MUKTADHARA | PROBANDHA | SHAHID SUNIL KUMAR MUKHOPADHAYA | AYAN MUKHOPADHAYA | 27 AUGUST 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়: কামালপুর গ্রামের বিস্মৃত শহীদ | প্রবন্ধ | অয়ন মুখোপাধ্যায় | ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  PROBANDHA  SHAHID SUNIL KUMAR MUKHOPADHAYA  AYAN MUKHOPADHAYA  27 AUGUST 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

প্রবন্ধ 

  সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়: কামালপুর গ্রামের বিস্মৃত শহীদ

  অয়ন মুখোপাধ্যায়

২৭ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

 

দ্বিতীয় পর্ব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াইয়ের ডাক দেন। দেশের বাইরে আজাদ হিন্দ বাহিনী ব্রিটিশ শক্তিকে আঘাত করবে, আর দেশের ভিতরে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়বে—এই কৌশল সুনীল ও তাঁর সহযোদ্ধাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁরা বুঝতে পারেন, যে সামরিক শক্তির উপর সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে আছে, সেই শক্তির ভিতরেই আঘাত করতে পারলে ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভিতরে বিদ্রোহ ঘটানোর এই চিন্তা অবশ্য নতুন ছিল না। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ থেকে রাসবিহারী বসু ও বাঘা যতীনের পরিকল্পনা পর্যন্ত বিপ্লবীরা বারবার ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। সুনীলদের উদ্যোগ সেই দীর্ঘ সামরিক অসন্তোষ ও বিদ্রোহী ধারারই আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৪৩ সালে কোচিনে চতুর্থ উপকূলীয় গোলন্দাজ ইউনিটের একদল ভারতীয় সৈনিক গোপনে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহের প্রস্তুতি শুরু করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সামরিক ব্যবস্থার ভিতর থেকেই ব্রিটিশ শক্তিকে আঘাত করা। কিন্তু পরিকল্পনার খবর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়।

১৮ এপ্রিল ১৯৪৩ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, মানকুমার বসু ঠাকুর, দুর্গাদাস রায়চৌধুরী, নন্দকুমার দে, চিত্তরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ফণিভূষণ চক্রবর্তী, নিরঞ্জন বড়ুয়া-সহ একাধিক ভারতীয় সৈনিককে গ্রেফতার করে।

বেঙ্গালুরুর সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চে সামরিক আদালত তাঁদের বিচার করে। ১৯৪৩ সালের ৫ আগস্ট আদালত রায় ঘোষণা করে। কয়েকজন কারাদণ্ড ও দ্বীপান্তরের সাজা পান। ব্রিটিশ সামরিক আদালত সুনীল-সহ নয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
তারপর আসে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩।

মাত্র তেইশ বছর বয়সে সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। বন্দিজীবনে কাকা শ্যামাকান্ত মুখোপাধ্যায় কে লেখা শেষ চিঠিতে তিনি লেখেন, “আমি জানি না কী অপরাধে আমার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তবে দেশের জন্য মরতে আমার কোনও আক্ষেপ নেই।”এই কথা গুলোর মধ্য দিয়েই সুনীলকে চিনে নেওয়া যায়। সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা নেই, মৃত্যুভয় নেই, আছে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি গভীর বিশ্বাস।

আমরা ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহের কথা জানি। ইতিহাসের বই সেই বিদ্রোহকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু তার তিন বছর আগে কোচিনে ব্রিটিশ সামরিক কাঠামোর ভিতরে দাঁড়িয়ে যে ভারতীয় তরুণেরা বিদ্রোহের ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তাঁদের নাম প্রায় হারিয়ে গেছে। সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় সেই বিস্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাঁকে শুধু বলাগড়ের একজন স্থানীয় শহিদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর জীবন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এমন একটি দিক সামনে আনে, যেখানে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভিতরেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিচ্ছিল। সাম্রাজ্য যে ভারতীয় সৈন্যের বন্দুকের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেই সৈন্যই একসময় বন্দুকের মুখ ঘুরিয়ে দিতে চাইছিল সাম্রাজ্যের দিকেই।
সেই ইতিহাসে সুনীলের স্থান আছে।

তাই আমাদের দাবি খুব সাধারণ। তাঁর জীবন ও ১৯৪৩-এর কোচিন সামরিক বিদ্রোহ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হোক। এই অধ্যায় স্কুলের পাঠ্যক্রমেও জায়গা পাক। বলাগড়ের নতুন প্রজন্ম জানুক—কামালপুর গ্রামের একটি ছেলে মাত্র তেইশ বছর বয়সে দেশের স্বাধীনতার জন্য ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন।
সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়কে শুধু স্থানীয় স্মৃতির মধ্যে আটকে রাখলে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে না। তাঁকে ফিরিয়ে আনতে হবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সামরিক ইতিহাসে। কারণ স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু যাঁদের আমরা মনে রেখেছি, তাঁদের নিয়ে তৈরি হয় না; যাঁদের ভুলে গেছি, তাঁদের ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়েই সেই ইতিহাস সম্পূর্ণ হয়।

Comments :0

Login to leave a comment