Post Editorial

‘গুন্ডা দমন’-সোহরাওয়ার্দিরই রাস্তায় বিজেপি

সম্পাদকীয় বিভাগ

চন্দন দাস 
‘সোহরাওয়ার্দির নাম ও নিশান’ মুছে দিতে চান, বিধানসভার চত্বরে এই কথা সোচ্চারে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার আগে সোহরাওয়ার্দির নামাঙ্কিত রাস্তার নাম বদলে দিয়েছে তাঁর সরকার। যদিও রাস্তার নাম যে সোহরাওয়ার্দির নামাঙ্কিত ছিল বলে সরকার মনে করেছিল তিনি সেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি নন। কিন্তু ভুল স্বীকারের বদলে সব সোহরাওয়ার্দির নামই মুছে দেওয়া হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সরকার যে সোহরাওয়ার্দির নাম মুছতে উদগ্র হয়েছে, সেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দিকেই তারা অনুসরণ করেছে ‘গুন্ডা দমন’-এর লক্ষ্যে আইন বানাতে গিয়ে। 
১৯৪৬-এ সোহরাওয়ার্দি সেই অর্ডিন্যান্স জারির ভিত্তি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ‘দি অ্যানার্কিকাল অ্যান্ড রিভলিউশনারি ক্রাইমস অ্যাক্ট’। ১৯১৯-এর সেই আইন ইতিহাসে কুখ্যাত রাওলাট অ্যাক্ট নামে বেশি পরিচিত। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, প্রায় ৮০ বছর আগে বিধানসভায় সেই সোহরাওয়ার্দি যে অপযুক্তি হাজির করেছিলেন নিজের অর্ডিন্যান্সের পক্ষে, এখনও সেই অজুহাতই দেখা যাচ্ছে বর্তমান সরকারের আইনে, মন্ত্রীদের ভাষ্যে।
কীভাবে? সেই কথা বলা শুরুর আগে একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কথা রেখে যাওয়া ভালো। ২০২৬-এর জুলাইয়ে বিজেপি সরকারের এই তথাকথিত গুন্ডা দমনের নামে পুলিশের হাতে বাড়তি ক্ষমতা তুলে দেওয়া, সন্দেহের বশে যে কাউকে আটক করা, আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ কেড়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপের যাঁরা বিরোধীতা করছেন, তাঁরাই ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দির একইরকমের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিধানসভায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁরা কারা? কমিউনিস্টরা। বিধানসভার কার্যবিবরণী (ফার্স্ট সেশন-১৯৪৭) জানাচ্ছে, সোহরাওয়ার্দির সরকারের সেই ‘দ্য বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৪৬’-এর বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু এবং কমরেড রূপনারায়ন রায়। স্বাধীনতার পর প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বাধীন প্রথম রাজ্য সরকার একই রকমের পদক্ষেপ নিলে তারও তীব্র প্রতিবাদ করতে সেই কমিউনিস্টদেরই দেখা গেছে। প্রথম কংগ্রেসী সরকারের সেই ‘স্পেসাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট’-এ কমিউনিস্টরা, বামপন্থীরা গ্রেপ্তার কিংবা আটক হয়েছেন। যাঁরা আটক হয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম ছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেবারও বিধানসভায় তীব্র প্রতিবাদে ঝলসে উঠেছিলেন কমিউনিস্টরাই। ১৯৪৭-এর ৮ ডিসেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল,‘‘প্রস্তাবিত আইনটি লইয়া যাঁহারা আলোচনা করিতে প্রবৃত্ত হইবেন, তাঁহাদিগকে উল্লিখিত বিষয়টির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখিতে অনুরোধ করি। মাত্র দুইজন কম্যুনিস্ট সদস্য ব্যতীত পশ্চিমবঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের সদস্যগণ একবাক্যে এই বিলের মূলনীতি মানিয়া লইয়াছেন;’’ তার আগে ১৯৪৭-এর ২৭ নভেম্বর কংগ্রেস সরকারের প্রস্তাবিত ‘স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৭’ সম্পর্কে আলোচনায় কমরেড জ্যোতি বসু বিধানসভায় তাঁর বক্তৃতার এক জায়গায় বলেন, ‘‘এই বিলের সংশোধনী উত্থাপন করে আমি একে একটি অনিষ্টকারী বিল হিসাবে চিহ্নিত করতে চাই। এই কয়েক মাস আগে যখন মি. সুরাবর্দি ঠিক এরকমই একটা বিল সভায় পেশ করেছিলেন তখন কংগ্রেস এই ব্যাপারে একমত ছিল যে এই বিল ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে।...