‘ঘোটালা’ করতেও মোদীর প্রকল্প। কীভাবে সরকারের টাকা লুটতে হয় তার জন্য প্রধানমন্ত্রী নতুন ‘দক্ষতা’ বিকাশ প্রকল্প চালু করেছে কেন্দ্রের সরকার। সরকার নিজেই কেলেঙ্কারি করার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পরই মোদী ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা (পিএমকেভিওয়াই) নামে গালভরা এক প্রকল্প চালু করেছিলেন। এই প্রকল্পের অধীনে ২০১৫ থেকে ২০২২—এই সময়কালে সরকার ১০,১৯৪ কোটি টাকা খরচ করেছে। আর এবার যদি এই প্রকল্প নিয়ে সিএজি’র মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কেলেঙ্কারি সামনে নিয়ে এসেছে। কী ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছে, তা মানুষের আন্দাজের বাইরে। সিএজি তার রিপোর্টে ভয়ানক সব গুরুতর অনিয়মের ছবি তুলে ধরেছে। সামান্য কিছু নমুনাতেই অতীতে সব কেলেঙ্কারিকে ছাপিয়ে যেতে পারেন নরেন্দ্র মোদী। হিসাব অনুযায়ী ৯৫ লক্ষ তরুণকে এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এদের সকলকে সরাসরি ৫০০টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কত লোকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না? তালিকা খুঁজে দেখা যাচ্ছে ৯০ লক্ষ প্রার্থীর কোনও বৈধ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নাম্বারই নেই। সিএজি রিপোর্ট বলছে, পিএমকেভিওয়াই ২.০ ও ৩.০-র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৯৫,৯০,৮০১ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৯০,৬৬,২৬৪ জনের (৯৪.৫৩ শতাংশ) ক্ষেত্রে ‘ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ডিটেলস’ ঘরে শূন্য, কিছুই নেই অথবা ফাঁকা ছিল। বাকি ৫,২৪,৫৩৭ জনের ক্ষেত্রে একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট লেখা ছিল। কিন্তু তার মধ্যে ১২,১২২টি ইউনিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে—৫২,৩৮১ জন প্রার্থীর জন্য দু’বার বা তার বেশি।
এখানেই শেষ নয়, এর পরেও যারা রয়েছে, তাঁদের কারও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর ‘১১১১১১১১১১১’ কিংবা ‘১২৩৪৫৬৭৮৯’। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর হিসাবে ‘১১১১১১১১১১১’-এর মতো সংখ্যা ব্যবহার, একাধিক উপভোক্তার জন্য একই ছবি, ৩৪ লক্ষেরও বেশি প্রার্থীর অর্থপ্রদান এখনও বকেয়া এবং তালাবন্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র—কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্ল্যাগশিপ দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা (পিএমকেভিওয়াই)-র বাস্তবায়নে এমনই করুণ সমস্ত ছবি তুলে ধরেছে সিএজি।
২০১৫ থেকে ২০২২—এই সময়কালের তিনটি ধাপে পিএমকেভিওয়াই রূপায়ণের উপর সিএজি-র নিরীক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি লোকসভায় পেশ করা ওই প্রতিবেদনের গুরুত্ব এই কারণে যে, যুবসমাজের বেকারত্ব মোকাবিলায় দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার যে বড় উদ্যোগগুলির কথা বলেছে, তার অন্যতম এই প্রকল্প। উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ১৫–২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৫ শতাংশ।
২০১৫ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল শিল্প-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন দিয়ে বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতীকে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলা। ২০১৫–২২ সময়কালে তিন ধাপে প্রকল্পটির মোট বরাদ্দ ছিল আনুমানিক ১৪,৪৫০ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল ১.৩২ কোটি প্রার্থীকে প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন দেওয়া। এই সময়ে মোট ১.১ কোটি প্রার্থীকে সার্টিফাই করা হয়েছে।
