নজরে বেহাল শিক্ষা-১
-
শিক্ষার অব্যবস্থার বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিতে ছাত্রদের বিক্ষোভ কেন্দ্রীয় সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজ্যে স্কুলের অব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেছিলেন ইন্দাসের ছাত্র। বিজেপি কর্মীরা খুন করেছে তাঁর বাবাকে। কিন্তু ভয় দেখিয়ে রাজ্যে শিক্ষার অব্যবস্থাকে চাপা দেওয়া যাচ্ছে। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়— পশ্চিমবঙ্গে বেহাল শিক্ষা ব্যবস্থা। তারই কিছু ছবি তুলে ধরতে এই প্রতিবেদন।
রণদীপ মিত্র: মুরাররই,
কখনও অন্য কলেজের শিক্ষকদের আমন্ত্রণ জানাতে হয়। কখনও প্রাক্তন ছাত্র, যাঁরা যোগ্য, তাঁদের ডেকে আনা হয়। এই ভাবেই চলে কলেজের ভূগোল বিভাগের পড়াশোনা।
কেন? কলেজের এক শিক্ষকের কথায়,‘‘তিন বছর আর চার বছর, দুই ধরনের ক্লাস হয়। তার জন্য সপ্তাহে ৫৬টি ক্লাস প্রয়োজন। কলেজে ভূগোলের বিষয়ে আছেন একজন শিক্ষক। তিনিও আবার স্টেট এডেড কলেজ টিচার। মোদ্দা কথা তিনি ১৫টির বেশি ক্লাস পারলেও নিতে পারবেন না। ফলে বাকি ৪১টির জন্য আমাদের এই ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।’’ এভাবেই চলছে মুরারইয়ে কবি নজরুল ইসলামের নামাঙ্কিত কলেজ।
শুধু ভূগোল নয়, ওই কলেজের আরও অনেক বিভাগেরই এই হাল। বঞ্চিত হচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীরা। তার ধাক্কা পড়ছে ভর্তিতে। এবার রাজ্যে কলেজগুলিতে ভর্তি হচ্ছে কেন্দ্রীয়ভাবে। এখন চলছে তৃতীয় পর্যায়ের ভর্তির প্রক্রিয়া। রামপুরহাটের মতো বীরভূমের বেশিরভাগ কলেজে মোট আসনের ৩৫ থেকে ৪০শতাংশ আসন পূরণ হয়েছে। কত আসন শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলো, কত ছাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজমুখী হলেন, তা বোঝা যাবে শারদোৎসবের আগে। তবে প্রবণতা খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
কয়লা, বালি, পাথর চুরির জন্য বীরভূমের নাম উচ্চারিত হয়েছে বারবার, গত কয়েক বছরে। ভাদু শেখ কে, কোথায় বাড়ি বলে দিতে পারবেন রাজ্যের বাইরের অনেক মানুষই। কিন্তু শান্তিনিকেতন যে জেলায়, যে জেলা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাটি, সেখানে শিক্ষার বেহাল অবস্থা শুধু কলেজে নয়— স্কুলেও।
প্রমাণ? রাকিবুলের কথাই বলা যায়। বছর চারেক আগে পাইকরের বর্ধন পাড়ার এই পড়ুয়া ক্লাস ইলেভেনের ছাত্র। ভালোভাবেই পাশ করেছিলেন মাধ্যমিক। এগারো ক্লাসে ভর্তি হয়েও আর পড়াশুনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। রাকিবুল এখন রাজমিস্ত্রি। বয়স ছাব্বিশ। ঠিকানা তাঁর চেন্নাই। আদতে রাকিবুলের ভাই কারিবুলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে এখন পাইকর হাই মাদ্রাসার বারো ক্লাসে পড়ছেন। কিন্তু তৃতীয় সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন করাননি। কি কারণ জানতেই কারিবুলকে ফোন করা। কিন্তু ফোন রয়েছে দাদা রাকিবুলের কাছে। আলপথে খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার নিদারুণ পরিণতির কথাই উঠে আসে রাকিবুলের কথায়। চেন্নাই থেকেই রাকিবুল জানায়, ‘‘আমরা তিন ভাই। বড় দাদা অনেক আগেই চলে এসেছিল চেন্নাই। চাষবাস করে চলত আমাদের সংসার। আমি স্কুলে পড়তেই বাবার সঙ্গে খেতের কাজে লেগে পড়েছিলাম। ইলেভেনে উঠলাম। ভাবলাম পড়াশুনাটা চালিয়ে যাবো। কিন্তু চাষ থেকে যে ঘর চলছিল না। তাই স্কুলের পাট চুকিয়ে দাদার সঙ্গে ২০২২ সালে চলে এসেছি চেন্নাই।’’
