ময়ূখ বিশ্বাস
'EL MAESTRO' অর্থাৎ শিক্ষক। যিনি জানতেন ধর্ম, ভাষা, গায়ের রঙ এ সমস্ত ব্যবহার করে শোষণ ও বিভাজন করে শাসক। মাত্র ১৭ বছর বয়সে একটি রাজনৈতিক নাটক লিখে জুটেছিল দেশদ্রোহীর তকমা। স্পেনের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতার সংগ্রামকালীন অবস্থায় কাটিয়েছিলেন স্প্যানিশ জেলে, 'Hard Labour camp' এ। পরে নির্বাসনে মার্কিন মুলুকে। এখান থেকেই দেশকে মুক্ত করার স্বপ্ন দেখতেন। আবার এখানেই উত্তুরে দখলদার হিসাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চিহ্নিত করেছিলেন আজ থেকে দেড়শো বছর আগে। আবার ইনিই মার্কিন দেশে থাকাকালে আফ্রো-কিউবানদের পড়া লেখা শিখিয়েছেন। তিনি কবি ‘হোসে মার্তি’- ফিদেল কাস্ত্রোর 'হিরো'। উনিশ শতকের স্প্যানিশ কবিতার পুনর্জাগরণ ঘটানো মার্তির লেখা 'গুয়েন্তানামেরা' কিউবান রেডিওতে প্রথম গেয়েছিলেন হোসে ফার্নান্ডেজ দিয়াস নামের এক শিল্পী। পরবর্তীতে আরোও জনপ্রিয় করে তোলেন পিট সিগার। দেশকে মুক্ত করতে ফিদেলের মতোই গোপনে কিউবায় পা রেখেছিলেন হোসে মার্তি। যুদ্ধক্ষেত্রেই স্প্যানিশ বুলেট তাঁকে মাত্র ৪২ বছরেই স্তব্ধ করে দেয়। কিউবার কমিউনিস্ট সরকার এই বিপ্লবীদের সম্মান জানায় সর্বত্র। কারখানা থেকে রেস্তোরাঁ, কিউবান পেসো থেকে মানুষের বাসায়— সর্বত্র আছেন হোসে মার্তি। কমিউনিস্ট কিউবার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের সাথে অস্থি মজ্জায় একাকার হয়ে গেছেন সেদিনের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। এটা করিয়েছে প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা। সেই মার্তির জন্মদিনে অর্থাৎ ৩০ জানুয়ারিতেই কিউবা'কে রক্ষার শপথ নিলেন লাখো ছাত্র-যুবরা, নেতৃত্বে কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেল। লাখো মশাল হাতে মার্কিন অবরোধ-চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে ফিদেল কাস্ত্রোর উত্তরাধীকারীদের দৃপ্ত মিছিল ভাইরাল হয়েছে গোটা পৃথিবীতে। সেদিন ফিদেল-রাউলের উত্তরসূরি কিউবার রাষ্ট্রপতি মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেল স্পষ্ট জানিয়েছেন,"SURRENDER WILL NEVER BE AN OPTION! Homeland or Death, We Shall Overcome!" তিনি বলেছেন, ‘এমনকি জ্বালানি সঙ্কট থাকলেও, কিউবা কখনও সাম্রাজ্যবাদের কাছে পরাস্ত হবে না! আত্মসমর্পণ আমাদের কাছে কখনও বিকল্প হবে না, এবং এই ধরনের কঠিন সময়কে আমরা মোকাবিলা করব প্রত্যয় আর সাহসের সঙ্গে।’
আমাদের পার্টি সিপিআই(এম) যেমন সূত্রায়িত করেছিল, তেমনই সারা পৃথিবীতে- (১) শ্রম বনাম পুঁজি (২) সাম্রাজ্যবাদের সাথে উন্নযয়নশীল দেশগুলির দ্বন্দ্ব, (৩) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব, (৪) সাম্রাজ্যবাদ বনাম সমাজতন্ত্র এবং নয়া দ্বন্দ্ব (৫) পরিবেশ বনাম লুটেরা পুঁজির দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফিন্যান্স পুঁজি নিয়ন্ত্রিত ধনতান্ত্রিক দেশগুলি পুঁজিপতিদের মুনাফার স্বার্থে পৃথিবীজুড়ে সাম্যের ধারণার বিরোধিতায় বারেবারে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং করেই যাচ্ছে ভেনেজুয়েলা থেকে ইয়েমেনে। বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে গণঅভ্যুত্থানের নামে সেই দেশটির সার্বভৌমত্বকে ধ্বংস করে তাকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মধ্যে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, যেমনটা ইরাকে বা লিবিয়াতে হয়েছে। এবার ভেনেজুয়েলাতে হলো। সরাসরি