STORY — SAYAN SARKAR — MANIKBABU O FELUDA — NATUNPATA — 2 MAY 2026

গল্প — সায়ন সরকার — ফেলুদার মগজাস্ত্রে মানিক বাবু — নতুনপাতা — ২ মে ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  SAYAN SARKAR  MANIKBABU O FELUDA  NATUNPATA  2 MAY 2026

গল্প  


 নতুনপাতা

  ------------------------------------------
   ফেলুদার মগজাস্ত্রে মানিক বাবু
  ------------------------------------------

সায়ন সরকার 


২১ রজনী রোডের বসার ঘরে আজ এক অদ্ভুত স্তব্ধতা বিরাজ করছে। বাইরে মে মাসের তপ্ত দুপুর, কিন্তু ঘরের ভেতরটা যেন এক মায়াবী কুয়াশায় ঢাকা। ফেলুদা তার প্রিয় ইজিচেয়ারে বসে একমনে একটি নীল রঙের খাম দেখছে। খামের ওপর কোনো প্রেরকের নাম বা ঠিকানা নেই, শুধু গোটা গোটা সুন্দর অক্ষরে লেখা— 'প্রদোষ চন্দ্র মিত্রের মগজাস্ত্রের জন্য একটি সামান্য ধাঁধা'। ভেতরে একটি দুধসাদা কাগজে কেবল তিনটি রহস্যময় সংকেত লেখা রয়েছে: 'শেকলে বাঁধা বাঘ', 'সোনার কেল্লা' আর 'ছিন্নমস্তা'। সবশেষে নিচে একটি তারিখ দেওয়া—২রা মে।
লালমোহন বাবু সোফায় বসে উত্তেজিতভাবে নস্যি নিচ্ছিলেন। ফেলুদার গম্ভীর মুখ দেখে তিনি আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বলে উঠলেন, "বলেন কী ফেলু বাবু! এ তো সাক্ষাৎ চ্যালেঞ্জ। বাঘ, কেল্লা আর ছিন্নমস্তা—এ তো দেখছি আমাদের পুরোনো কেসগুলোর নাম। কিন্তু এই বিশেষ দিনে এমন ধাঁধা কে পাঠাতে পারে? আর ২রা মে-র রহস্যটাই বা কী?"
ফেলুদা চারমিনারের ধোঁয়া ছেড়ে শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, "আজ আমাদের স্রষ্টা মানিক বাবুর জন্মদিন লালমোহন বাবু। এই সংকেতগুলো কোনো সাধারণ অপরাধীর পাঠানো হুমকি নয়। এর মধ্যে একটা গভীর গাণিতিক প্যাটার্ন আর শিল্পবোধ আছে। একটু তলিয়ে ভাবুন, এই নামগুলো কি কেবল আমাদের সমাধান করা কেস? নাকি আমাদের অস্তিত্বের একেকটা মাইলফলক?"
এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। তোপসে দরজা খুলতেই দেখল মেঝেতে একটি ছোট মেহগনি কাঠের বাক্স রাখা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাক্সের ওপরে সুন্দর করে খোদাই করা সত্যজিৎ রায়ের সেই পৃথিবীবিখ্যাত সিগনেচার। তোপসে বাক্সটা তুলে আনতেই দেখা গেল ভেতরে একটি পুরনো 'সন্দেশ' পত্রিকা, একটি চারকোল পেনসিল এবং একটি ছোট রুপোলি পিয়ানোর চাবি।
ফেলুদার চোখ মগজাস্ত্রের দীপ্তিতে চকচক করে উঠল। সে টেবিলের ওপর জিনিসগুলো সাজিয়ে রেখে বলল, "তোপসে, মনে পড়ে 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এ মগনলাল মেঘরাজের বাড়িতে সেই অর্গান বাজানোর দৃশ্যটা? আর 'হীরক রাজার দেশে'র সেই বাঘের খাঁচা? কেউ একজন খুব সুক্ষ্মভাবে মানিক বাবুর বহুমুখী সৃষ্টির জগতকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দিচ্ছে। এই ধাঁধাটা আমাদের কোনো নতুন অপরাধীর ডেরায় নিয়ে যাচ্ছে না, বরং আমাদের শিকড়ের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।"
লালমোহন বাবু নিজের টাক মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "অবিশ্বাস্য! সাহারার মরুভূমিতে তৃষ্ণা পাওয়ার মতো অবস্থা। তার মানে কি কেউ আমাদের পরীক্ষা করছে? নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাদের নিয়ে রসিকতা করছে?"
ফেলুদা উঠে দাঁড়াল। সে আলমারি থেকে আজ তার কোল্ট রিভলভার নয়, বরং সত্যজিৎ রায়ের আঁকা একটি দুর্লভ স্কেচ খাতা বের করল। সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে উদাস ভঙ্গিতে বলল, "মগজাস্ত্র বলছে লালমোহন বাবু, এই সূত্রগুলো আসলে একটা মানচিত্র। বাঘ মানে দক্ষিণ রায়, সোনার কেল্লা মানে জয়সলমেরের সেই সোনালি পাথর, আর ছিন্নমস্তা মানে হাজারিবাগের সেই রাজরপা। লক্ষ্য করে দেখুন তোপসে, এই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মানিক বাবু আমাদের হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ তাঁর জন্মদিনে তিনি যেন অলক্ষ্যে থেকে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন—আমরা যা কিছু, তাঁর কালজয়ী কলমের খোঁচাতেই তা। আমাদের বুদ্ধি থেকে সাহস—সবই সেই দীর্ঘকায় মানুষটির দান।"
হঠাৎ ঘরের কোণে রাখা পুরনো গ্রামোফোনটা একটু কেঁপে উঠল। সেখানে কোনো রেকর্ড বসানো না থাকলেও আপনাআপনিই বেজে উঠল সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় মোজার্টের একটি সুর। সেই সুরের মূর্ছনায় ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তেই বদলে গেল। ফেলুদা হাসল, যে বিরল হাসি কেবল গভীর তৃপ্তিতেই তার মুখে দেখা যায়। সে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, "আমরা কোনো গোলকধাঁধায় বিচরণ করছি না লালমোহন বাবু। আমরা আসলে একটা বিরাট ক্যানভাসের অংশ। যে ক্যানভাসটা তিনি পরম মমতায় এঁকেছিলেন। আজ এই রহস্যের সমাধান একটাই—স্রষ্টার প্রতি বিনম্র কৃতজ্ঞতা জানানো।"
লালমোহন বাবু এবার সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, "দুর্ধর্ষ! একদম সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার ফেলু বাবু। মানিক বাবু ছাড়া আর কার সাধ্য আমাদের নিয়ে এমন মনস্তাত্ত্বিক লুকোচুরি খেলে!"
তোপসে তার ডায়েরিতে দ্রুত হাতে লিখে নিল—আজকের রহস্যটা অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। এখানে কোনো চোর ধরা পড়েনি, কোনো অপরাধের বিচার হয়নি, বরং হারিয়ে যাওয়া এক বিশ্ববরেণ্য জাদুকরের স্পর্শ পাওয়া গেল। সত্যজিৎ রায় আজ সশরীরে নেই, কিন্তু তিনি তাঁর অমর সৃষ্টির মাধ্যমেই আজও আমাদের মগজাস্ত্রের দখল নিয়ে আছেন।


দ্বাদশ শ্রেণী কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা, পাতুলিয়া

Comments :0

Login to leave a comment