সিএজি জানিয়েছে, স্কিল ইন্ডিয়া পোর্টাল (এসআইপি)-এ নথিভুক্ত প্রার্থীদের ইলেকট্রনিক পরিচয় ও যোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্য নিরীক্ষা করতে গিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বরে ব্যাপক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিএমকেভিওয়াই ২.০ ও ৩.০-র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৯৫,৯০,৮০১ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৯০,৬৬,২৬৪ জনের (৯৪.৫৩ শতাংশ) ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বিবরণ ফাঁকা ছিল। বাকি ৫,২৪,৫৩৭ জনের ক্ষেত্রে ১২,১২২টি ইউনিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর একাধিকবার ব্যবহৃত হয়েছে—৫২,৩৮১ জন প্রার্থীর জন্য দু’বার বা তার বেশি।
এমনকি যেখানে একজন প্রার্থীর জন্য একটি করে অ্যাকাউন্ট নম্বর দেখানো হয়েছে, সেখানেও স্পষ্টতই ভুল নম্বর পাওয়া গেছে—যেমন ‘১১১১১১১১১১১…’, ‘১২৩৪৫৬…’, এক অঙ্কের নম্বর, কিংবা শুধু লেখা, নাম, ঠিকানা বা বিশেষ চিহ্ন। তেমনই নেই ১০লক্ষ ৫৬ হাজার ৪৭৫ জনের না আছে কোনও ইমেল আইডি, না ফোন নম্বর। কারও আছে ১১১১১১১১ ফোন নম্বর, আবার কারও ইমেল আইডি abcd@gmail.com কিংবা 123@gmail.com
সিএজি-র মন্তব্য, পিএমকেভিওয়াই ২.০ ও ৩.০-র তথ্যভাণ্ডারে অ্যাকাউন্ট নম্বর সংক্রান্ত এই বিশ্লেষণ প্রকল্পের উপভোক্তাদের পরিচয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত নিশ্চয়তা দেয় না।
প্রতিবেদনে মন্ত্রকের ২০২৩ সালের মে মাসের ব্যাখ্যাও উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রক জানিয়েছিল, শুরুতে এসআইপি-তে অ্যাকাউন্ট নম্বর বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু ফিল্ড পর্যায়ের সমস্যার কারণে পরে তা বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। মন্ত্রকের দাবি, আধার-সংযুক্ত ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (ডিবিটি)-এর মাধ্যমে অর্থপ্রদান হওয়ায় আলাদা করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর সংগ্রহের প্রয়োজন নেই।
তবে সিএজি ২০২৩ সালে ডিবিটি-র মাধ্যমে হওয়া অর্থপ্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, পিএমকেভিওয়াই ২.০ ও ৩.০-র অধীনে সার্টিফায়েড ২৪.৫৩ লক্ষ প্রার্থীর (২৫.৫৮ শতাংশ) ক্ষেত্রেই ডিবিটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, এবং সফল অর্থপ্রদান হয়েছে মাত্র ১৭.৬৯ লক্ষ প্রার্থীর (১৮.৪৪ শতাংশ) ক্ষেত্রে। মন্ত্রকের অক্টোবর ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, ৯৫.৯১ লক্ষ প্রার্থীর মধ্যে ৬১.১৪ লক্ষ (৬৩.৭৫ শতাংশ) ডিবিটি পেয়েছেন। অর্থাৎ, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে ৩৪ লক্ষেরও বেশি সার্টিফায়েড প্রার্থী এখনও অর্থপ্রদান পাননি। এই অর্থপ্রদান নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কেও মন্ত্রক কোনও তথ্য দেয়নি।
সিএজি-র অনলাইন উপভোক্তা সমীক্ষাতেও গলদ ধরা পড়েছে। মোট ইমেলের ৩৬.৫১ শতাংশ (১,৫৮১টি) পৌঁছায়নি। যেখানে পৌঁছেছিল, সেখানে সাড়া মিলেছে মাত্র ৩.৯৫ শতাংশ (১৭১ জন) প্রার্থীর কাছ থেকে। ওই ১৭১টি প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ১৩১টিই এসেছে একই ইমেল আইডি বা প্রশিক্ষণ অংশীদার ও কেন্দ্রগুলির আইডি থেকে।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রেও অনিয়ম ধরা পড়েছে। বিহারে বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি কেন্দ্রের মধ্যে বাঁকা জেলার একটি কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এসআইপি ডেটায় দেখা যায়, শারীরিক পরিদর্শনের দিনেই সেখানে দুই ব্যাচের প্রশিক্ষণ নির্ধারিত ছিল। উত্তর প্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে একাধিক উপভোক্তার জন্য একই ছবি ব্যবহারের ঘটনাও সামনে এসেছে। এছাড়া ‘বেস্ট-ইন-ক্লাস’ হিসাবে চিহ্নিত হওয়ার যোগ্যতা নেই—এমন নিয়োগকর্তাদের দ্বারাও দক্ষতা সার্টিফিকেশনের উদাহরণ মিলেছে।
সিএজি জানিয়েছে, প্রকল্পের নির্দেশিকায় প্রার্থীদের বৈধ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। না থাকলে তা তৈরি করতে সহায়তা করা এবং সঠিক ব্যাঙ্ক তথ্য আইটি সিস্টেমে নথিভুক্ত করার দায়িত্ব ছিল বাস্তবায়নকারী সংস্থার। কারণ, সার্টিফায়েড প্রত্যেক প্রার্থীকে ৫০০ টাকা করে ডিবিটি-র মাধ্যমে দেওয়ার কথাই ছিল।
