ডাঃ সুবর্ণ গোস্বামী
গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে রূপান্তর চোখে পড়ে, তা একদিকে দৃশ্যমান— কিছু নতুন ভবন, নীল-সাদা পোঁচ দেওয়া দেওয়াল, সুপার স্পেশালিটি ব্লক, জেলায় মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি - অন্যদিকে গভীরতর স্তরে এক দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের ইঙ্গিতবাহী। সরকারি নথি, বাজেট বক্তৃতা, বিজ্ঞাপন এবং শিলান্যাসের ভিড়ে এই অবক্ষয় প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল ইট-সিমেন্টের হিসাব নয়; তা জনবল, পরিষেবা, প্রবেশাধিকার, সামাজিক ন্যায় এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সমষ্টিগত প্রতিফলন।
প্রথমেই আসে জনবল সঙ্কটের প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিক কর্মীর ঘাটতি বহু বছর ধরে কাঠামোগত রূপ নিয়েছে। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও বিধানসভায় উত্থাপিত প্রশ্নোত্তরে বারবার উঠে এসেছে- হাজার হাজার চিকিৎসক ও নার্সের পদ শূন্য। জেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে ব্লক স্তরের হাসপাতাল, এমনকি মেডিক্যাল কলেজেও শিক্ষক-চিকিৎসকের অভাব প্রকট। কোন হাসপাতালে কতজন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন, তার হিসাব শেষবারের মতো হয়েছিল ১৯৯১ সালে। আজ ৩৫ বছর পরে হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ দ্বিগুণ হলেও শয্যা পিছু চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদের অনুমোদন বাড়েনি। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ীও পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালগুলিতে দুই হাজারের বেশি চিকিৎসকের পদ ও দু'হাজারের উপর টেকনিক্যাল স্টাফের পদ শূন্য। মেডিক্যাল কলেজগুলিতে শিক্ষকের সংখ্যা জাতীয় মেডিক্যাল কমিশনের দেওয়া মানদণ্ডের কাছাকাছিও পৌঁছায়নি। নার্সিং স্টাফের ক্ষেত্রেও অবস্থা আরও সঙ্গীন— প্রায় আট হাজার শূন্যপদ। অথচ নিয়মিত নিয়োগের বদলে চুক্তিভিত্তিক, স্বল্প বেতনের ও অস্থায়ী ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে চালু রাখা হয়েছে। এর ফল— কাজের চাপ বৃদ্ধি, কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ, এবং দক্ষ জনবলের ধারাবাহিক ক্ষয়। তার সঙ্গে রোগীদের সীমাহীন হয়রানি।
এই মানবসম্পদ সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিষেবার গুণমানে। সরকারি হাসপাতালগুলিতে বহির্বিভাগে দৈনিক রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়েনি। এক একজন চিকিৎসককে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ জন রোগী দেখতে হচ্ছে - যা কোনোভাবেই মানসম্মত চিকিৎসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইন্ডোর ওয়ার্ডে শয্যার অভাব, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের সীমিত সংখ্যা, এবং জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত চাপ - সব মিলিয়ে হাসপাতালগুলি কার্যত স্থায়ী সঙ্কটের মধ্যে চলছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবক্ষয়। জনস্বাস্থ্যের ভিত্তি হলো সাব-সেন্টার (অধুনা সুস্বাস্থ্যকেন্দ্র), প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কিন্তু গত দেড় দশকে এই স্তরটি ক্রমশ উপেক্ষিত হয়েছে। বহু সাব-সেন্টার কার্যত অচল, ৯০ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা চালু নেই, কোথাও চিকিৎসক নেই, কোথাও ফার্মাসিস্ট নেই, তো কোথাও আবার নার্স নেই, গ্রুপ ডি স্টাফ নেই। সর্বত্রই ওষুধের সরবরাহ অপ্রতুল ও অনিয়মিত। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বেড়েছে বটে, কিন্তু মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমার বদলে বাড়ছে। এর একটি বড় কারণ হলো গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী প্রাথমিক নজরদারির দুর্বলতা। জনবলের সঙ্কটের জন্যই এই দুর্বলতা।
