Editorial

দুশ্চিন্তার, উদ্বেগের

সম্পাদকীয় বিভাগ

গত কয়েক দিনে দু’টো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দেশের মানুষের মনে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। তার একটি হলো দেশের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তামিলনাডুতে অবস্থিত কোদানকানালের ১৯ হাজার অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য সংবলিত ফাইল চুরি হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টি হলো দেশের গর্বের সংস্থা ইসরোর শতাধিক বিজ্ঞানি ও প্রযুক্তিবিদ গত দু’মাসে ইসরো ছেড়ে চলে গেছেন। আপাতদৃষ্টিতে খবর দু’টি বা ঘটনা দু’টি আর পাঁচটা ঘটনার মতো মনে হলেও এর তাৎপর্য বা প্রভাব দেশের প‍‌ক্ষে মোটেই সম্মানজনক বা আস্থাসূচক নয়।
যে কোনও দে‍শের ক্ষেত্রেই পরমাণু ক্ষেত্র একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল ক্ষেত্র। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরমাণু ক্ষেত্রে দেশের গবেষণার অগ্রগতির নানা জটিল ও গোপন তথ্য। তেমনি পরমাণু ক্ষেত্র যেহেতু সামরিক ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত তাই এইসব তথ্য বাইরে পাচার হলে বা বেহাত হলে বিপজ্জনক পরিণতির আশঙ্কা থাকে। আধুনিক বিশ্বে কোনও দেশের সামগ্রিক উন্নতির অন্যতম চাবিকাঠি হলো বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সেই দেশ কতটা এগিয়েছে। সব দেশই তাদের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণার অগ্রবর্তী সংক্রান্ত তথ্য চূড়ান্ত গোপনীয়তায় সুরক্ষিত রাখে। তীব্র প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় এইসব তথ্য অন্য দেশের গোচরে চলে গেলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার সুযোগ থাকে না। তাছাড়া পরমাণু সংক্রান্ত তথ্য পরমাণু অস্ত্র তৈরিরও অন্যতম উপাদান। তাই দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরমাণু সংক্রান্ত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোদানকানালে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণের বরাত পেয়েছে মোদী ঘনিষ্ট আম্বানিদের রিলায়েন্স গোষ্ঠী। সরকারের বদান্যতায় ভারতে রাফালে যুদ্ধ বিমান নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফরাসি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এই রিলায়েন্সের সঙ্গেই। ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া বিপুল অনাদায়ী ঋণ মকুবও হয়েছে সরকারি বদান্যতায়। সেই রিলায়েন্স গোষ্ঠীর হেপাজত থেকেই পরমাণু তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে আন্তর্জাতিক তথ্য চুরি চক্র। অর্থাৎ দে‍‌শের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির মূল নির্মাণ নকশা, নির্মাণ কৌশল সবই এখন বিদেশিদের হাতে। ফলে শত্রুদের হাতে কেন্দ্রটি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
ইসরো মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতের অন্যতম গর্বের প্রতিষ্ঠান মহাকাশ ক্ষেত্রে বিশ্বে যে অগ্রণী অবস্থান ভারত অর্জন করেছে তার মূলে ইসরো। ভারত বিশ্বের মধ্যে অত্যন্ত কম খরচে মহাকাশ অভিযান করতে সক্ষম। মহাকাশে উপগ্রহ উৎক্ষেপণেও ইসরো অনেক এগিয়ে। বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন দেশে উপগ্রহ পাঠায় ভারত। ইসরোর এই অভূতপূর্ব সফল্যের মূলে আছে তার বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা। সেই বিজ্ঞানীরাই দলে দলে ইসরো ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এটা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বিপজ্জনকও বটে। কেন চলে যাচ্ছেন তা স্পষ্ট নয়। সরকারও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বসে সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে সরকার কড়া বিধি চালু করেছে যাতে কেউ পদত্যাগ করতে না পারে। এতে হিতে বিপরীত হবারই আশঙ্কা। আগামীদিনে সেরা বিজ্ঞানীরা ইসরোতে যোগ দেবার ক্ষেত্রে উৎসাহ হারাতে পারেন। পরমাণু ক্ষেত্রের তথ্য চুরির ক্ষেত্রেও সরকার পুরোপুরি নীরব। 
বিজ্ঞান গবেষণা, পরমাণু গবেষণা, মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র ইত্যাদি দ্রুত বেসরকারিকরণ করার ফলে এইসব ক্ষেত্রে গোপন তথ্যের বেহাত হবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামীদিনে এমন ঘটনা বাড়লেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

Comments :0

Login to leave a comment