মঙ্গলবার দিল্লি দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী থাকলো। একটি ঘটেছে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে, অন্যটি সংসদে। একটিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচিত ছাত্র সংসদের চার শীর্ষ পদাধিকারী ও এক প্রাক্তন সভাপতিকে সাসপেন্ড করেছে নজিরবিহীনভাবে এবং যুক্তিহীন একপেশি স্বৈরাচারী পদক্ষেপে। অন্যটিতে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সহ সাত কংগ্রেস সাংসদ ও এক সিপিআই(এম) সাংসদকে সাসপেন্ড করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কড়া সমালোচনা করার জন্য। অনুমান, ইন্দো-মার্কিন অবাধ বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে দেশের সর্বনাশের ব্যবস্থা করে এবং দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মার্কিন স্বার্থের কাছে মোদী সরকারের নতজানু হবার ঘটনার কড়া সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে এই স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার পক্ষ।
ক্ষেত্র আলাদা হলেও দু’টি ঘটনারই চরিত্র প্রায় এক। উভয় ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং দমনপীড়নের ছবি স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ মঞ্চ সংসদ। সেখানেই শাসক বিরোধিতা, সমালোচনা সহ্য করতে রাজি নয়। স্বশাসিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শাসক ও ছাত্রদের অধিকার দাবি করা, বিরোধিতা করা সহ্য করতে চায় না। সর্বত্রই শাসক-প্রশাসক চায় নীরবে সকলে তাদের অনুশাসন মেনে চলুক। কেউ যেন কোনও প্রশ্ন না তোলে।
বিশ্ব দুনিয়া জানে উচ্চ শিক্ষা তথা বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্ত চিন্তা, মুক্ত চর্চার কেন্দ্র। ছাত্ররা এখানে অনবরত প্রশ্ন তোলে। জবাব চায়। অধিকার নিয়ে দাবি তোলে। এটাই ছাত্রদের বৈশিষ্ট্য। বিশ্ববিদ্যালয় এটাকে উস্কে দেয়। জন্মলগ্ন থেকে এই প্রশ্নে জেএনইউ সেরার সেরা। জ্ঞানচর্চার বিচিত্রগামিতায় ও গভীরতায় অবগাহনে এখানে শিক্ষকরা ছাত্রদের সেরা বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উন্মুক্ত পরিসরকে সঙ্কুচিত করার প্রয়াস শুরু যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান বর্জিত হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় আসার পর। জেএনইউ-কে হিন্দুত্ববাদ চর্চায় কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে মরিয়া মোদী সরকার। তারজন্য একদিকে পরিচালন কর্তৃপক্ষকে ঢেলে সাজানো হয়েছে আরএসএস ঘনিষ্ঠ লোকদের দিয়ে। অন্যদিকে এভিভিপি নামধারী দুষ্কৃতীবাহিনীকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবাধ গুন্ডামির অধিকার দিয়ে। মুক্ত চিন্তার বাহক ও ছাত্রস্বার্থ রক্ষার প্রহরী বৃহত্তর ছাত্র সমাজকে ভীতি সন্ত্রস্ত ও অনুগত করতে লাগাতার চলছে প্রতিহিংসা। ছাত্র নেতাদের নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। এমন কি পুলিশ ডেকে জেলে পোরা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের একতরফা আদেশ-নির্দেশের বিরোধিতা হলে গুচ্ছগুচ্ছ শাস্তি ঘোষণা হচ্ছে। ছাত্রদের একাডেমিক কেরিয়ার নষ্ট করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এখন বেছে বেছে আগাম সিদ্ধান্ত নিয়ে শীর্ষ জনপ্রিয় ছাত্র নেতাদের সাসপেন্ড, জরিমানার মতো ভয়ঙ্কর আক্রণ নামিয়ে আনা হয়েছে তুচ্ছ অভিযোগে। যে অভিযোগের কোনও সারবত্তাই নেই। অথচ বছরের পর বছর আরএসএস পন্থী ছাত্র সংগঠন এভিভিপি বহিরাগত দুষ্কৃতীদের এনে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব চালালেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ধ্বংস করলেও, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর সশস্ত্র হামলা চালালেও কর্তৃপক্ষ কোনোদিন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। মোদী জমানায় আরএসএস ঘনিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ লাগাতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশকে ধ্বংস করে হিন্দুত্ববাদী ঘরানার অন্ধ বিশ্বাসের আধারে পরিণত করার। তারজন্যই তারা চায় কর্তৃত্ববাদ।
Editorial
মোদী ভাবেন তিনি সমালোচনার উর্ধ্বে
×
Comments :0