রাজমিস্ত্রি বনে গিয়েছেন রাকিবুল। দিনে হাজার টাকা বেতন। থাকার জায়গা কোম্পানির। রাকিবুলের কথায়, ‘‘নিজের খরচ বাঁচিয়ে বাড়িতেও কিছু টাকা পাঠাতে পারি। ইচ্ছা ছিল ভাইটাকে পড়াবো। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি দেখে ভাইও আর স্কুলে যেতে চাইছে না। গ্রামের এক মোটরবাইকের গ্যারেজে কাজ শিখছে। সে হবে গ্যারেজ মিস্ত্রি।’’
একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন শেষের পথে। রাকিবুল আর কারিবুল- দুই ভাইয়ের স্কুল পাইকর হাই মাদ্রাসা। বীরভূম-মুর্শিদাবাদ সীমান্তের মুরারই ২নং ব্লকের হৃদপিন্ড এই পাইকর। পাইকর হাই মাদ্রসায় পড়ুয়ার সংখ্যা তিন হাজার। শিক্ষক আছেন ২২জন! শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা কম করে ৬০ জন। গত বারো-পনেরো বছরে শিক্ষকের যোগদান তো দূর, নিয়োগ তো হয়ইনি, বরং যুক্তিহীনভাবে বদলি হয়েছে। এই স্কুলটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এলাকার এক শিক্ষানুরাগীর বক্তব্য, ‘‘যা ইচ্ছা তাইই করা হয়েছে। ৩০০০ হাজার স্কুলে নতুন শিক্ষক মিলবে কি, এই স্কুল থেকে তুলে নিয়ে এক শিক্ষককে ২০০-২৫০ জন পড়ুয়ার স্কুলে বদলি করা হয়েছে। বুঝতেই পারছেন ১৯৭০ সালে গড়ে ওঠা পুরানো এক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ছেলেখেলা হয়েছে।’’
পাশেই আছে পাইকর হাই স্কুল। যার প্রতিষ্ঠা ১৯২৭ সালে। একশো বছরে পা দিয়েছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এলাকার গৌরবই শুধু নয়, ঐতিহ্যে-পরম্পরায় হাজার হাজার মানুষের আবেগ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চোদ্দশোর মতো পড়ুয়া। শিক্ষক সংখ্যা ১২! একাদশ-দ্বাদশে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, জীববিদ্যা, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাসের কোনও শিক্ষকই নেই। অথচ শিক্ষক থাকার কথা ৩২। প্রয়োজনের অর্ধেকও নেই। গোদের উপর বিষফোঁড়া এরমধ্যে ৭ জন শিক্ষককে আবার নিযুক্ত করা হয়েছে জনগণনার কাজে। একইভাবে পাইকর হাই মাদ্রাসার ২২ জনের মধ্যে জনগণনা নিয়োগপত্র পেয়েছেন আঠারোজনই।
পাইকর হাই মাদ্রাসায় শিক্ষক সৌগত রায় জানিয়েছেন, ‘‘শুধু তৃতীয় সেমিস্টারেই রেজিস্ট্রেশন করেননি ৬৮জন! যোগাযোগ করলে বেশিরভাগের কাছ থেকেই উত্তর পাই, কাজের জন্য তাঁরা বাইরে আছে। এই প্রবণতা জাঁকিয়ে বসেছে।’’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে পাইকর হাই স্কুলের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, ‘‘যা ভর্তি হয় শুরুতে তাদের সবাই পাশ করে বেরোয় না। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, নবম শ্রেণিতে গিয়ে আচমকাই কমে যায় নিবন্ধিত পড়ুয়ার সংখ্যা। একাদশ-দ্বাদশে তো প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। এর কারণ, মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ে আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ঘরবাড়ি ছেড়ে ছুট দেওয়া রোজগারের তাগিদে।’’
Comments :0