Post Editorial

ফ্যাসিবাদী শ্রমকোড বনাম ভারতের শ্রমিক শ্রেণি

উত্তর সম্পাদকীয়​

সুদীপ দত্ত


২৬ নভেম্বর ২০২৫– গোটা দেশ জুড়ে শ্রমিক-কৃষকেরা রাস্তায় নেমে একটি কাগজ পুড়িয়েছেন– ৪টে শ্রমকোডের প্রতিলিপি। নিঃসন্দেহে, কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর শক্তি ও সীমার বাইরেও বহু শ্রমজীবী মানুষ এই বিক্ষোভে ভাগ নিয়েছেন। তাদের সম্মিলিত মেজাজ পরিষ্কার করেছে যে আগামী দিনে এই শ্রমকোড প্রত্যাহার করানোর জন্য দেশের খেটে খাওয়া মানুষ যে কোনও পর্যায় পর্যন্ত লড়াইতে যেতে পারেন। 
কেন্দ্রীয় সরকার এর ৫ দিন আগে ২১ নভেম্বর ৪টি শ্রমকোড নোটিফাই করেছে– এই কোডগুলোর মূল বক্তব্য হলো শ্রমের দুনিয়ায় নমনীয়তা (Flexibility) নিয়ে আসা। আর এর সাথে সাথে, অক্টোবর মাসে প্রকাশ করা খসড়া শ্রমশক্তি নীতিকেও আমাদের মিলিয়ে দেখতে হবে, আর তার সাথেই বুঝে নিতে হবে দেশের শ্রমবাহিনী সম্পর্কে দেশের সরকারের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি।
নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি এই আইন আরোপ করার মাধ্যমে আরও যেন পরিষ্কার হয়ে উঠলো। স্বাধীন ভারতে শ্রমজীবী মানুষের ওপর এত বড় আইনি হামলা হয়তো এর আগে হয়নি। তবে একই সঙ্গে এই কথাও মাথায় রাখতে হবে যে ফ্যাসিবাদ আনার প্রয়োজন তখনই হয়, যখন পুঁজিবাদ তার সঙ্কটকে সাধারণ উপায়ে আর সমাধান করতে পারে না। আর তাই, এই শ্রমকোডকে, এর উদ্দেশ্য, পরিচালন (Operation) প্রক্রিয়াকে বুঝতে হবে সঠিকভাবে। আর বুঝতে হবে কিভাবে তা আমাদের দেশের পুঁজিবাদের বর্তমান বেনজির সঙ্কটের দশার সাথে সম্পর্কিত। 
গত কয়েক বছর ধরেই, দেশের সব জনপ্রিয় মিডিয়া সংস্থা, ব্যবসায়ীদের মুখপাত্র, এবং এমনকি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ইকোনমিক সার্ভে সকলেই বারবার বলছে যে ভারতের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে আসছে না। সরকার বলছে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গেলে মালিকদের লাভের হার আরও বাড়াতে হবে, তাই শ্রম ব্যবস্থায় নমনীয়তা আনতে হবে। 
অন্যদিকে, একই অর্থনৈতিক সমীক্ষা জানাচ্ছে যে কর্পোরেট মুনাফা ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। আবার একই সাথে বলা হচ্ছে সাধারণ মানুষের গড় ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে। ফলে এক অদ্ভুত আপাত বিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ভোগ এবং সাধারণ মানুষের আয়ের স্তর কমে আসলেও কর্পোরেট মুনাফা বাড়ছে; এবং মুনাফা বৃদ্ধির পরও বিনিয়োগ করার প্রবণতা বাড়ছে না।
এই সমস্যার মূলটা বুঝতে গেলে প্রথমে দেখতে হবে যে আজকের ভারতের তথাকথিত উপভোক্তা (Consumer) কারা। ১৯৯১ সালে উদারনীতি আসার পর দেশের মোট আয়ের উপরের ১ শতাংশ মানুষের আয়ের অংশ ক্রমাগত বেড়েছে, আর নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের অংশ দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। নিঃসন্দেহে, নিচের ৫০ শতাংশ, যারা ভারতের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, তারা আজ এক অসহ্য কষ্টকর অবস্থায় রয়েছেন। কেবলমাত্র টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম