বহুতল নির্মাণের জন্য টালিগঞ্জের ট্রাম ডিপোর জমি হস্তান্তরে নগর পরিকল্পনা আইন ভাঙার পাশাপাশি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যে রিয়েল এস্টেটের প্রকল্পে বেসরকারি ব্যবসায়ী সংস্থা প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা লাভ করবে, তাদের মাত্র ১৭২ কোটি টাকার বিনিময়ে জমি তুলে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ট্রাম ডিপোর জমি লিজে দেওয়া হলেও বহুতল নির্মাণকারী সংস্থা চড়া দামে ফ্ল্যাট বেচতে আবাসিকদের সেই জমির মালিকানা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে দেখেও চোখ বুজে রয়েছে তৃণমূল সরকারের আবাসন দপ্তর। ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশন সহ নগরোন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা এর প্রতিবাদ করে বলছেন, কলকাতার গণপরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ট্রামকে ধ্বংস করা হচ্ছে দুর্নীতির কারবারের জন্য।
টালিগঞ্জ, বেলগাছিয়া, কালীঘাট, খিদিরপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় ট্রামের জমি জলের দরে বেচে দিয়েছে রাজ্য সরকার। ২০১৫ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর ২৪০ কাঠা জমি নির্ভনা দেভকন নামের একটি সংস্থাকে ৯৯ বছরের লিজে হস্তান্তর করে পরিবহণ দপ্তর। এর জন্য সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছিল লিজ ফি বাবদ মাত্র ১৭২ কোটি টাকা। এর পাঁচ বছর পর ২০২০ সালে জমি হাতানো সংস্থাটি বেলানি এনপিআর নামের একটি প্রোমোটিং সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় যারা টালিগঞ্জের দেশপ্রাণ শাসমল রোডের ধারে মূল্যবান জমিতে বিশাল আবাসন প্রকল্প ‘স্যাঙ্কচুয়ারি’ নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছে। এই দুই সংস্থার কনসোর্টিয়ামই আবাসন বিক্রি করে মুনাফা তুলবে। তাদের প্রচারিত বিজ্ঞাপন থেকে দেখা যাচ্ছে যে ২৭ তলা থেকে ২৯ তলার মোট চারটি টাওয়ারের ‘স্যাঙ্কচুয়ারি’ নির্মিত হচ্ছে এবং এই বিলাসবহুল আবাসনে গলফ কোর্স থেকে সুইমিং পুল সহ যাবতীয় বন্দোবস্ত থাকবে। থাকবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের কাঠামোও। একেকটি ফ্ল্যাট ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, গোটা প্রকল্প থেকে বিক্রিবাবদ নির্মাণকারী কনসোর্টিয়াম দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় করবে। নির্মাণ খরচ বাদ দিলেও প্রায় হাজার কোটি টাকা মুনাফা করবে তারা। অথচ সরকারের ঘরে জমা পড়েছে মাত্র ১৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের স্থাবর সম্পত্তির মানিটাইজেশনের ফলাফল হলো, মাত্র ১৫ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা আর ৮৫ শতাংশ লিজপ্রাপ্ত ও নির্মাণকারী বেসরকারি সংস্থার অ্যাকাউন্টে জমা। এই কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, এই কারণেই কি তৃণমূল সরকার তাড়াহুড়ো করে ট্রাম ডিপোরে জমিগুলি বেচে দিতে নেমেছে? জমির লিজপ্রাপ্ত সংস্থা কার্যত কিছুই না করে, কেবল সরকারের সঙ্গে লবি করে জমি হাতিয়ে নির্মাণকারী সংস্থাকে নির্মাণের জন্য তুলে দিয়েই প্রায় ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা করে নিচ্ছে। এভাবে জমি হাতানোর জন্য তারা কি সরকারি স্তরে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে সন্তুষ্টিকরণ করেছে?
