Prakash Chik Barik

‘গোরু, বালি পাচারকারী’ থেকে ‘সনাতনী’ প্রকাশ চিকের দেদার সম্পত্তি তিন বছরে

রাজ্য

ছিলেন চা বাগান শ্রমিক। এখনও তাই আছেন, তেমনই তাঁর দাবি। তাঁর স্ত্রী, তিন বছর আগের মতোই এখনও একজন আইসিডিএস কর্মী, এও তাঁদের দাবি। তবে তৃণমূলী থেকে ‘সনাতনী’ হওয়ার পথে মাত্র তিন বছরে সেই চা বাগান শ্রমিক এবং তাঁর স্ত্রী’র অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ২২০১শতাংশ! 
তিনি প্রকাশ চিক বরাইক। বিজেপি’র নেতা, মোদী সরকারের মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রকাশকে ‘গোরু ও বালি পাচারকারী’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি  বলেছিলেন, ‘‘তুমি সন্ধ্যাবেলায় গোরু পাচার করো, কোনও অসুবিধা নেই বাবা প্রকাশ। তুমি সন্ধ্যাবেলা ওটা চালিয়ে যাও। তুমি বালি পাচার করো। তুমি চালিয়ে যাও। আর আপনারা (বিজেপি’র কর্মীরা) কী করবেন? আপনারা ডায়েরিতে হিসাব করুন ব্যাটা কত কামাচ্ছে। যত কামাবে তার দশ গুণ পেটে পাড়া দিয়ে বের করে আমরা জনগণের মধ্যে ডিস্ট্রিবিউট করে দেব। সেই জন্য এদের রাখা যাবে না। এই প্রকাশ বরাইকের কাজই হচ্ছে ভাই হয়ে গোরু বাজার করা আর ভাইপোকে টাকা সাপ্লাই করা।’’
সেই প্রকাশ চিক বরাইক ক’দিন আগেই বেমালুম বিজেপি’র সাংসদ বনে গেছেন। সুকান্ত মজুমদারের ‘গোরু ও বালি পাচারকারী’ প্রকাশের ২০২৩ এবং ২০২৬’র হলফনামার তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যাচ্ছে তাক লাগানো বদল হয়েছে সম্পত্তির পরিমাণে। ২০২৩’এ প্রকাশ চিক বরাইকের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল মাত্র ১,২৯,০০০ টাকা। এখন তা পৌঁছেছে ৭৬,৫২,২৬৭ টাকায়। অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে তাঁর স্ত্রী’রও। ২০২৩’এ প্রকাশ চিক বরাইকের স্ত্রী ললিতা বেক (চিক বরাইক)’র  অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ২,৯৬,০০০ টাকা। এখন তা হয়েছে ২১,২৬,৮০৪ টাকা। অর্থাৎ গত তিন বছরে এই দম্পতির অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে প্রায় ২২০১শতাংশ!
২০০৬’এ কুমারগ্রামের নিউল্যান্ডস চা বাগানে কর্মচারী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন প্রকাশ। পরে তৃণমূলের আলিপুরদুয়ার জেলা কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন। বর্তমানে যিনি বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের নেতা সেই ঋতব্রত ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে অভিষেক ব্যানার্জির কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন প্রকাশ। সেই প্রভাবের সূত্রে ২০২৩’এ হয়েছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। তৃণমূল পরাজিত হওয়ার কয়েকদিন পরেই রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন প্রকাশ চিক বরাইক। এবার তিনি বিজেপি’র প্রার্থী। আবারও রাজ্যসভায়। দেশ জুড়ে বিজেপি যখন সাংসদ ভাঙাতে নেমেছে, সেই পরিবেশে আলিপুরদুয়ারের প্রকাশ চিক বরাইকের দলবদল। আগামী ২৪ জুলাই রাজ্যের ৩টি আসনে রাজ্যসভার নির্বাচন। বিজেপি ছাড়া আর কোনও দল প্রার্থী দেয়নি। দলবদলু সুস্মিতা দেব এবং সুখেন্দুশেখর রায়ের মতো প্রকাশ চিক বরাইকের জয় ঘোষণাও শুধু সময়ের অপেক্ষা। সেই প্রকাশ তাঁর এবারের হলফনামায় জানিয়েছেন যে, তিনি এখনও চা বাগান শ্রমিক আছেন। তাঁর স্ত্রী তিন বছর আগে ছিলেন আইসিডিএস কর্মী। এখনও তাই আছেন। হলফনামায় তাই জানিয়েছেন প্রকাশ। 
স্বভাবতই লাফিয়ে বেড়েছে তাঁদের স্থাবর সম্পত্তিও। জমি, ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছেন দম্পতি। ২০২৩’এ রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ার সময় প্রকাশ চিক বরাইকের কোনও জমি, ফ্ল্যাট ছিল না। তাঁর স্ত্রী’র পারিবারিক সূত্রে পাওয়া একটি জমি ছিল। সেটি এখনও আছে। তার দাম প্রায় ৬ লক্ষ টাকা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে দু’টি কৃষিজমি কিনে ফেলেছেন প্রকাশ চিক বরাইক। সে দু’টির বর্তমান দাম প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা বলে তিনিই জানিয়েছেন। এই ক্ষেত্রে অন্যান্য তৃণমূলী নেতাদের সঙ্গে তাঁর মিল যথেষ্ট। টাকা পেয়ে জমি কেনা তৃণমূলীদের একটি প্রবণতা ছিল। তাছাড়া প্রকাশ চিক বরাইক একটি ফ্ল্যাটেরও মালিক হয়েছেন। আলিপুরদুয়ারের এক বহুতলে ১১৩৬ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট তাঁর নামে হয়েছে। ২৭ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনা ওই ফ্ল্যাটের দাম বর্তমানে ২৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে শূন্য থেকে প্রায় ৪৮ লক্ষ ৮ হাজার ৩৮২টাকার স্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন প্রকাশ চিক বরাইক।
এত টাকা কোথা থেকে এল, তা জানতে ফোন করা হয়েছিল প্রকাশ চিক বরাইককে। তিনি ফোন ধরেননি। তবে তাতে বিজেপি’র প্রভাবশালী নেতাদের তাঁকে সাংসদ করে রাজ্যসভায় পাঠাতে আটকাচ্ছে না। তবে বিজেপি’তে ক্ষোভ আছে। এক বিজেপি বিধায়ক শুক্রবার বলেছেন, ‘‘যাকে গোরু, বালি পাচারকারী বললাম দু’দিন আগে, তাঁকে দলে নিয়ে সাংসদ করে দিচ্ছি! যারা এতদিন বিজেপি করল, তারা কী বানের জলের ভেসে এসেছে? দলে কী আর কেউ নেই সাংসদ হওয়ার?’’
 

Comments :0

Login to leave a comment