আয়ও তারা নিশ্চিত করতে পারছেন না। যেহেতু তাদের ব্যবহৃত ভোগ্যপণ্য মূলত খাদ্য, পোশাক এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মতো অত্যাবশ্যক জিনিসেই সীমাবদ্ধ। তাই তাদের ভোগে (Consumption) ব্যাপক হ্রাস এখনও দেখা যায়নি। তবে তাদের ক্রমশ অমানবিক এবং ন্যূনতম জীবনমানেরও নিচের স্তরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বুর্জোয়া মিডিয়া যে উপভোক্তাদের নিয়ে চিন্তিত, তারা আসলে ভারতের শীর্ষ ৪০ শতাংশ মানুষ, বিশেষ করে শীর্ষ ১০ শতাংশ। এই অংশের মানুষ উদারনীতির প্রথম দেড় দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয়েছিল, এবং এই সময়কালে তাদের আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ঘটেছিল। এই শীর্ষ ১০ শতাংশ সহ ৪০ শতাংশ উপভোক্তার আয় ২০১৭ সাল থেকে কমতে শুরু করে এবং ২০২৪ সালেও তা পুনরুদ্ধার হয়নি। ফলে, উদারনীতির অধীনে একটি ভোগের সঙ্কট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর কারণ কী?
এর মুলে রয়েছে পুঁজির বেলাগাম কেন্দ্রীকরণ। ভারতের শীর্ষ ৫০০ তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যেও বিপজ্জনক স্তরের ‘মুষ্টিমেয়র একচেটিয়াকরণ’ (Oligarchic Monopolisation) তৈরি হয়েছে। শীর্ষ ১০ কোম্পানির মুনাফার হার অত্যন্ত উচ্চ, শীর্ষ ৫০ কোম্পানির ক্ষেত্রেও তা বেশি, কিন্তু বাকি ৪৫০ কোম্পানির ক্ষেত্রে তা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। 
ফলে, ভারতের কর্পোরেট খাতের অধিকাংশ মুনাফা অল্প কয়েকটি কোম্পানির হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে এদের পরের স্তরের বড় কোম্পানিগুলো যদি তাদের তুলনামূলকভাবে সচ্ছল কর্মচারীদের সুবিধা না কমায় তাহলে তাদের লাভের পরিমাণ কমতে থাকবে, আবার এই অংশের শ্রমিক কর্মচারীর ওপর হামলা করলে তার প্রভাব পড়বে বেশি দামের পণ্যের ভোগের বাজারের ওপর। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ২০২৫–২৬ সালের বাজেটে আয়করের ছাড় দেওয়া মূলত এই সমস্যার সমাধান করার প্রচেষ্টারই অংশ। ফলে, বৃহৎ পুঁজির শক্তির ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ ও একচেটিয়া দখল, অন্যান্য কোম্পানির টিকে থাকার সংগ্রাম, এবং গভীরতর কাঠামোগত সঙ্কট— সব মিলিয়ে আমাদের দেশের পুঁজিবাদ বেশ বিপদে। 
এই সঙ্কট থেকে বেরনোর একমাত্র পুঁজিবাদী উপায় হলো, এই উপরের দিকের অপেক্ষাকৃত বেশি বেতনের শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগকারী সংস্থাগুলো আবার তাদের সঙ্কটের বোঝা আরেকটু নিচের দিকে ঠেলে দেবে। তা প্রযুক্তিগতভাবে আজকের দিনে সম্ভব, কারণ এই সমস্ত কোম্পানিগুলোর বিস্তৃত মূল্য শৃঙ্খলে সরবরাহকারীর (Supplier in a Value Chain) কাজ করে মাঝারি-ছোট সংস্থাগুলো। ফলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্কট থেকে বেরনোর উপায় হলো এই মাঝের স্তরের কোম্পানিগুলোর মধ্যবর্তী পণ্যের দাম কমানো, যাতে ওপরের কোম্পানিগুলোর লাভ সুরক্ষিত থাকে। এবং একই সাথে এই মধ্যবর্তী সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর হাতে তাদের শ্রমিকদের ওপর আরও বেলাগাম শোষণের লাইসেন্স তুলে দেওয়া। কারণ যদি তাদের আরও বেশি শোষণ করার ক্ষমতা না দেওয়া যায়, তাহলে তাদের লাভের হার কমবে, তখন তারাও আবার বিনিয়োগ করবে না।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই এসেছে লেবার কোড। নিঃসন্দেহে এর পুরো কার্যপ্রণালী আমাদের দেশের পুঁজিবাদের বর্তমান সঙ্কট মাঝারি ও ছোট শিল্পে কর্মরত সবচেয়ে গরিব অংশের শ্রমজীবী মানুষের ওপরে চালান করার প্রক্রিয়া এবং শ্রমকোডের পরিবর্তনগুলো দেখলেই একথা পরিষ্কার বোঝা যাবে। 
