MANDA MITHAI — RESHIRAJ DAS — WOMENS DAY — NATUNPATA | 8 MARCH 2026, 3rd YEAR

মণ্ডা মিঠাই — ঋষিরাজ দাস — নারী-ই মা ,মা-ই নারী — নতুনপাতা — ৮ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MANDA MITHAI  RESHIRAJ DAS  WOMENS DAY  NATUNPATA  8 MARCH 2026 3rd YEAR

মণ্ডা মিঠাই

নতুনপাতা

নারী-ই মা ,মা-ই নারী

ঋষিরাজ দাস

৮ মার্চ ২০২৬, বর্ষ ৩

“কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী, পূরুষের তরবারি; প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়ালক্ষী নারী।”-----কাজী নজরুল ইসলাম

একজন নারী তার কৃতিত্ব বা প্রশংসা দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না, বরং সে জীবন এবং এর সাথে সম্পর্কিত মানুষদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি , সহানুভূতি, তার স্থিতিস্থাপকতা এবং নিজের ও অন্যদের প্রতি তার শ্রদ্ধার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয়। নারী চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলির মধ্যে কোমলতা, সহানুভূতি, সহনশীলতা, সংবেদনশীলতা এবং স্নেহশীলতা অন্যতম। তারা প্রায়শই সাহসী, দায়িত্ববান এবং আত্মবিশ্বাসী হন, যা নেতৃত্বের গুণাবলীরও প্রকাশ ঘটায়। এছাড়া সৃজনশীলতা, আতিথিয়তা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও নারী চরিত্রের অনন্য দিক। আবার বর্তমানে আধুনিক নারী চরিত্রগুলিতে সাহসিকতা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ লক্ষ্য করতে পারা যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলীর ক্ষেত্রে বর্তমানে পুরুষদের সাথে নারীদেরও অবশ্যই তুলনা করতে পারা যায়। পরিবারের সকলের বা যে কোনো কাজের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ নারীদের সবথেকে বেশি দেখা যায়। যেকোনো সামাজিক বা পারিবারিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা একমাত্র নারীর চরিত্রেরই বৈশিষ্ট্য। আবার অতিথি আপ্যায়নে নারীদের জুড়ি মেলা ভার। সংসারের প্রতি সমান মনোযোগ রেখেই তারা মহাকাশ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের প্রভূত আবিষ্কারেও সমান দক্ষতা প্রমাণ করেছে। এক কথায় বলতে গেলে ঘরে বাইরে দু দিক সামলানোতে পারদর্শী একমাত্র নারীচরিত্র। নারী চরিত্র সাধারণত অসীম ধৈর্য, গভীর স্নেহ, ভালোবাসা ,ত্যাগ বুদ্ধিমতা , পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতীক।আধুনিক প্রেক্ষাপটে নারীরা কেবল সহানুভূতিশীল নয় বরং বিরোধিতা, স্বাধীন সাহসী এবং নেতৃত্ব দান ও প্রয়োজনে দেশের ও দশের ভার কাঁধে তুলে নেওয়াতেও সক্ষম। এছাড়া চাণক্যের মতে, নারীরা প্রায়শই পুরুষদের তুলনায় অধিক সাহসিকতা এবং বিচক্ষণতা প্রদর্শন করেন। আধুনিক সাহিত্য ও জীবনে নারীরা অশুভের বিরুদ্ধে বা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য। যে কোনো সমস্যা সমাধানে নারীরা প্রায়শই পুরুষদের থেকে বেশি ধূর্ত ও দূরদর্শীতার পরিচয় রাখে। ভারতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কালে অসামান্য সাহস , নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে অনেক নারী নিজেদের নাম নিজেরাই খোদাই করে রেখে গেছেন। বৈদিক যুগের তার্কিক গার্গী, মৈত্রেয়ী যেমন নিজেদের শিক্ষার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন তেমনি সম্মানের জন্য লড়াই করে তেজস্বী চরিত্র হয়েছেন দ্রৌপদী। আবার ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়েও বারবার প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থানে অটল থাকার শক্তি দেখিয়েছেন সীতা,খনা, সাবিত্রী থেকে শুরু করে চিতোরের মহারানী পদ্মিনী , রানী দুর্গাবতী, চাঁদ সুলতানা, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই ও বাংলার রানী রাসমণি এবং নাটোরের রানী ভবানী। আবার সাহিত্যের জগতে সামাজিক প্রথা , অন্ধধর্মের শৃংখল ভেঙে বেরিয়ে আসা মৃণাল, নন্দিনী, দুর্গা প্রমুখ প্রতিবাদী নারী যারা তাদের সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য বর্তমান যুগেও প্রাসঙ্গিক। দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কঠিন সময়ে দেশ পরিচালনা করে, স্বাধীনতা সংগ্রামী ভারতীয় নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সরোজিনী নাইডু, মাউন্ট এভারেস্ট জয়ে বাচেন্দ্রী পাল এবং প্রথম আইপিএস অফিসার প্রশাসনিক দক্ষতায় কিরণ বেদী এবং মানব সেবা ও ত্যাগের বিশ্বজনীন প্রতীক মাদার টেরেজা, প্রত্যেকে নিজ নিজ নেতৃত্বের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করেছেন।