শুধু পরিবহণ দপ্তর নয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবাসন দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবাসন দপ্তরের অধীনেই রিয়েল এস্টেট রেগুলেটরি অথরিটি (আরইআরএ) নজরদারি করে থাকে আবাসন নির্মাণ প্রকল্পগুলিতে। প্রতিটি নির্মাণকারী সংস্থাকে যাবতীয় তথ্য জানিয়ে আরইআরএ’তে নথিভূক্ত হতে হয়। আরইআরএ’র তথ্য অনুসারে, স্যাঙ্কচুয়ারি প্রকল্প নির্মাণের সময়সীমা ৩০ জুন ২০২৭ সাল। অথচ নির্মাতা সংস্থার বাধ্যতামূলক জমা দেওয়া হলফনামায় এই সময়সীমা উল্লেখ রয়েছে ২০৭৭ সাল। এছাড়াও তারা নির্মাতা সংস্থা আবাসনের ফ্ল্যাট বিক্রির চড়া দাম তুলতে আবাসনের ‘কমন এরিয়া’র মালিকানাও প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম ডিপোর যে জমি ৯৯ বছরের লিজে হস্তান্তর হয়েছে তার মালিকানা নির্মাতা সংস্থা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে কী করে? এইসব অনিয়ম দেখেও আবাসন দপ্তর এবং আরইআরএ চুপ করে রয়েছে কেন?
অবসরপ্রাপ্ত নগর পরিকল্পনাবিদ এবং পরিবেশ ও নাগরিক আন্দোলনের কর্মী দীপঙ্কর সিনহা বলেছেন, কলকাতা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মূল্যবান জমি জলের দরে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই দুর্নীতির তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর দায় শুধু মন্ত্রীদের নয়, সরকারের অফিসারদেরও নিতে হবে।
আরও কেলেঙ্কারির অভিযোগ করে তিনি বলেছেন, ওয়েস্ট বেঙ্গল টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি প্ল্যানিং অ্যাক্ট ১৯৭৯ অনুসারে জমির চরিত্র এভাবে বদল করা বেআইনি। নগর পরিকল্পনায় যে জমি পরিবহণের জন্যই নির্ধারিত তার চরিত্র বদলের জন্য সরকার কোনও নোটিফিকেশন জারি করেছে? রাজারহাট নিউটাউনে যেভাবে নগর পরিকল্পনা ভেঙে জমির চরিত্র বদল করে মুখ্যমন্ত্রী দুর্গা অঙ্গন বানিয়ে বেআইনি কাজ করছেন, সেভাবেই কলকাতায় ট্রাম ডিপোর অর্থাৎ পরিবহণের জমিতে আবাসন বানানোর জন্য হস্তান্তর করে বেআইনি কাজ করেছেন।
২০১৫ সালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর জমি হস্তান্তরের সময়ে পরিবহণ সচিব পদে থাকা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রাপ্ত টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহণ পরিষেবার উন্নয়নে খরচ করা হবে। কিন্তু ক্যালকাটা ট্রাম ইউজার্স অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, উন্নয়ন তো দূরের কথা, ট্রামকে তো তুলেই দেওয়া হচ্ছে। ২০১১ সালে কলকাতায় ট্রাম চলত ৩৭টা রুটে, ২২০টি ট্রাম গাড়ি মজুত ছিল তখন, ৭০ থেকে ৭৫ হাজার যাত্রী পরিবহণ করত সেগুলি। গত দেড় দশকে সব বন্ধ করে কলকাতায় মাত্র ২টি রুটে টিমটিম করে ট্রাম চালানো হচ্ছে।
দীপঙ্কর সিনহা বলেছেন, ট্রামের তার খুলে, ট্রাম লাইনে পিচ ঢেলে দিয়ে, জমি বেচে দিয়ে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে কলকাতার প্রথম গণপরিবহণ ব্যবস্থা ট্রামকে। অথচ পরিবেশ বান্ধব এবং যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া ট্রামের আধুনিকীকরণ করাই বর্তমান সময়ের প্রয়োজন ছিল।
Tollyganj Scam
টালিগঞ্জ ট্রামডিপোর জমি হস্তান্তরে প্রচুর টাকার দুর্নীতি
×
Comments :0