নতুন চারটি শ্রম কোডে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে শ্রমিক-সংখ্যার প্রান্তসীমা বাড়ানো হয়েছে যেখানে প্রযুক্তিগত বিকাশের সাথে সাথে এই প্রান্তসীমা কমানোই যুক্তিসঙ্গত ছিল। ‘ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্ট’-এর পরিবর্তে ‘অকুপেশনাল সেফটি অ্যা ন্ড হেলথ কোড’-এ কারখানা হিসাবে গণ্য হওয়ার জন্য শ্রমিক-সংখ্যার সীমা বাড়িয়ে ১০ থেকে ২০ (বিদ্যুৎ সহ) এবং ২০ থেকে ৪০ (বিদ্যুৎ বিহীন) করা হয়েছে। ফলে হাজার হাজার ছোট-মাঝারি ইউনিট আইন থেকে বাদ পড়বে। একই কোডে অস্থায়ী চুক্তি শ্রমিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘লাইসেন্স ও রেগুলেশন’ প্রয়োগের সীমা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়েছে; এর ফলে ৫০-এর কম ঠিকা শ্রমিক নিয়োগকারী কনট্রাক্টরের ক্ষেত্রে আর কোনও ধরনের আইন-কানুন মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন কোড’-এ লে-অফ, ছাঁটাই ও প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে পূর্ব অনুমতির বাধ্যবাধকতা ১০০ কর্মী থেকে বাড়িয়ে ৩০০ শ্রমিক যুক্ত ফ্যাক্টরি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর বলবৎ করা হয়েছে, যার ফলে দেশের বিশাল সংখ্যক ফ্যাক্টরি মালিক এখন ইচ্ছামতো শ্রমিক ছাঁটাই বা ইউনিট বন্ধ করতে পারবে। এ ছাড়া ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডার’ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও একইভাবে ১০০ থেকে ৩০০-তে সীমা বাড়ানো হয়েছে, ফলে কাজ সংক্রান্ত পরিষ্কার নিয়ম-নীতি, কাজের শর্ত, শাস্তিমূলক বিধি, ছুটি বা অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম থাকার বিষয়টি অধিকাংশ ইউনিটে আর বাধ্যতামূলক নয়। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এই সমস্ত ধারার এক ও একমাত্র উদ্দেশ্য হলো দেশের সংগঠিত ক্ষেত্রেরও প্রায় ৯০% শ্রমিককে এই সমস্ত শ্রম আইনের দায়রা থেকে বের করে দিয়ে মাঝারি-ক্ষুদ্র কারখানায় শোষণের মাত্রা বাড়ানোর বন্দোবস্ত করা। 
সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রান্তসীমাও এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে মালিকরা সহজেই তাদের বাধ্যবাধকতা এড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ৫০০-এর কম শ্রমিক থাকা কারখানা বা নির্মাণ কাজের জন্য কোনও সেফটি অফিসার নিয়োগ বাধ্যতামূলক নয়। ২৫০-এর কম হলে ওয়েলফেয়ার অফিসার প্রয়োজন নেই; ১০০-এর কম হলে ক্যান্টিন প্রয়োজন নেই। ৫০-এর বেশি মহিলা শ্রমিক থাকলে তবেই ক্রেস-এর সুবিধা দিতে হবে। ৫০০ শ্রমিক থাকলে তবেই অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিতে হবে। 
