প্রতীম দে: কলকাতা
সোমবার সকালে কলকাতার বাজারে জ্যোতি আলুর দাম ১৫ টাকা কেজি। কৃষকরা ধর্মতলায় নিজেদের মাঠ থেকে আলু তুলে এনে বিক্রি করলেন মাত্র ৮ টাকা কেজি দরে। অর্থাৎ সকালে বাজার করতে গিয়ে যিনি ১৫ টাকায় আলু কিনলেন, তিনিই ধর্মতলায় কৃষকদের থেকে জানতে পারলেন আলুর সঠিক দাম।
আবার এই সমাবেশে আসার কৃষকদের ওপর আক্রমণ করলো বিজেপি। ধর্মতলার এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে শিয়ালদহ এবং হাওড়া থেকে দুটি মিছিল হয়। শিয়ালদহ থেকে মিছিল জান বাজারের কাছে গেলে মিছিলকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। রাস্তার ওপর আরএসএস-এর একটি সংগঠনের কর্মসূচি চলছিল। মিছিলকে লক্ষ করে তারা স্লোগান দিতে থাকেন, পাল্টা স্লোগান তোলেন কৃষকরা। সেই সময় কয়েকজন কৃষক যারা মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তারা রাস্তার ধারে দোকান থেকে জল খাচ্ছিলেন। তাদের ওপর চড়াও হন কয়েকজন আরএসএস কর্মী। মারধর করা হয়, মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মারানো হয় সারা ভারত কৃষক সভার পতাকা। পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা। আক্রান্ত হন উত্তর ২৪ পরগনা থেকে আসা সনাতন বাগানে, অশোক চক্রবর্তী, পঙ্কজ মন্ডল, ফিরোজ মন্ডল। তাদের কথায়, গোটা ঘটনা যখন ঘটছে তখন সেখানে পুলিশ উপস্থিত। তারা কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সভা মঞ্চ থেকে প্রশ্ন তোলেন কৃষক নেতৃত্ব।
সোমবার রানী রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে সংযুক্ত কৃষক মোর্চার ডাকে ছিল কৃষক সমাবেশ। সেই সমাবেশে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকরা এসে জড়ো হয়েছিলেন। ফসলের ন্যায্য দাম, এমএসপি, সারের দাম কমানো সহ একাধিক দাবিতে ছিল এই সমাবেশ। ধর্মতলা এই সমাবেশেই মাঠ থেকে আলু তুলে এনে বিক্রি করলেন কৃষকরা। তাদের কথায় তারা আলুর সঠিক দাম পাচ্ছেন না। কৃষকের থেকে আলু কেনা হচ্ছে ২-২.৫ টাকা কেজি দামে। সেই আলু বিক্রি হচ্ছে বাজারে ১৫ টাকা কেজি। এক কৃষকর কথায়, ‘আমরা আজ কলকাতায় এসে আট টাকা দামে আলু বিক্রি করে মানুষকে দেখাতে চাইছি আলুর কেজি প্রতি আসল কী দাম হওয়া উচিত। গাড়ি ভাড়া, সারের দাম, বিজের দাম মিলিয়ে কোন ভাবেই ৮ টাকার ওপর আলুর দাম হতে পারে না। আসলে ফোঁড়ে, দালালদের হাতে গোটা ব্যবস্থাটা চলে গিয়েছে। সরকার কৃষকর থেকে আলু কিনছে না। দালালরা কিনছে। যার জন্য দাম বাড়ছে।’
ধর্মতলার সমাবেশে আলু বিক্রি করছিলেন আলু কৃষক পঞ্চানন শাসমল। তিনি বলেন, ‘অভাবের জ্বালায় আমরা এখানে আলু বিক্রি করছে। বিঘে প্রতি দশ হাজার টাকা লস। ডিএপির দাম ২৪০০ টাকা। এবছর আরও সার দাম বাড়বে। একজন কৃষক আলু চাষ করে বিঘে প্রতি পাচ্ছে ১৫ হাজার টাকা। খরচ হচ্ছে ৩০-৩৫ হাজার টাকা।’ তার কথায়, ‘কৃষকদের বস্তা প্রতি ২০০ টাকা দেওয়ার যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেই টাকা অবিলম্বে দিতে হবে। ৫০০ টাকা যদি কৃষককে দেওয়া হয় তবে লাভ হবে। না হলো আর চাষ করা সম্ভব হবে না।’
হুগলি জেলার কৃষক সমিতির সম্পাদক স্নেহাশিষ রায় বলেন, ‘গ্রামের কৃষকরা তিন বছর ধরে ফসলের দাম পাচ্ছে না। তৃণমূল দেয়নি, বিজেপি দিচ্ছে না। এখনও অনেক আলু স্টোরে আছে। কী হবে জানা নেই। নভেম্বরের মধ্যে স্টোর থেকে বার করতে হবে। গ্রামীন অর্থনীতিটা শেষ হয়ে গিয়েছে। কেনা বেচা সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহরের লোক প্রায় ১৫-২০ টাকা দামে আলু খাচ্ছে। স্টোর ভাড়া, আনার খরচ এই সব দিক বজায় রেখে এবং লাভ রেখেই আমরা কৃষকরা আজকের এই সমাবেশে ৮ টাকা দরে আলু বিক্রি করছি।’
তার কথায়, ‘সরকার বলেছিল সহায়ক মূল্য দেবে কিন্তু দেয়নি। কুইন্টাল প্রতি ২০০ টাকা দেবে বলেছিল তা দেয়নি। এখন বলছে আগামী বছর দেবে। আগে কৃষক বাঁচুক। সারের দাম ৮০০ টাকা করে প্যাকেটে বেড়েছে। আলু বিক্রি হয়নি। কিন্তু আগামী বছরের জন্য কৃষককে কিনতে হচ্ছে সার। এই সঙ্কট থেকে কৃষককে রক্ষা কতে হবে।’
কৃষক নেতা ভক্তরাম পান বলেন, ‘এবছর ভালো ভাষ হয়েছিল। স্টোরে অনেক আলু রয়েছে। যা মজুত আছে তাতে ফেলে দিতে হবে। বামফ্রন্ট সরকার কৃষকদের থেকে আলু কিনেছিল। তাদের ভর্তুকি দিয়েছিল। বিজেপি বলেছিল কুইন্টাল প্রতি ২০০ টাকা দেবে এখন বলছে পরের বছর দেবে। কৃষকরা না বাঁচলে কাকে টাকা দেবে পরের বছর?’
তিনি বলেন, ‘কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছে না। আমেরিকার সাথে বানিজ্য চুক্তি করে বাইরে থেকে খাদ্য পন্য আনার রাস্তা খুলে দিচ্ছে সরকার। যার জন্য কৃষকরা আরও সঙ্কটে পড়বেন। এই সবের বিরুদ্ধে আজ কৃষকরা কলকাতার রাস্তায় এক হয়েছেন।’
Comments :0