প্রাথমিক স্তর দুর্বল হওয়ার ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে সরাসরি জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজে ভিড় করছেন। এতে তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলির উপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যে রোগগুলি প্রাথমিক স্তরেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য - ডায়রিয়া, শ্বাসনালির সংক্রমণ, হালকা জ্বর, রক্তাল্পতা - সেগুলিও আজ বড় হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে। এটি শুধু ব্যবস্থার অদক্ষতার প্রমাণ নয়, অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়িয়ে তুলছে, কারণ যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ বহন করতে গিয়ে দরিদ্র পরিবার আরও চাপে পড়ছে। রোগীর পকেটে টান পড়ছে।
তৃতীয়ত, অর্থায়ন ও নীতিগত দিক। রাজ্যের মোট বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বেড়েছে— এই দাবি প্রায়শই করা হয়। কিন্তু মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GSDP) তুলনায় স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের হার এখনও বেশ কম। উপরন্তু, এই ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ ও বিমা-নির্ভর প্রকল্পে। সরকারি হাসপাতালগুলির নিজস্ব পরিকাঠামো, মানবসম্পদ ও ল্যাবরেটরি পরিষেবা শক্তিশালী করার বদলে ক্রমশ বেসরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভরতা বাড়ছে। ইনসিওরেন্স মডেল— যেখানে সরকারি টাকা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার বিল মেটাতে ব্যবহৃত হয়— স্বল্পমেয়াদে কিছু উপকার দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সরকারি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছাড়া কেবল বিমা দিয়ে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা সম্ভব নয়। কোভিডের সময় রাজ্যবাসীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতখানি অপরিহার্য, বিশেষত দরিদ্র মানুষের কাছে।
চতুর্থত, রোগীর অভিজ্ঞতা ও আস্থার সঙ্কট। স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায়। আজ সরকারি হাসপাতালে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, পরিষেবার ঘাটতি ও তথ্যের অভাবের মুখোমুখি হতে হয়। এর ফলে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে। এই অবিশ্বাসের সামাজিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে - হাসপাতালে উত্তেজনা, হিংসা, এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা। কিন্তু এই সমস্যাকে কেবল ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বা ‘আইনশৃঙ্খলার সমস্যা’ হিসাবে দেখলে মূল কারণ ঢাকা পড়ে যায়। যখন একটি ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে চাপের মধ্যে থাকে, তখন তার প্রতিটি স্তরে এই ধরনের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
পঞ্চমত, জনস্বাস্থ্যের বিস্তৃত সামাজিক নির্ধারকগুলির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য কেবল হাসপাতালনির্ভর নয়। পানীয় জলের গুণমান, পুষ্টি, স্যানিটেশন, আবাসন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা— সবই স্বাস্থ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। NFHS-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে রক্তাল্পতায় ভোগা নারী ও শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি। যক্ষ্মা, ডেঙ্গু, কালাজ্বরের মতো রোগ এখনও বড় মাপের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে রয়ে গেছে। এগুলি কেবল চিকিৎসার অভাবের ফল নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন। কিন্তু নীতিনির্ধারণে এই কাঠামোগত বিষয়গুলি উপেক্ষিত থাকে।