বৃহৎ অংশের শ্রমিক ও কর্মচারী যারা ‘সুপারভাইজার’ বা ‘ম্যানেজার’ পদে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে যারা ১৮,০০০ টাকা মাসিক বেতন পান, তারা শ্রমিক সংজ্ঞার মধ্যে আর পড়ছেন না। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের ‘সুপারভাইজার/ ম্যানেজার/ অফিসার/এক্সিকিউটিভ’ হিসাবে নিযুক্ত করা হয়, যাতে তাদের ইউনিয়ন করার অধিকার হরণ করা যায়। ‘কোড অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস’ এই ষড়যন্ত্রকে বৈধতা দিয়েছে। 
নতুন শ্রম কোডে স্থায়ী কাজে নির্দিষ্ট মেয়াদের নিয়োগকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এতে ভবিষ্যতের সমস্ত নিয়োগ স্থায়ী না হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তিতে বাঁধা থাকবে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে নিয়োগকর্তা নিজের মর্জিমতো শ্রমিককে বাদ দিতে পারে। ফলে শ্রমিকরা পদোন্নতি, সিনিয়রিটির সুযোগ হারাবে। চাকরি হারানোর ভয় থাকার কারণে শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে।
বৃহৎ অংশের শ্রমিক, বিশেষ করে অসংগঠিত শ্রমিকদের চালু সামাজিক সুরক্ষাও নতুন কোডে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলা হয়েছে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য চালু আইনগুলি সামাজিক নিরাপত্তা কোডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ সরকার এই নতুন কোডে এই সমস্ত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য চালু সেস সংগ্রহ সংক্রান্ত বিধান বাতিল করেছে। ফলে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষা কার্যতঃ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
নতুন শ্রম কোডে ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন ও ধর্মঘট, দুই মৌলিক শ্রমিক অধিকারের ওপরেই হামলা করা হয়েছে। ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের জন্য এখন প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমিকের ১০ শতাংশ বা ১০০ জন সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক, যা বড় ইউনিট বা বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে সংগঠন শুরু করার প্রক্রিয়াকে অনেক কঠিন করে দেবে। রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়াও জটিল ও শ্রম-আধিকারিকের মর্জির ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হয়েছে। ধর্মঘটকে কার্যত নিষিদ্ধ করার জন্য সব শিল্পক্ষেত্রেই ১৪ দিনের নোটিস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর তার ওপর কোনও সমঝোতা প্রক্রিয়া চলাকালীন ধর্মঘট নিষিদ্ধ; নিয়ম ভাঙলে কঠোর জরিমানা ও শাস্তি রাখা হয়েছে, যা শ্রমিকদের ভয় দেখিয়ে ধর্মঘট আটকাবার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
আর এ সমস্ত আইনি ধারাই শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে আরও আরও উদ্বৃত্ত শ্রম শ্রমিকের থেকে বের করে নেওয়ার জন্য পরিকল্পিত। নতুন শ্রম কোডে কাজের ঘণ্টান্টার বিস্তৃতি (Spread-over) এবং ওভারটাইমের নিয়ম শ্রমিকদের জন্য খুবই ক্ষতিকরভাবে বদলানো হয়েছে। নতুন কোডে এই সময় বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ মালিক চাইলে শ্রমিককে কাজ, বিরতি ও অপেক্ষা মিলিয়ে পুরো ১২ ঘণ্টা কর্মক্ষেত্রে থাকতে হতে পারে, যদিও তার কাজের সময় হবে ৮ ঘণ্টা, বেতনও সেই অনুযায়ী। 
