অমিত সরকার
অতি সম্প্রতি সৌদি আরব, তুর্কিয়ের এবং পাকিস্তান মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে সই করেছে। আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই এই জোট ইসলামিক নেটো হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে কিনা তার হিসাব নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনও একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দুটি দেশ আক্রান্ত দেশের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরপরই এই চুক্তির মধ্যে আরব দুনিয়ার আরও অনেক দেশকে যুক্ত করার জন্য উদ্যোগ শুরু হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি এই জোটে যোগ দিতে পারে ইজিপ্ট বা মিশর। এছাড়াও নজরে রয়েছে কাতার, বাহরিন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী।
এখানে দুটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। এখন যে তিনটি দেশ চুক্তি সই করেছে তাদের মধ্যে সৌদির রয়েছে বিশাল আর্থিক ক্ষমতা, তুর্কিয়ের আছে সামরিক ক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের শক্তি, বিশেষত ড্রোন উৎপাদনে দক্ষতা এবং পাকিস্তানের রয়েছে বিশাল সামরিক বাহিনী এবং পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার। পরে এই চুক্তিতে মিশর যদি সই করে তাহলে আরব দুনিয়ার সবচেয়ে জনবহুল দেশটি এই জোটে চলে আসবে। সন্দেহ নেই, অর্থবল, লোকবল ও সামরিক বলে বলীয়ান এই জোট পশ্চিম এশিয়ায় নতুন এক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করবে। প্রশ্ন হলো, মার্কিন সামরিক নিরাপত্তায় এতদিন থাকার পরেও কেন এই চুক্তি ও নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করা দরকার হয়ে পড়ল।
এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই রয়েছে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধের দিকে। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প মনে করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার মতো কয়েক দিনেই তিনি কেল্লা ফতে করে দেবেন। ইরানে শাসক বদল হবে এবং সে দেশের তেলভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে আসবে। কিন্তু প্রায় পাঁচ মাসের ওপর হয়ে গেল ইরানকে বাগে আনা গেল না। বরং, ইরান আমেরিকার শক্তিক্ষয় ঘটিয়েই চলেছে। ৯ আগস্টের ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকা জানিয়েছে, যদি তেহরান হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেয় তাহলে তেহরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি না করেই ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ শেষ করতে পারেন। ইরান হরমুজ মুক্ত বলে ঘোষণা করলে তিনি ইরান যুদ্ধে আমেরিকা জিতেছে বলে ঘোষণা করে দেবেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। অথচ ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর অন্যতম লক্ষ্য ছিল, ইরানের পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্ট মাফিক ঘটনা যদি এগোয়, তাহলে বলতে হবে ট্রাম্প হারলেন এবং ইরানই জিতল। এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্য অসম্পূর্ণই থেকে গেল।
পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভরসা একদিকে ইজরায়েল, অন্যদিকে সৌদি, বাহরিন, কাতার, আমিরশাহীর মতো রাজতন্ত্রগুলি। এই দেশগুলিতে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আজ্ঞাবহ। এতদিন এই সব দেশের শাসকেরা ইরান ও ইজরায়েলের হাত থেকে বাঁচতে চোখ বুজে নির্ভর করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক শক্তির ওপর। কিন্তু গত পাঁচ মাসের যুদ্ধে তাঁবেদার আরব দেশগুলিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং দেশগুলির নিজস্ব জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর ক্রমাগত বিধ্বংসী হামলা চালিয়েছে ইরান। এবং প্রমাণ করে দিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন ঘাঁটিগুলি দুর্ভেদ্য ও অপরাজেয় নয়, বরং সেগুলির ওপর আঘাত হানা সম্ভব। এবং পালটা হানায় মার্কিন বাহিনীকে ক্রমাগত দুর্বল করে ফেলে তাদের আঘাত করার ক্ষমতাকে কমিয়ে আনা সম্ভব। যে হারে মার্কিন মিসাইল ভাণ্ডারের মজুত ফুরিয়ে আসা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে চলেছেন পেন্টাগনের কর্তারা, তাতেও বিষয়টা স্পষ্ট।