মানবিক অজুহাতে মানুষ মারার খেলায় নেমেছে সাম্রাজ্যবাদীরা। প্যালেস্তাইনকে ধ্বংস করা হচ্ছে, এবার ট্রাম্পদের ইচ্ছার তালিকায় কিউবা, গ্রিনল্যান্ড থেকে ইরান। অতীতে অশান্ত করার চেষ্টা করেছে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে রঙ্গিন বিপ্লবের নামে বা ‘আরব বসন্ত’ এর নামে আরবে, কিছুদিন আগে ইরানে। এখনো সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাভাবনাকে চরিতার্থ করতে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, রাশিয়া সীমান্তে এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিরন্তর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। পাশের বাংলাদেশকেও সেই ছকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সাম্রাজ্যবাদ। আর কমিউনিস্ট কিউবার বিরুদ্ধে অমানবিক মার্কিন অবরোধ তো আজ থেকে নয়, সেই ১৯৬২ থেকে চলছে। যে বছর বব ডিলানের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ, সেই বছরই কিউবার উপর পুরোপুরি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। অপরাধ ‘আঙ্কেল স্যাম’ এর নাকের ডগায় বসে বিপ্লবোত্তর কিউবায় জাতীয়করণ। এরফলে আজ অবধি কিউবার ক্ষতি হয়েছে কয়েক লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার। প্রথমদিকে অনৈতিক অবরোধে, ওষুধের অভাবে মারা গিয়েছে বহু কিউবান শিশু। কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অঘোষিত যুদ্ধ সুফল বয়ে আনেনি, প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ওবামাও তা স্বীকার করেন। ১৯৯২ সালে মার্কিন কংগ্রেসে গৃহীত টরিসেল্লি আইনের বলে কিউবার সঙ্গে জলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। যে জাহাজ কিউবার উপকূলে নোঙর ফেলবে সেই জাহাজকে মার্কিন জল সীমানায় প্রবেশ করতে গেলে কমপক্ষে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হবে এবং নতুন করে জোগাড় করতে হবে মার্কিন অনুমতিপত্র। ১৯৯৬ সালে হেলমস-বার্টন আইন (Helms-Burton Act) পাস হওয়ায় ঐ নিষেধাজ্ঞার আওতা সম্প্রসারিত হয়েছে, এর কবলে পড়েছেন সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও। তাছাড়া এই আইনের বলে কিউবায় অন্তর্ঘাত চালানোর জন্য অর্থ সাহায্যও বৈধতা পেয়েছে। 'কমিশন ফর অ্যাসিসটেন্স টু আ ফ্রি কিউবা’ প্রভৃতি মাফিয়া সংগঠনের মাধ্যমে অস্থিরতা ছড়ানোর চেষ্টা করছে গোটা কিউবা জুড়েই। এই গোটা সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়াটি মূলত এক ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ, যার মানবিক পরিণতি ভয়াবহ। সেই কিউবা'কে সাড়ে ছয় দশক ধরে অবরোধ করেও শান্তি নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এখন লক্ষ্য— সম্পূর্ণ তেল বন্ধ করে দেওয়া। ২৯ জানুয়ারি, 'এপস্টিন ফাইলে' জ্বল জ্বল করা নাম, যৌন নিগ্রহকারী ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি আদেশ জারি করে বলেছেন যে কিউবা আমেরিকার জন্য ‘বিপজ্জনক’। তিনি আরও বলেছেন, যে কোনও দেশ কিউবাকে তেল দিলে বা বিক্রি করলে সেই দেশের বিরুদ্ধেও আমেরিকা ব্যবস্থা নেবে। পিষে মারতে চাইছে কিউবা'কে। আদিম অবরোধ করে। তবু চে গুয়েভারা ক্যামিলো সিনফুয়েগারা, ভিলমা রোসেফ, রাউল কাস্ত্রোদের উত্তরাধিকার কিউবার বিপ্লবী সরকার বিবৃতি দিয়ে বলছে, ‘আমরা এই নতুন আক্রমণকে মোকাবিলা করব দৃঢ়তার সঙ্গে, সংযমের সঙ্গে, এবং আমরা নিশ্চিত যে যুক্তি আমাদের পক্ষেই। তাই সিদ্ধান্ত একটাই: হয় স্বদেশ অথবা মৃত্যু! জয় আমাদের নিশ্চিত!’