এ ছাড়া ওভারটাইমের নিয়মও ঢিলেঢালা করা হয়েছে। এতে শ্রমিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো আরও সহজ হবে। নতুন কোডে ৪-দিনের কর্মসপ্তাহের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মানে প্রতিদিন ওভার-টাইম বেতন ছাড়াই ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো একদম বৈধ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে এসব পরিবর্তন শ্রমিকদের বিশ্রাম, স্বাস্থ্য, পরিবার-জীবন এবং সংগঠিত হওয়ার সুযোগে ভয়ানক প্রভাব ফেলবে। 
প্রতি বছর আমাদের দেশে হাজার হাজার শ্রমিক কার্যক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা যান। নতুন শ্রম কোডে শ্রমিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইন্সপেকশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। আগের মতো হঠাৎ বা অনিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগ নেই; এখন ইন্সপেক্টরকে আগে নোটিস দিতে হবে, সরকারের পারমিশন নিতে হবে। এর ফলে মালিকরা সব অনিয়ম লুকিয়ে ফেলতে পারবে এবং প্রকৃত কাজের পরিস্থিতি দেখা যাবে না। এছাড়া ইন্সপেক্টরের স্বাধীনতা কমানো হয়েছে, তাকে কেবলমাত্র সহায়ক বা ফেসিলিটেটর করে দেওয়া হয়েছে, তাই তার পক্ষে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও কঠিন। ফলস্বরূপ, শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে, মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়বে।
এর সাথেই এসেছে শ্রমশক্তি নীতি ২০২৫, যার মূল উদ্দেশ্য হলো গোটা দেশের শ্রমশক্তিকে এক ডিজিটাল ডেটাবেসের মধ্যে নিয়ে এসে পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী হাজির করা, সমস্ত স্থায়ী কাজের বদলে শ্রমকে ‘গিগ’ নেচারের করে দেওয়া হবে – অর্থাৎ গোটা দেশের শ্রমশক্তিকেই ধীরে ধীরে সমস্ত রেগুলেশনের বাইরে বের করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই বেলাগাম লুটের বন্দোবস্ত আসলে ভারতের সঙ্কটাজীর্ণ পুঁজিবাদকে বাঁচানোর জন্য সঙ্কটের বোঝা শ্রমজীবী মানুষের ওপরে চাপানোর প্রক্রিয়া। আর তাই জন্ম হয়েছে আজকের এই নয়া-ফ্যাসিবাদী ধারার। ফ্যাসিবাদের কাজই হলো পুঁজিবাদের মুনাফার প্রক্রিয়াকে বাধাহীন করার জন্য শ্রমিক শ্রেণির প্রতিবাদ করার ক্ষমতা ধ্বংস করা। আবার একই সাথে ফ্যাসিবাদ প্রমাণ করে পুঁজিবাদ গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত।
কাজেই আজ দেশের সংগঠিত আন্দোলনকে রক্ষণাত্মক মনোভাব ছেড়ে বেরোতে হবে। এই লেবার কোড রুখে দেওয়ার লড়াইকে শুধু প্রতিরোধ নয়, বরং ব্যবস্থা বদলের লক্ষ্যে আরও আক্রমণাত্মক করে গড়ে তুলতে হবে। এই সঙ্কটকালীন অবস্থার প্রকৃত দাবি হলো আইনি লড়াইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে শ্রমজীবী জনতার জঙ্গি প্রতি-আক্রমণ যা এক নতুন সমাজ গঠনের পথে এগনোর সাহস জোগাবে ব্যাপক অংশের শ্রমজীবী মানুষের মনে।
 

Comments :0

Login to leave a comment