সিএজি’র পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক জানিয়েছে, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকল্পটি “উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী” করা হয়েছে। প্রযুক্তি-নির্ভর নজরদারি, আধার-প্রমাণিত ই-কেওয়াইসি, কড়া নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং স্কিল ইন্ডিয়া ডিজিটাল হাবের মাধ্যমে তথ্যের স্বচ্ছতা ও উপভোক্তা ট্র্যাকিং জোরদার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মন্ত্রকের বক্তব্য, ফেস-অথেনটিকেশন ও জিও-ট্যাগড হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, লাইভ অ্যাটেনড্যান্স ড্যাশবোর্ড চালু হয়েছে, এবং সেন্ট্রাল কমিউনিকেশন লেয়ার (সিসিএল)-ভিত্তিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত কোর্স সংশোধন করা হচ্ছে। পাশাপাশি, কিউআর-কোডযুক্ত ডিজিটাল সার্টিফিকেট, যাচাই-সংযুক্ত অর্থপ্রদান, এবং কৌশল সমীক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ও সরাসরি পরিদর্শন জোরদার করা হয়েছে। অনিয়মে জড়িত সংস্থার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ, কালো তালিকাভুক্তি ও অর্থ আদায়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রক।
মন্ত্রক যাই সাফাই দিক, কেলেঙ্কারি যে হয়েছেই তা চাপা থাকছে না কোনওভাবেই। একটা কোম্পানি ছিল নীলিমা মুভিং পিকচার্স (এনএমপি)। এদের কাজ ছিল ট্রেনিং দেওয়া হলে ফোটো তুলে ওয়েবসাইটে আপলোড করা। ৩৩ হাজার প্রার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এরা। দেখা যাচ্ছে, একই ছবি কখনও বিহারে আবার কখনও মহারাষ্ট্রের প্রশিক্ষণ বলে চালানো হচ্ছে। কখনও আবার একই ছবি থেকে জুম করে দুজনের আলাদা ছবি বের করে অন্য জায়গায় প্রশিক্ষণ বলে চালানো হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, একই দিনে একই ছেলেমেয়ে বিহারের গয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ছবি তুলেছে, আবার উত্তর প্রদেশের বাহরাইচে প্রশিক্ষণেও সেদিনই তারা হাজির। কোনও কোনও ছবি আরও হাসির খোরাক। কোথাও দেখা যাচ্ছে ছেলেমেয়েরা ট্রেনিং নিয়েছে মাস মিডিয়ার। অথচ ছবিতে সকলে ডাক্তারের অ্যাপ্রন পরে। এমনকি পিছনের ব্যানারে যা লেখা আর নিচের ক্যাপশনে অন্য কিছু।
এখানেই শেষ হয়নি কেলেঙ্কারির। বছরে দু’কোটি চাকরির মতোই জুমলা সামনে এসেছে মোদীর এই প্রকল্পে। দাবি করা হয়েছে, এই প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাত্র ৩৩ টা জিমে চাকরি পেয়েছেন ৩০হাজার জিম-ট্রেনার। মানে প্রতি জিমে ৯০০ ট্রেনার। এই না হলে, মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়!
এই কেলেঙ্কারির আরেক মজাদার তথ্য হলো, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সরাসরি পরিদর্শন। এর জন্য একজন ইনস্পেক্টর সশরীরে সেই কেন্দ্রে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেখে রিপোর্ট দেন। দেখা যাচ্ছে, একই দিনে একই সময়ে একই ইনস্পেক্টর একাধিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিদর্শন সেরে ফেলেছেন। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, আশিস সানোয়াল এমনই একজন ইনস্পেক্টর। ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ইনস্পেকশনে সেরে ফেলেছেন অন্দ্র প্রদেশ, গুজরাট, ঝাড়খণ্ড, কর্নাটক, মধ্য প্রদেশ, তামিলনাডু, মহারাষ্ট্র ও তেলেঙ্গানার ১৯টি কেন্দ্রে। পরদিনই তাঁকে আবার ছুটতে হয়েছে কর্নাটক, কেরালা, মধ্য প্রদেশ ও তেলেঙ্গানার ৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে।
একই দিনে একা একজন মানুষ কী করে এত জায়গায় ‘তালি মেরে’ যেতে পারেন! গুপী-বাঘার শরণ নিয়েছেন কিনা, সিএজি রিপোর্টে তার কোনও উল্লেখ নেই। তবে রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, দশ হাজার কোটি খরচ করে তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর ‘জুমলা’ ফেঁদে আসলে দেশ লোটার কারবার চালিয়েছে।
Comments :0