মার্কিন অবরোধ ও ট্রাম্প সরকারের নিষেধাজ্ঞার ফলে কিউবায় জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার এই নতুন পদক্ষেপের ফল হবে ভয়ানক। এরফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যাবে এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। হাসপাতালে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেবে, নবজাতকের ইনকিউবেটর ও লাইফ সাপোর্ট যন্ত্র অচল হয়ে পড়বে এবং জরুরি অস্ত্রোপচারও অন্ধকারে করতে হতে পারে। কারণ এমনটা অতীতে হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী চাপে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, দোকান বন্ধ হতে বাধ্য হবে। জ্বালানির অভাবে খাদ্য ওষুধ পথ্যের মতো জরুরি পরিষেবা-পরিবহণ ব্যাহত হবে, খাবার নষ্ট হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য- কিউবার সাধারণ জনগণের ওপর একটি সুপরিকল্পিত ও নৃশংস আক্রমণ করা। যার উদ্দেশ্য তাদের মধ্যে ক্ষুধা, দুর্দশা, বঞ্চনা, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করা। আর এই ক্ষোভ থেকে যদি তারা বিক্ষোভ করেন, সেখানে 'সুপারম্যান', 'র্যা ম্বো', 'জ্যাক রায়ান' নামক ভগবানের প্রতিনিধি হয়ে মার্কিনীরা কিউবানদের বাঁচাতে আসবে। তারপর ১৯৫৯-এর বিপ্লবের আগে যেমন, চিনি থেকে নিকেল- লুট, মাফিয়াদের মোচ্ছব চলতো, তাই চলবে। এমনই ইচ্ছা চরম কমিউনিস্ট বিরোধী কিউবান-মার্কিন রাজনীতিবিদ মার্কো রুবিও, কার্লোস গিমেনেজ ও মারিয়া এলভিরা সালাজারদের। কারণ এদের পরিবার ছিল কিউবার বিশাল জমি, কোম্পানির মালিক। কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় এসে ওদের বাপ-ঠাকুর্দার বিপুল সম্পত্তি জাতীয়করণ করে এবং জমি জনসাধারণের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। তাই প্রতিশোধ স্পৃহায় বদলা নিতে বধ্যপরিকর রুবিয়ো'রা। এককালে স্বৈরাচারী বাতিস্তার সহচর হিসাবে এইরকম লোকদের নিয়ে বার বার আক্রমণ করেছে মার্কিনীরা- বেগ অব পিগস থেকে এখনো। এইবার কিউবান জনগণকে ক্ষুধার্ত রেখে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চায় ট্রাম্প, রুবিও কোম্পানি। এমতাবস্থায় কিউবার কমিউনিস্ট পার্টি মনে করছে ট্রাম্পের এই ফ্যাসিস্ত আগ্রাসন একটি আদর্শগত-সাংস্কৃতিক এবং মিডিয়া যুদ্ধেরই একটা রূপ। আদর্শগত, কারণ এখানে হিটলারি কায়দায় যা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা হলো একটি সাম্রাজ্যের বিশ্ব জয়ের ইচ্ছা। যেখানে আধিপত্য কায়েম করবে ইলন মাস্ক-এপস্টিনের মতো বিশ্বের ধনীতম শোষককুল। এটি একটি সাংস্কৃতিক যুদ্ধও। কারণ, সাম্রাজ্যবাদ চায় বিশ্বকে আধিপত্যবাদের মাধ্যমে জয় করে প্রত্যেক মানুষের সাথে তাদের সংস্কৃতি, শিকড়, মূল্যবোধগুলোকে চুরমার করে দিয়ে বিশাল কর্পোরেটগুলোর সুবিধামতো শোষণের ধাঁচে দুনিয়াটা গড়তে। এবং এটা মিডিয়া যুদ্ধও। যেখানে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে পৃথিবী জুড়ে প্রচারমাধ্যম, সোশাল