editorial

ধোঁ‌য়াশার আড়ালে চুক্তি

সম্পাদকীয় বিভাগ

সুদীর্ঘ টালবাহানার পর ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দু’দেশের প্রধানেরই সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্ট থেকে এমনটাই জানা গেছে। তবে কবে কোথায় এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, দু’দেশের পক্ষ থেকে কে কে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন তার কোনও কিছুই দু’পক্ষের কেউ খোলসা করেননি। চুক্তিপত্রটি প্রকাশ না হওয়ায় বলা যাচ্ছে না কোন দেশ কোন শর্তে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং কোন দেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষা করা গেছে বা কোন দেশের স্বার্থ কতটা বিসর্জিত হয়েছে।
গত বছর ২০ জানুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেবার পর ২ এপ্রিল ‘লিবারেশন ডে’-তে বেশিরভাগ দেশের পণ্যের উপর উচ্চ হারে শুল্ক ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই শু‍ল্কের হার ছিল ১০ শতাংশ থেকে ১৫৫ শতাংশ। চীনের যাবতীয় পণ্যের উপর শুল্ক চাপে বিশ্বের সর্বোচ্চ ১৫৫ শতাংশ। পালটা হিসেবে মার্কিন পণ্যের উপর চীনও ১৪৫ শতাংশ শুল্ক চাপায়। ভারতের পণ্যে প্রথমে ৩৬ শতাংশের মতো শুল্ক চাপালেও পরে সেটা ২৫ শতাংশে নামানো হয়। ট্রাম্পের দাবি ছিল ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ ভারতের বাজারে মার্কিন পণ্য ঢুকবে বিনা শুল্কে। ট্রাম্প বার বার বলেছেন আমেরিকার স্বার্থহানি করে ভারতের পণ্য আমেরিকায় ঢোকার সুযোগ দেওয়া হবে না। আমেরিকার দাবি মাথায় রেখে ভারত যদি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করে একমাত্র তবেই ভারতীয় পণ্যে শুল্ক কমানো হবে।
প্রথমে আমেরিকায় এবং পরে ভারতে দফায় দফায় চলে আলোচনা। মাঝে মাঝে থমকে গেলেও ফের শুরু হয় আলোচনা। মার্কিন প্রতিনিধিরা ভারতে এসে বেশ কয়েক রাউন্ড আলোচনার পর বেশ কিছুদিন চুপচাপ। ইতিমধ্যে ঘোষণা হয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের অবাধ বাণিজ্য চুক্তি। দু’পক্ষ যৌথ বিবৃতি দিয়েছে চুক্তি নিয়ে। তাতে চুক্তির কিছু কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়। মোদী ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কর্তারা একসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনও করেন।
অথচ ভারতের অর্থনীতির পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে চুক্তি সেটা হয়ে গেল চুপিসারে। কোনও চুক্তিপত্র দেখা গেল না। যৌথ বিবৃতি নেই। নেই দু’দেশের প্রতিনিধিদের যৌথ ঘোষণা। অদ্ভুতভাবে নেতায় নেতাই ফোনালাপে চুক্তি হয়ে যাবার খবর মিলল। এমন একটা চুক্তি যেটা ভারতের কোনও নেতার কাছ থেকে জানা গেল না। খোদ আমেরিকায় বসে মধ্যরাতে চুক্তির কথা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তার আগে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান মোদী‍‌-ট্রাম্প ফোনে কথা বলেছেন। তার কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প জানান ইন্দো-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি হয়ে গেছে। ভারতীয় পণ্যে মার্কিন শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ হয়েছে। এক ঘণ্টা পর মোদী এক্স হ্যান্ডেলে জানান প্রিয় বন্ধু ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
যেভাবেই হোক চুক্তি হলো সেটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু কোন শর্তে? ট্রাম্পের দাবির কাছে মাথা নত করেই কি চুক্তি হয়েছে? যদি তেমনটা হয়ে থাকে তাহলে মার্কিন স্বার্থ সিদ্ধ হলেও ভারতের স্বার্থ সিদ্ধ হবার সুযোগ থাকবে না। তাছাড়া ট্রাম্প বলেছেন মোদী নাকি তাঁকে কথা দিয়েছেন রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়ে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা বাড়াবেন। অর্থাৎ ট্রাম্পের চাপের কাছে মাথানত করেছেন মোদী। আর একটা বিষয় স্পষ্ট হয়নি। ২৫ শতাংশ শুল্ক কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে নাকি ৫০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশ হয়েছে। সবটাই ধোঁয়াশার আড়ালে থেকে গেছে। ভারতবাসীর দুর্ভাগ্য এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ভারতের কেউ করেনি। করেছেন ট্রাম্প। মোদী রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমাচ্ছেন, ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা বাড়াচ্ছেন। সেটাও ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। পাক-ভারত যুদ্ধ বিরতির ঘোষণাও করেছিলেন ট্রাম্প। তাহলে ট্রাম্প কি ভারতের মুখপাত্র হয়ে গেছেন। ভারতের বিদেশনীতি কি ট্রাম্পের অঙ্গুলি হেলনে নির্ধারিত হয়?

Comments :0

Login to leave a comment