আমি ক্ষুদিরাম, কানাইলাল এবং সূর্য সেন ও অন্যান্যদের আদর্শ ঊর্দ্ধে তুলে ধরেছি যারা জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য বলতে বলতে ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দিয়েছেন। আমার প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা এসেছে সেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যারা স্বৈরাচারী বিদেশী শাসন এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে জেগে উঠেছিলেন এবং বিশ্বাস রেখেছিলেন স্বাধীনতায়। আমার সংশোধনীতে একের পর এক ধারা তুলে আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি যে এই বিলের উদ্দেশ্য জনগণকে শৃঙ্খলিত করা, এই বিলের উদ্দেশ্য হলো তাঁদের কাঁধে দাসত্ব আর দুর্দশার জোয়াল পরিয়ে দেওয়া।’’
আজকের ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল’-এর লক্ষ্যও জনগণকে শৃঙ্খলিত করা—  এমন আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে।
সম্প্রতি ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৬’ বিধানসভায় পাশ হয়েছে। তা ‘গুন্ডা দমন আইন’ নামে বেশি পরিচিত হয়েছে। সোহরাওয়ার্দির অর্ডিন্যান্স, প্রথম কংগ্রেসী সরকারের বিল এবং রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের বিল বিধানসভায় একইভাবে, বিধায়কের সংখ্যার জোরে পাশ হয়েছে। ‘জননিরাপত্তা’ রক্ষার নামে পুলিশের হাতে বিশেষ ক্ষমতা তুলে দেওয়া, সন্দেহের বশে আটক করার মতো সরকারি পদক্ষেপ আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পথ মেনে হয়েছে। এই ক্ষেত্রে দমনমূলক ‘কলোনিয়াল লিগ্যাসি’ বহন করেছে শাসকরা। 
১৯১৯-এর রাওলাট অ্যাক্টের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকার কোনও বিচার ছাড়াই ‘বিপ্লবী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ সন্দেহে যে কোনও ব্যক্তিকে দুই বছর পর্যন্ত আটকে রাখতে পারতো। রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারও কাউকে ‘সমাজবিরোধী’ কিংবা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক মনে করলে যে কোনও ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত আটক রাখতে পারে। রাওলাট অ্যাক্টে সাম্রাজ্যবাদী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনকারী, জাতীয়তাবাদী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘বিপজ্জনক অন্তর্ঘাতক’মূলক হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপক স্বৈরাচারী ক্ষমতা দিয়েছিল। বিজেপি’র গুন্ডা দমন আইন শুধু আগে থেকেই বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নয়। বরং এমন যে কোনও ব্যক্তি যার কর্মকাণ্ড জনসাধারণের মধ্যে ‘ভয়, আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা’ তৈরি করতে পারে বলে পুলিশ, প্রশাসনের মনে হবে, তাদেরও আটক করার ক্ষমতা দিচ্ছে। রাওলাট অ্যাক্টে স্থানীয় গভর্নর এবং পুলিশকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি চালানো এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চলাফেরা সীমাবদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়েছিল। বিজেপি’র ‘গুন্ডা দমন আইন’-এও দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে যে কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট জেলা বা এলাকা থেকে বহিষ্কার করতে বাধ্য করার এবং এক বছর পর্যন্ত তার ফিরে আসা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়েছে। এতেও ওয়ারেন্ট ছাড়া তল্লাশি, বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ১৯৪৬ সালের সোহরাওয়ার্দির অর্ডিন্যান্সেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পরিপন্থী যে কোনো কাজ রুখতে সাধারণ বিচারপ্রক্রিয়া ছাড়াই যে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও আটকে রাখার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৬-এর শেষদিকে অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রী বলা হতো) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার্স অর্ডিন্যান্স জারি করেছিলেন। ১৯৪৭-এর ৬ ফেব্রুয়ারি সেই অর্ডিন্যান্স পাশ করিয়ে নেওয়ার জন্য বিধানসভায় পেশ করেছিলেন সোহরাওয়ার্দিই। সেই অর্ডিন্যান্সে মানুষের শান্তির জন্য হুমকি স্বরূপ বলে যাদের প্রশাসনের মনে হতো, তাদের চলাচল, কার্যকলাপ বা বাসস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যবস্থা ছিল। দুই ক্ষেত্রেই আটক অ-জামিনযোগ্য, যা পুলিশকে আদালতের ইস্যু করা ওয়ারেন্টের অপেক্ষা না করেই তল্লাশি, বাজেয়াপ্তকরণ এবং গ্রেপ্তারের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। ‘গুন্ডা দমন’-এর সঙ্গে যুক্ত সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত ভাবনা। এই ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দির অর্ডিন্যান্স এবং রাজ্যের বিজেপি সরকারের আইনের মিল আছে। উভয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের সঙ্গে জনবিক্ষোভকে আর্থিকভাবে দণ্ডিত করার জন্য সম্পত্তি লক্ষ্য করে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। ১৯৪৬-’৪৭-এ সরকার যে এলাকাকে অশান্ত মনে করছে, সেখানে অশান্তির সঙ্গে জড়িত এলাকা বা গোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে দণ্ডিত করতে অর্ডিন্যান্সের পাশাপাশি কালেক্টিভ ফাইনস কন্টিনিউঅ্যান্স অর্ডিন্যান্স কার্যকর ছিল। একইভাবে ২০২৬-এর ‘গুন্ডা দমন আইন’-এর সমান্তরালে পাশ করানো হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬। এর অধীনে একটি ক্লেইমস কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যা সরকারি বা পাবলিক সম্পত্তি ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সম্পত্তি ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
অনেকটা সোহরাওয়ার্দিরই মতো সেই সংক্রান্ত বিল পেশের পর বিধানসভায় আজকের মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন,‘‘নিশ্চিন্তে থাকুন অপ্রপ্রয়োগ করবো না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় ব্যবহার হবে না। ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হবে না। শুধু গুন্ডাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে এই আইন। এই আইন যদি না মানতে চান তাহলে ইন্ডি জোট (ইন্ডিয়া মঞ্চ)-এর কোনও রাজ্যে গিয়ে থাকুন।’’ শেষ বাক্যটি নিঃসন্দেহে শাসকের মনোভাবকে তুলে ধরেছে। 
‘জননিরাপত্তা’র নামে জনক্ষোভ দমনের জন্য প্রয়োগ হবে এই আইন, এই আশঙ্কা প্রবল বলেই এবারও বিধানসভায়, গত ২৯জুন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি এই বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ কে করছে, সরকার কোন দলের, তাঁদের পতাকায় চাঁদ আছে, চরকা আছে, নাকি পদ্ম আছে— কিছুই যায় আসে না। গণতন্ত্রের পতাকা যখন আক্রান্ত, মানুষের অধিকারের স্বার্থে কমিউনিস্টরাই লড়েছেন এবং লড়বেন। সম্প্রতি বিজেপি’র মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছেন যে,‘কমিউনিস্ট হার্মাদদের’ দমন করতে তিনি এই আইন এনেছেন। জনগণের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং সংগ্রামের প্রতীক কমিউনিস্টদের নিশান— সন্দেহ ওনার নেই।