মিডিয়া থেকে তৈরি করা হচ্ছে জনমত। যা সাম্রাজ্যের আক্রমণকে ন্যায্যতা দেবে। এটা হয়েছে সাম্প্রতিক ইরানে। অবশ্যই এই মডেল প্রয়োগ হয়েছে ভেনেজুয়েলাতে। কিউবার সবথেকে ঘনিষ্ঠ একটা বাম শাসিত দেশের বিশাল তেলের ভাণ্ডারে বহুদিন ধরে নজর বিশ্বের তাবড় তেল কোম্পানিগুলোর। তাই সেখানে বহুদিন ধরে (প্রায় সাভেজের শাসনকাল থেকেই) চলছে মার্কিন উদ্যোগে আন্তর্জাতিক চাপ, তারপর সাম্প্রতিক কালে শুরু হলো নৌ অবরোধ,মাদক পাচারে জড়িত বলে মিথ্যা অভিযোগে ভেনেজুয়েলার জাহাজগুলির ওপর মার্কিনীদের অবৈধ বোমা বর্ষণ, হাইড্রোকার্বন অবরোধ, তেল ট্যাঙ্কার দখল এবং শেষ পর্যন্ত একটি সার্বভৌম দেশের বৈধ রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে অন্য দেশে অবৈধভাবে বিচার করার চেষ্টা করল সাম্রাজ্যবাদী ও ফ্যাসিস্ত ট্রাম্প প্রশাসন। একইভাবে অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে কিউবার বিরুদ্ধে। অতি দক্ষিণপন্থী ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য এবার পশ্চিম গোলার্ধের একমাত্র কমিউনিস্ট দেশ কিউবা আক্রমণ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। এখন এই লুটেরা সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি হচ্ছে গ্রিনল্যান্ড থেকে ইরান। এবার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ১৯৬০ সালের কুখ্যাত ম্যালোরি স্মারকলিপিতে উল্লিখিত নীল নকশা প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর। ষাটের দশকে মার্কিন কর্মকর্তা লেস্টার ম্যালোরি স্পষ্ট করেছিলেন, যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য হলো ছোট্ট কিউবাকে "টাকা ও সরবরাহ" থেকে বঞ্চিত করা, "মজুরি ও প্রকৃত আয়" কমিয়ে আনা এবং "ক্ষুধা, হতাশা ও সরকার পতন" ঘটানো। প্রায় ছয় দশক পর, কিউবার ঘনিষ্ঠতম মিত্র ভেনেজুয়েলাতে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অপহরণের পর ভেনেজুয়েলা সরকার এখন ব্যাকফুটে। গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় অতি অত্যাধুনিক মার্কিন হামলার সময় কিউবার ৩২ জন যোদ্ধা সাহসিকতার সাথে লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে। কিন্তু এখন আরও নির্মম আক্রমণের ভয়ে তেল সহ জাতীয় সম্পদ আবার বহুজাতিকদের কাছে খুলে দিচ্ছে ভেনেজুয়েলার সরকার। এমনকি মাথানত করে কিউবাকে তেল দেওয়া বন্ধ করেছে। এই অবস্থার সুযোগে কিউবার জনগণের ওপর মার্কিনীরা সর্বোচ্চ অবরোধ চাপিয়ে দিচ্ছে। এরসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিথ্যা অভিযোগ এনেছে যে কিউবা "শত্রু রাষ্ট্র, সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী ও অশুভ শক্তিকে" সাহায্য করে। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলছে। কিউবা কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দেয়নি। বরং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বজুড়ে বোমা, সেনা ও যুদ্ধ রপ্তানি করে, কিউবা তখন ডাক্তার পাঠায়। সারা দুনিয়ার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত ওদের কাছে, কোভিডে যা করেছে কিউবান চিকিৎসকরা। ইউরোপের সবথেকে করোনা বিধ্বস্ত ইতালি থেকে আফ্রিকার গরিব দেশগুলোতেও কিউবা থেকে ৫৬ টি মেডিক্যা ল ব্রিগেড গেছে ২০২১ সালের মার্চ মাস অবধি। সেই মেডিক্যা ল টিমের ৫৫.৪% ছিলেন মহিলা। 'অপারেশন মিরাকল'-এর মাধ্যমে লক্ষাধিক মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফেরানো থেকে শুরু করে হেনরি রিভ চিকিৎসা ব্রিগেডের জীবনরক্ষাকারী কাজ, লাতিন আমেরিকান মেডিক্যাউল স্কুলে গরিব দেশের হাজারো শিক্ষার্থীকে চিকিৎসক হিসাবে গড়ে তোলা, কলম্বিয়ায় শান্তি আলোচনায় আয়োজন- সবক্ষেত্রেই কিউবা শান্তি ও মানবিক একতার প্রতীক হিসাবে বিশ্বে স্বীকৃত। কিউবা যদি মার্কিন শক্তিকে কোনোভাবে হুমকি দেয়, সেটা শুধুমাত্র তার ভালো কাজের দৃষ্টান্ত দিয়ে। এই কিউবায় সরকারি ক্ষেত্রের পরিধি সীমিত। তারপর ছয় দশকের অবরুদ্ধ পরিস্থিতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর জীবনযাত্রা অনেক কঠিন হয়েছে। আবার অবরোধের ফলে বা করোনা পরিস্থিতিতে মূল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পর্যটন ধাক্কা খায়। এমতাবস্থায় কিউবা বিভিন্ন আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নতুন করে ভাবনা চিন্তা শুরু করেছিল। বিনিয়োগ করছিল স্পেন, ইতালির মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো, ব্রাজিল সহ দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, রাশিয়া, চীনের মতো দেশগুলো। সেখানে আবার ধাক্কা ট্রাম্পের নয়া হিটলারি ফরমানে। চীন পাশে দাঁড়ানোর কথা বললেও, বাধা হয়ে যাচ্ছে দূরত্ব। আর ট্রাম্পের নতুন নিষেধাজ্ঞায় শুধু কিউবার জনগণকেই নয়, বরং আমাজনের জঙ্গল থেকে সাহারা মরুভূমি- কিউবার উন্নত চিকিৎসা -শিক্ষা সহ নানা মানবিক কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হওয়ার মুখে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষও। কারণ গরিব দেশের প্রান্তিক মানুষগুলো কিউবার মানবিক কর্মসূচির সুফল পায় এত কিছুর মধ্যেও।
এখন তাই গোটা দুনিয়ার উচিত প্রকাশ্যে ও স্পষ্ট ভাষায় এই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নিন্দা জানানো, একে বাতিলের দাবি তোলা, মার্কিন অবরোধ ও বহিরাগত শক্তির বল প্রয়োগের যেকোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা এবং কিউবার জনগণের শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। অনেকটা আলেকজান্ডারের উদ্দেশ্যে পুরু রাজের মতোই কিউবার রাষ্ট্রপতি বলছেন,"আমরা শান্তির দেশ। এই সমস্ত আগ্রাসন এবং এই সমস্ত বছরের অবরোধের মধ্যেও, আমরা বলেছি যে মার্কিন সরকারের সাথে আলোচনার ক্ষমতা ও ইচ্ছা আমাদের আছে। কিন্তু আলোচনা তো চাপের অধীনে হতে পারে না। আলোচনা হতে হবে সমান শর্তে, সম্মানের সাথে এবং পূর্বশর্ত ছাড়াই।"