পশ্চিম এশিয়ায় দুর্ভেদ্য মার্কিন সামরিক শক্তির অতিকথা ফিকে হয়ে আসার পর এই অঞ্চলের আরব রাজতন্ত্রগুলির, বিশেষ করে সৌদি আরবের এই উপলব্ধি হয়েছে যে, তাদের জন্য মার্কিন নিরাপত্তার ঢাল পুরোপুরি নিশ্চিত আশ্রয় নয়। বরং সেই ঢাল ঠিকমতো আক্রমণ চালিয়ে দুর্বল করে ফেলা যায়, যা করে দেখিয়ে দিয়েছে ইরান। এর বিপরীত দিকটি হলো আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে ইরানের উত্থান। ইরান এখন আর সাধারণ কোনও শক্তি নয়। বরং এমন শক্তি যা আমেরিকার সামরিক ছক ব্যর্থ করে দিতে পারে এবং শক্তিশালী মার্কিন বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে টিকে থাকতে পারে। এর জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা তাদের আছে। ট্রাম্প যদি তৃতীয় দফা যুদ্ধ না বাধিয়ে ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করেন, তাহলে পশ্চিম এশিয়ায় শুধু নয়, গোটা গ্লোবাল সাউথে এক নতুন শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে ইরানের উত্থান ঘটবে। এই পরিস্থিতি মার্কিন তাঁবেদার আরব দেশগুলির পক্ষে আদৌ সুখকর নয়। এর ওপর ইরান হলো শিয়াদের দেশ যাকে আরবের সুন্নি রাজতন্ত্রগুলি সহ্য করতে পারে না। প্রশ্ন হলো, শক্তিশালী আঞ্চলিক ক্ষমতা হিসাবে যদি ইরানের উত্থান হয়, মার্কিন নিরাপত্তার ঢাল দুর্বল প্রমাণিত হয়, তাহলে সৌদি আরব, কাতার, বাহরিন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী মতো মার্কিন প্রতিরক্ষা-নির্ভর দেশগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে।
অন্যদিকের বিপদ ইজরায়েল। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র দেশ ইজরায়েল এবং এই অঞ্চলে একমাত্র পরমাণু শক্তিধর দেশ। বলা উচিত, পশ্চিম এশিয়ার তেল সাম্রাজ্যে আমেরিকার বিশ্বস্ত পাহারাদার তেল আভিভ। ইজরায়েল এতদূর বেপরোয়া যে এই অঞ্চলের মার্কিন তাঁবেদার দেশগুলিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাজা, প্যালেস্তাইন ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে নির্মম গণহত্যা চালিয়ে, প্যালেস্তিনীয়দের বহু এলাকা দখল করে চলেছে। ইজরায়েল জানিয়ে দিয়েছে, গাজা নিয়ে ট্রাম্পের সমাধান সূত্র তারা মানবে না। এর মানে, যত দিন যাবে পশ্চিম এশিয়ায় ততই বেপরোয়া হয়ে উঠবে ইজরায়েল এবং আরব দেশগুলিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার নীতি চালিয়ে যাবে। একই কারণে ইজরায়েল চায় না যে ইরান পরমাণু বোমা তৈরি করুক। কারণ তেমনটা ঘটলে পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্যই বদলে যাবে। এই জন্যই ইরান আক্রমণের জন্য ট্রাম্পকে চাপ দেওয়াটাই ইজরায়েলের রণনীতি।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান বনাম ইজরায়েল ও আমেরিকা যুদ্ধ একটি বিষয়কে সজোরে সামনে এনেছে। ইরানের সামরিক সাফল্যে মার্কিন সহযোগী দেশগুলির মধ্যে নিরাপত্তার ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। ইরানের মিসাইল আছড়ে পড়েছে সৌদি আরব সহ একাধিক উপসাগরীয় দেশে। বিপন্ন হয়েছে আঞ্চলিক পরিকাঠামো। হরমুজ অবরোধের জেরে তৈরি হয়েছে জ্বালানি বাণিজ্যে চরম অনিশ্চয়তা। এই সবকিছুই কয়েক দশক ধরে চলে আসা উপসাগরীয় এলাকার নিরাপত্তা মডেলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র কিনে মজুত করা, একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক সমঝোতা— কোনও কিছুই শেষ পর্যন্ত কাজে লাগল না। উপসাগরের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও জ্বালানি পরিকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা চালিয়ে গেল ইরান। ফলে যাকে সৌদি বা অন্য সমমনস্ক দেশের নেতারা ভেবেছিলেন নিরাপদ মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দরকারের সময় সেটা আদৌ নিরাপত্তা দিতে পারল না। ইরানের হামলায় তাদের ভালোই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার রাজতন্ত্রগুলি ও ইজরায়েল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মিত্র দেশ হলেও,একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে রাজতন্ত্রগুলির দ্বন্দ্বের চরিত্রটি বৈরিমূলক। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার দ্বন্দ্বের চরিত্রও পুরোপুরি বৈরিমূলক। এর মানে, সৌদি আরব, কাতার, বাহরিন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো দেশগুলির স্থানীয় ভাবে শত্রু দুটি— ইরান ও ইজরায়েল। প্রশ্ন হলো কে তাদের প্রধান শত্রু। নিঃসন্দেহে ইজরায়েল, কারণ এই দেশটা আরবভূমিতে স্থায়ী আগ্রাসনের উৎস। আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ মিটে গেলে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি গুছিয়ে উঠতে ইরানের সময় লেগে যাবে। তাই এখনই ইরানের পক্ষে প্রধান বিপদ হয়ে ওঠাটা সময়োপযোগী নয়, যদিও মর্যাদায় ইরান অন্যদের ছাপিয়ে যেতে পারে। যেহেতু এই দেশগুলি বুঝে গেছে, মার্কিন নিরাপত্তার ওপর আর ১০০ শতাংশ ভরসা করা যাবে না। তৈরি করতে হবে প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় লাইন। সৌদি আরব, তুর্কিয়ে এবং পাকিস্তানের মক্কা চুক্তিকে দেখতে হবে এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে।
তবে এই চুক্তির মানে এই নয় যে রিয়াধ পুরোপুরি মার্কিন জোট থেকে বেরিয়ে আসবে কিংবা তুর্কিয়ে নেটো জোট ছেড়ে দেবে। কিংবা পাকিস্তান মার্কিন তাঁবেদারির বাইরে চলে এসে স্বাধীন ভূমিকা নেবে। তিনটি দেশই তাদের নিরাপত্তার মূল শিকড়টিকে অক্ষুন্ন রাখবে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে বদল এসেছে, সে কথা খেয়ালে রেখে বিশেষ করে সৌদি সহ মার্কিন মিত্র দেশগুলি নিরাপত্তার একটি দ্বিতীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর এখন গুরুত্ব দিচ্ছে। এর আসল মানে হলো, মার্কিন সামরিক নিরাপত্তার ওপর এই দেশগুলির নিশ্ছিদ্র ভরসা কমছে। স্ট্র্যাটেজিক সার্বভৌমত্বের একটা বৃহত্তর প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়েছ সৌদি সহ এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলি। আঞ্চলিক জোটকে শক্তিশালী করা, দেশের মধ্যেকার সামরিক উৎপাদন জোরদার করা, নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে ওয়াশিংটনের স্বার্থ না মিললে, নিজেদের মতো করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করা। এর মানে আমেরিকার বৃত্তেও থাকা হলো কারণ সেটা এই পরিস্থিতিতে একরকম অপরিহার্যও বটে। আবার তারই মধ্যে আমেরিকাকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতো আর অপরিহার্য নয়। একই সঙ্গে এই চুক্তি ইজরায়েলকেও বার্তা দিচ্ছে যে, তাদের একতরফা হামলা হলে প্রতিরোধে নামার ক্ষমতা রাখবে এই তিন দেশ। বিশেষত পাকিস্তানের হাতে থাকা পরমাণু অস্ত্রের কথা ভাবতে হবে ইজরায়েলকে।
সব মিলিয়ে এই ত্রিদেশীয় চুক্তি পশ্চিম এশিয়ায় এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করছে যা আমেরিকা ও ইজরায়েলকে উদ্বেগে রাখবে। এবং তাদের আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে চীন ও রাশিয়া। কারণ এই দেশগুলি চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকেও অস্ত্র কিনতে চাইবে, চাইবে বিনিয়োগ এবং উন্নত কূটনৈতিক সম্পর্ক। বিশেষ করে রাশিয়া এই দেশগুলিকে দিতে পারে আকাশ প্রতিরক্ষা, মিসাইল প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিন যুদ্ধ সরঞ্জাম। চীনের রয়েছে বিনিয়োগ করার মতো বিপুল পুঁজি এবং রাজনৈতিক প্রভাব। ফলে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলি চীন ও রাশিয়ার সহযোগিতা চাইতে পারে। তেমনটা ঘটলে বহুপাক্ষিক বিশ্ব গড়ার দিকে আরও এক ধাপ এগোবে পৃথিবী, যেটার প্রাণপণে বিরোধিতা করতে চায় আমেরিকা।
Comments :0