সন্দেহ নেই রাওলাট অ্যাক্ট, সোহরাওয়ার্দির অর্ডিন্যান্স, প্রথম কংগ্রেস সরকারের ‘স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ এবং রাজ্যের বিজেপি সরকারের আইনের তফাৎ আছে। তা মূলত প্রেক্ষাপটে। রাওলাট আইন যখন তৈরি হচ্ছে তখন দেশে প্রবল হয়ে উঠছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম। সোহরাওয়ার্দির অর্ডিন্যান্সের সময়েও দেশ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে। সাম্প্রদায়িক এবং শাসক শক্তিগুলি সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তীব্র করার জন্য মরীয়া ছিল। কিন্তু চটকল কিংবা খেতে লড়াই চলছিল শ্রমজীবীদের। স্বাধীন দেশের প্রথম কংগ্রেস সরকার যখন সেই কালা আইন তৈরি করছে তখন বেআইনি মজুতদারদের বিরুদ্ধে, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্রদের অধিকারের দাবিতে গণ আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠছে। বর্তমানে দেশ স্বাধীন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং শাসক, প্রধান বিরোধী হিসাবে বিবেচিত দল ধর্মীয় উসকানি দিয়ে নিজেদের ভোট ধরে রাখতে মরীয়া। আবার যুবদের কাজ, ফসলের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের মজুরি, নিরাপত্তা, মহিলাদের আর্থিক এবং অন্যান্য নিরাপত্তার মতো নানা প্রশ্নে সমাজ ক্ষুব্ধ। আন্দোলন চলছে। আশঙ্কা হলো, শাসকের এই পদক্ষেপ আসলে গণআন্দোলনকে দমন করার জন্য ব্যবহার করা হবে, গণতন্ত্র বিঘ্নিত হবে এই আশঙ্কায় বিরোধীতা করছে কমিউনিস্টরা।
বামপন্থীদের অবস্থান এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে বলতে গেলে ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারির বিধানসভায় ফিরে যাওয়া যেতে পারে। ১৮ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭ অর্ডিন্যান্স সম্পর্কে জবাবী ভাষণ দেন সোহরাওয়ার্দি। তার আগে কমরেড রূপনারায়ন রায় দু-তিনটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বাড়তি ক্ষমতার জোরে পুলিশ কী মারাত্মক দমন চালাচ্ছিল গরিব গ্রামবাসীদের উপর তা তুলে ধরেছিলেন বিধানসভায়। জ্যোতি বসু সেদিন সোহরাওয়ার্দির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,‘‘...আমরা দেখেছি কলকাতার পুলিশ এবং বাংলার অন্যান্য জায়গার পুলিশ কীভাবে আমাদের ছাত্রদের উপর, মাঠে কৃষকদের উপর আর কারখানায় শ্রমিকদের উপর লাঠি চালিয়েছে, গুলি চালিয়েছে, তাঁদের আহত করেছে এবং অত্যাচার করেছে। এসব করার জন্য তো তাদের কোনও বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আমরা এ-ও দেখেছি, যখন কলকাতায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা চলছিল, তখন এই পুলিশই কীভাবে কোনও পদক্ষেপ নিতে অসমর্থতা প্রকাশ করেছিল, নিজেদের অসহায়তার অজুহাত দিয়েছিল। ...তিনি (সোহরাওয়ার্দি) যদি সত্যই দেখতে চান কীভাবে আইনশৃঙ্খলাহীনতা দমন করতে হয়, তবে তাঁর উচিত সেইসব ধর্মঘটের দিকে তাকানো, যেখানে হিন্দু ও মুসলমানরা তাঁদের মালিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একতাবদ্ধ হয়েছেন।’’
মোদ্দা কথা সেদিনও যা ছিল আজও তাই। দুষ্কৃতীদের দমন করার জন্য বর্তমান আইনেই যথেষ্ট সুযোগ আছে। সরকার চাইলেই দাঙ্গা আটকাতে পারে, অপরাধ দমন করতে পারে। তার জন্য পুলিশ এবং প্রশাসনকে বিচার ব্যবস্থার বাইরে ক্ষমতা দেওয়ার দরকার নেই।

Comments :0

Login to leave a comment