সাম্রাজ্যবাদের নজর দেড়শো কোটি মানুষের ভারতের বাজারও। ইতিমধ্যেই দুশো বছর আগের কায়দায় ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের কাছে দেশকে বিক্রির সওদা করে ফেলেছেন মোদী সরকার। দেশের মান ডুবিয়ে ট্রাম্পকে খুশি করতে ইজরায়েলে গিয়েছিলেন। কিন্তু অতীতের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আবার বিশ্ব জুড়ে লুটের নকশা নিয়ে যখন নামছে, তখন আন্তর্জাতিক সংহতি গুরুত্বপূর্ণ, সাম্রাজ্যবাদ, ফিন্যান্স ক্যাপিটালের শোষণে অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পরিবেশ সহ সব ধরণের শোষিত বঞ্চিত মানুষের আশু ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ। ফিদেল-চে-ক্যামিলো-ভিলমাদের লড়াইয়ের মাটি কিউবা সেখানে এক অনুপ্রেরণা। কিউবা মানে আমরা আজকেও বুঝি 'ছোট্ট ডেভিডের লড়াই, উত্তরের গোলিয়াথের' এর বিরুদ্ধে। কিউবা মানে হার না মানা জেদ- প্রত্যয়-দৃঢ়তা। কিউবা মানে, 'হয় সমাজতন্ত্র না হয় মৃত্যু।' এদেশ সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের এক অনন্য অনুশীলন। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-নারী মুক্তির প্রতীক। ওরা ভারত বন্ধু। যারা ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে দিল্লির ন্যাম মঞ্চে বা রাষ্ট্রপুঞ্জে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত প্রস্তাবে। দুই দেশ একত্রে উচ্চারণ করেছিল "poverty is the biggest pollutant"। এই কিউবায় হোসে মার্তিরা শিখিয়েছেন, মানবতাই আমার স্বদেশ। শিখিয়েছে 'পাথরের পরিখা চেয়েও দিশারী হলো আদর্শের পরিখা।' তাইতো কিউবানরা মুক্তিকামী মানুষের ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়েন আলজেরিয়া থেকে নামিবিয়া অবধি। অন্যের দেশ দখল করতে নয়। স্বাধীনতার লড়াইয়ে।
আইজেনহাওয়ার থেকে বাইডেন— অনেক চেষ্টা করেও শেষ করতে পারেনি কিউবাকে। আবার এসেছে ট্রাম্প। দীর্ঘ অতীতে নির্মম আক্রমণের মুখেও দমে যায়নি ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্রটি। এ যেন সেই অ্যাসটেরিক্স এবং ওবেলিক্সের স্বাধীনচেতা 'গল গ্রাম।' যাদের কোনদিন কবজা করতে পারেনি বিশ্বজয়ী সিজারের রোমান সেনারা। কিউবার জলপাই উর্দি পরা দাড়িওয়ালা লোকটার হুঙ্কার,"অবরোধকে ওরা আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে, আর আমরা করেছি গেরিলা যুদ্ধকে," সেই উত্তরাধিকার মিগুয়েল দিয়াজ ক্যানেলের লড়াইয়ের বার্তায় স্পষ্ট। ওরা পেরেছে অতীতে, এখন পারছে, কারণ কথা কম কাজ বেশি করা কিউবান কমরেডদের আদর্শ "পাথরের পরিখার থেকেও শক্তিশালী।" বাকি দুনিয়ারও দায়িত্ব আছে শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর স্বার্থে সকল প্রগতিশীল শক্তিকে একজোট হয়ে কিউবার প্রতি সংহতিতে পাশে থাকা। বহু সংগ্রামে ইস্পাত দৃঢ় কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরো এবারেও বার্তা দিয়েছে, ‘কোনও আত্মসমর্পণ নয়, আমরা লড়ব, আমরা জিতব।’
Comments :0