ষষ্ঠত, সরকারি হাসপাতালগুলি সিন্ডিকেটরাজের কবলে জর্জরিত। চিকিৎসক, থেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পর্যন্ত প্রতিটি নিয়োগে সীমাহীন দুর্নীতি, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদ বণ্টন, টেন্ডারে স্বজনপোষণ - অনাচারের তালিকা দীর্ঘ। রাজ্যের হাসপাতালগুলি এখন দুর্নীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এখানে চিকিৎসক বা নার্স নয়, বরং শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকা দালাল, ঠিকাদার ও গুন্ডারাই প্রায়শই হাসপাতালের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। ওষুধ সরবরাহ থেকে শুরু করে টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স থেকে পার্কিং— প্রতিটি খাতে চলছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। যখন হাসপাতাল কেবলমাত্র দুর্নীতির বাজারে পরিণত হয়, তখন মানুষের জীবন আর নিরাপত্তা কোনোটাই সুরক্ষিত থাকে না। হাসপাতালের আউটডোর, ওটি বা ওয়ার্ড, যা হওয়ার কথা মানবসেবার পীঠস্থান, সেখানে নারীর দেহকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় হায়েনাদের ভোজসভায়। দুর্নীতি কেবল অর্থের নয়, তা মানুষের মনুষ্যত্বকেও গ্রাস করে। এবং এই গ্রাসের ফলেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলি পরিণত হয় ধর্ষণ-খুনের আস্তানায়। আরজি কর, উলুবেড়িয়া, আমতা - একের পর এক হাসপাতাল তার সাক্ষী। রোগী কল্যাণ সমিতিগুলি শাসকের রাজনৈতিক দাদাগিরির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পিজি হাসপাতালে কুকুরের ডায়ালিসিসের চেষ্টা থেকে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জাল স্যালাইনে রোগীমৃত্যু— কী ঘটে নি রাজ্যের হাসপাতালগুলিতে!
সপ্তমত, বিজ্ঞানসম্মত রেফারেল সিস্টেম না থাকায় রোগীরা ও তাদের পরিজনেরা নাকাল হচ্ছেন প্রতিনয়ত। ঝাঁ-চকচকে সুপারস্পেশালিটি বিল্ডিং আছে, অথচ স্পেশালিস্ট চিকিৎসক নেই, পরিষেবাও অমিল। ফলে মাত্রাতিরিক্ত রেফারেল হার, রোগীর ঢেউ আছড়ে পড়ছে মূলত কলকাতার মেডিক্যাল কলেজগুলিতে। সেখানেও এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়ে বেড়াতে হচ্ছে, কারণ কোথাও বেড নেই, এমনকি ফ্লোর বা ট্রলিও বাড়ন্ত!
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনার জায়গা ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন, পেশাগত উদ্বেগ, বা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরাকে অনেক সময় ‘নেতিবাচকতা’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। অথচ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির জন্য সমালোচনা অপরিহার্য। ইতিহাস দেখায়, যেসব সমাজে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে, সেখানে পেশাদারদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, নীতিকে সংশোধন করা হয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে।
এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন একটাই - পশ্চিমবঙ্গ কোন পথে যেতে চায়? যদি লক্ষ্য হয় সত্যিকারের জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, তবে অগ্রাধিকার বদলাতে হবে। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত নিয়োগ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো ও পরিষেবায় বিনিয়োগ, এবং স্বাস্থ্যকে পণ্য নয়, একটি মৌলিক অধিকার হিসাবে দেখার রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। অবকাঠামো দরকার, কিন্তু তা একমাত্র বা প্রধান সমাধান নয়।
চকচকে ভবন আর তার বাহারী আলো দেওয়া নীল-সাদা তোরণ চোখে পড়ে, ছবি তুলে এক্স-হ্যান্ডেলে পোস্ট করা যায়, পাতাজোড়া শিরোনাম হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগে, মানুষের উপর আস্থায়, এবং নীতির ধারাবাহিকতায়। পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে— ইট-পাথরের চাকচিক্য দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সঙ্কট ঢেকে রাখা যায় না। স্বাস্থ্য কোনও প্রদর্শনী নয়; তা একটি সামাজিক প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে আগে এই সত্যটি স্বীকার করতেই হবে - চকচকে বাড়ি বানালেই স্বাস্থ্য হয় না।
Comments :0