দখলদারি চালিয়ে আসছে। ইজরায়েলের সেনারা জেনিন ও তুলকারেমের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়। তাদের নিজেদের বাসগৃহের অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। এই উচ্ছেদ করা উদ্বাস্তু শিবিরে এখন সামরিক বাহিনীর উত্তরের দুটি সদর কার্যালয় চলছে। এখানে সড়ক, পয়ঃপ্রণালি ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। জেনিনের ৭০ শতাংশ রাস্তা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। জেনিন ও তুলকারেমের প্রায় সবকটি জলের পাইপলাইন ও নিকাশি প্রণালি এক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে দেওয়া হয়। লক্ষাধিক ডলারে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক পরিকাঠামোকে এভাবে নিমেষে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার নিরীহ বসবাসকারী অসহায়ভাবে জল ও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থার মধ্যে পড়েন যার এখনো পর্যন্ত কোনোরকম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

এর সমান্তরাল ইজরায়েল বাহিনী তার হিংসার ভৌগোলিক পরিধিকে ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। ইজরায়েলের বাহিনী এখন প্রতিদিন অভিযান চালাচ্ছে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের কেন্দ্রে অবস্থান করা রামাল্লা ও আরিহা (জেরিকো) এবং দক্ষিণের আল-খালিল (হেবরন) এবং বেথলেহেমে। সপ্তাহ খানেক আগে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অজুহাত দিয়ে ইজরায়েল সেনারা আল-খালিল (হেবরন) এ এক বড়সড় অভিযানে নামে। গোটা শহরে লকডাউন জারি হয়। শহরের রাস্তাজুড়ে ইজরায়েলের ট্যাঙ্ক দাপিয়ে বেড়ায়। পুরুষদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে ব্যাপক ধরপাকড় করে বেধড়ক মারধর করা হয়। তবে শুধু সেনা অভিযান চালিয়েই ইজরায়েল হাত গুটিয়ে বসে নেই। সেনার সাথে ইজরায়েল থেকে আমদানি করা হচ্ছে এক ধরণের গুণ্ডা বাহিনীকে, যারা ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী প্যালেস্তাইনের বাসিন্দাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাদের উৎখাত করছে। এখানে ইজরায়েল সেনারাই এইসব প্যালেস্তাইনবাসীদের চিহ্নিত করে দিচ্ছে। তাদের সম্পত্তি জমিজমা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সেই জায়গায় বেআইনিভাবে বসতি গেড়ে বসছে ইজরায়েল থেকে আসা এই গুন্ডা বাহিনী। তাদের জন্য ইজরায়েল থেকে দেওয়া হচ্ছে ঢালাও দামি অস্ত্র যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার তৈরি করা এম ১৬ পিস্তল এবং ড্রোন আর তাদের মর্জিমতো যখন ইচ্ছে তখন তা ব্যবহার করাতে কোনও বাধা নেই।

‘প্যালেস্তাইনের কোনও ভবিষ্যৎ নেই।’ ইজরায়েল থেকে আসা বাহিনীর থেকে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের প্রধান সড়কগুলোতে বিশাল বিশাল বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক সপ্তাহে গড়ে আটজন করে প্যালেস্তাইনবাসী খুন হয়ে যাচ্ছেন ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে। আহত হচ্ছেন ৮৮ জন। গ্রেপ্তার হচ্ছেন ১৮০ জন। ১২ জনেরও বেশি প্যালেস্তাইনবাসীকে বেধরক মারধর করা হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদের নামে। ১০০ টি করে ইজরায়েলী গুন্ডা বাহিনীর হিংসাত্মক ঘটনা ঘটছে। ৩০০ টি করে ইজরায়েলের সেনা অভিযান ও প্যালেস্তাইনবাসীদের ১০টি করে বাড়ি অথবা সম্পত্তি ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসবই ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের সাপ্তাহিক গড় ঘটনাবলী। এর থেকে ইজরায়েল সেনা অথবা সেখান থেকে আসা গুন্ডা বাহিনীর ছড়ানো হিংসা আতঙ্কের সঠিক পরিমাপ করা যায় না যা ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে থাকা প্যালেস্তাইনবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।