           নারীর বিবিধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মিলিত সমন্বয়ের একটিই মাত্র শ্রেষ্ঠ রূপ হল তার 'মাতৃরূপ'। 
"য়া দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা"। যে দেবী সমস্ত প্রাণীর মধ্যে বা শক্তিরূপিনী হয়ে অবস্থান করছেন সেই সত্তা বা চৈতন্যকে বারবার নমস্কার। যা মহাবিশ্বের সবকিছুর মধ্যে বিদ্যমান। তারই একটি  জীবন্ত ও সহজবোধ্য রূপ হল আমার গর্ভধারিণী মা। মায়ের চরিত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অসীম ত্যাগ, ধৈর্য এবং মমতার এক অনন্য রূপ। তিনি সন্তানদের জন্য ঢালস্বরূপ, নিজের প্রয়োজন উপেক্ষা করে পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করেন। তিনি যেমন কোমল, তেমনি প্রয়োজনে সন্তানের সুশিক্ষার জন্য কঠোর ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে পারেন। চরম প্রতিকূলতায় তিনি অবিচল থেকে সন্তানের হাজারো অবাধ্যতাকে সস্নেহে, শিক্ষার ছায়ায় সুশিক্ষা , নৈতিকতা ও সঠিক ভুল নির্ধারণে মা প্রথম ও প্রধান পথপ্রদর্শক। সন্তানের কাছে মা হলেন এমন যে বিশ্বের সবকিছু জানে। বাবা হারা যে সকল সন্তান এই পৃথিবীতে রয়েছে তাদের কাছে মা কিংবা বাবা দুজনেরই শূন্যস্থান পূরণ করে দেন একমাত্র মা - ই। সন্তানের টলোমলো পায়ে প্রথম হাঁটা যেমন মায়ের আঙ্গুল ধরে শুরু হয়, তেমনি সন্তান বড়ো হয়ে গেলেও তার জীবনের হাজারো মানসিক ও শারীরিক লড়াই এর প্রতিবন্ধকতার সময়ে মায়ের হাত অদৃশ্য ভাবে সারাক্ষণ সন্তানকে আগলে রাখে। মা মানে সন্তানের সুরক্ষা কবচ। একটি সন্তানের সুরক্ষা ও অধিকারের লড়াইয়ের জন্য মা দেশ কাল পাত্র সমস্ত সীমা রেখা পার করে নিজের শেষ সীমানা অব্দি যেতে ও লড়াই করতে প্রস্তুত। এক্ষেত্রে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) উক্তি করেছেন, 
"মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত"।
প্রয়োজনে নিজের মুখের অন্ন তুলে দিয়ে, শাসনের বেত হাতে তুলে নিয়ে আবার কখনো দুষ্টু মিষ্টি প্রশ্রয়ের আঁচলে ঢেকে মা-ই তো আমাদের পরিণত করে তোলে। মা একমাত্র মানুষ যার কাছে সব বয়সে সব পরিস্থিতিতে এসে প্রাণ খুলে সব বলা যায় ও সব সমাধান পাওয়া যায়। মা জীবনের ওপারে চলে গেলেও সব সময় মায়ের স্নেহ, ছায়া তার শিক্ষার মধ্যে দিয়ে সারা জীবন অনুভূত হয়। ভগবানের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি "মা"। এক্ষেত্রে মনীষী আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, 
"আমি যা কিছু, বা যা কিছু হওয়ার আশা করি, তার সবটুকুই আমার মায়ের কাছে ঋণী।"

              কিন্তু বর্তমানে এই মা-ই সন্তানের দ্বারা অকথ্যভাবে নির্যাতিত এবং নিপীড়িত হচ্ছেন। মায়ের স্থান হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। মায়ের মধ্যে দিয়ে  অন্যায় ভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন সমাজের প্রত্যেকটি নারীরাও। সন্তান যেমন তার স্বার্থ পূরণের জন্য নিজের সুখের জন্য মায়ের প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছে তেমনি সমাজের কিছু হিংস্র মানব রূপী জন্তু-জানোয়ারেরাও
নারীদেরকে কেবল ভোগ বাসনার বস্তু বলে জ্ঞান করছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতাকে, কর্মদক্ষতাকে ছোটো করে দেখানোর চেষ্টা করে তাদেরকে হেনস্থা করার চেষ্টায় একশ্রেণীর মানুষ লেগে আছে। একদিকে আমাদের সরকারী শাসনব্যবস্থা যেরকম নারী উন্নয়নের জন্য তটস্থ, আবার সেই নারীরই প্রতিবাদী কন্ঠকে গলা টিপে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য সেই প্রশাসনই আইনের ফাঁক খোঁজে। কিন্তু জীবনের শক্তি যখন নারী, যাত্রা শুরু যখন নারীর গর্ভ থেকেই, তখন সেই নারীর ন্যায় বিচারের জন্য আবার অজস্র মানুষও রাস্তায় প্রতিবাদের কন্ঠ তোলে। তাইতো হওয়া উচিত। 

       সব শেষে বলতে পারি নারী মোটেই অবলা নয় । তাকে অবলা করার চেষ্টা করা হয়। নারীদেরও আরও শক্তিধারী হয়ে ওঠার প্রয়োজন আছে, প্রয়োজন আছে নিজের পায়ের তলার জমিকে আরো অনেক অনেক অনেক মজবুত করার। দেবীর হাতের খাঁড়া রুপী অস্ত্রকে নিজেদের শক্তি রুপী অস্ত্রে পরিণত করা। নজরুলের ভাষায় বলতে পারি---" জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা।"শুধু সমাজকে, সামাজিক ব্যবস্থাকে আর সর্বোপরি মানুষকে লেখকের হাত ধরে একটা প্রশ্ন করতে বড্ড ইচ্ছে করে---"মায়ের দুধ খাও আর মায়ের গায়ে কাদা ছোঁড়ো, তোমরা কী? মানুষ না পিশাচ?"

 

 অষ্টম শ্রেণী, কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা মজুমদার ভিলা, কল্যাণনগর।

Comments :0

Login to leave a comment