বছরে ১ হাজারের বেশি সেনা অভিযান, ক্রমশ বেড়ে চলা ইজরায়েল থেকে আসা গুন্ডা বাহিনীর বসতি, হাজার পার করা সামরিক চেকিং পয়েন্টস, পরিকল্পিত নজরদারি এর সবটাই এখন ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের বসবাসকারী প্যালেস্তাইনবাসীদের গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। হিংসার ঘটনা ঘটছে নিত্যনৈমিত্তিক। কখন মানুষ ঘুমোতে পারবেন ? শিশুরা কোথায় খেলবে ? কবে স্কুলে যেতে পারবে ? ব্যবসা বাণিজ্য আদৌ চালু করা যাবে তো ? প্রশ্নের পর প্রশ্ন ঝড়ের গতিতে ঘোরাফেরা করছে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের আকাশে বাতাসে। কিছু প্যালেস্তাইনবাসীকে যখন দাঁড় করানো হচ্ছে বন্দুকের নলের মুখে তখন বাকিদের ঠেলে ফেলা হচ্ছে আতঙ্কের অন্ধ গহ্বরে। ইজরায়েল সফল হয়েছে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে এটা নিশ্চিত করে দিতে যে এক চিলতে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিমেষের মধ্যে কীভাবে রণাঙ্গন হয়ে উঠতে পারে। ইজরায়েলের সেনারা পরিকল্পিতভাবে কারেন্সি বিনিময়ের দোকানগুলোতে হানা দিয়ে লুটপাট চালাচ্ছে। এমনকি গৃহস্থালিতে হানা দিয়ে দুর্মুল্য সোনা ও রুপার জিনিসপত্র লুট করে নিচ্ছে। এইসবই ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে এখন প্রাত্যহিক ঘটে চলেছে।

তীব্র সামরিক আগ্রাসন। যেমনটা গাজায় হল সেই পথে হাঁটছে না ওয়াশিংটন। সহযোগী ইজরায়েলও। অন্তত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে। যুদ্ধ সব সময় বোম ফেলে করা হয় না। চেকিং পয়েন্টস, এলাকাগত নিয়ন্ত্রণ, পারমিট, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং প্যালেস্তাইনবাসীর সঞ্চিত সম্পদের লুটপাট এইসব কৌশল নিয়েও করা যায়। যারমধ্য দিয়ে স্বভূমিতে বসবাসকারীদের অধিকার কেড়ে নিয়ে জনসংখ্যার তালিকা থেকে তাদের ছেঁটে ফেলা যায়। গত বছর ইজরায়েল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেআইনী ‘ই-ওয়ান বসতি প্রকল্প’ গড়ে তোলবার। আশঙ্কা, এই ২০২৬ সালেই এই উদ্দেশ্যে জেরুজালেমের কাছে, জর্ডনের উপত্যকায় এবং রামাল্লাজুড়ে বসতির এলাকাকে আরো বিস্তার করতে পারে ইজরায়েল। এরফলে অবধারিতভাবে দক্ষিণের দিক থেকে উত্তর দিক ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক ইজরায়েলের দখলে থাকা পূর্ব জেরুজালেম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ইজরায়েল থেকে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে ঘাঁটি গাড়তে আসা লোকজনকে তাই এখনই প্যালেস্তাইনের রাস্তায় ও তাদের বাড়িতে ইজরায়েলের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিতে দেখা যাচ্ছে বিজয়ের প্রতীক হিসাবে। এই হল আজকের ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে রণাঙ্গনহীন নির্মম একতরফা যুদ্ধের ছবি।

Comments :0

Login to leave a comment