Closed Ferdous Steel

চট্টগ্রামের ৯ শ্রমিকের মৃত্যুতে বন্ধ ফেরদৌস স্টিল, অনিশ্চয়তায় শতাধিক শ্রমিক

আন্তর্জাতিক

মীর আফরোজ জামান: ঢাকা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির কাজকর্ম অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকদের একটি বড় অংশ হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দুর্ঘটনার পর এখন তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কাজ কবে শুরু হবে এবং ততদিন তাঁদের জীবিকা চলবে কীভাবে?
১৪ আগস্ট সকালে ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের একটি পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনের হিসাবে এই ঘটনায় নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের আধিকারিকরা পরে জাহাজের ভেতরে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করেন।
দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) প্রতিষ্ঠানটির সমস্ত কাজ স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে সহায়তার ঘোষণা করেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ফেরদৌস স্টিলের বর্তমানে প্রায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করতেন বলে জানা গেছে। মোট শ্রমিকসংখ্যা নিয়ে সরকারি কোনো প্রকাশ্য নথিতে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি। 
এই কারণে দুর্ঘটনার পর কর্মহীন শ্রমিকের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা আপাতত সম্ভব নয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির আকার এবং বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের তথ্য থেকে বোঝা যায়, এখানে কয়েক ডজনের বেশি শ্রমিক সরাসরি কাজ করতেন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফেরদৌস স্টিলের শ্রমিকদের জন্য ‘সেফ গ্যাস কাটিং অপারেশন’ প্রশিক্ষণে ২৩ জন অংশ নিয়েছিলেন। এর আগে ২০২২ সালে একটি বিচিং-সেফটি প্রশিক্ষণে প্রতিষ্ঠানটির ২২২ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তবে ২০২২ সালের এই সংখ্যা বর্তমান কর্মরত শ্রমিকসংখ্যা নয়—এটি প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা।
দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) পরিদর্শনে ফেরদৌস স্টিলে নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের অধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়েছিল। শ্রমিকদের নিরাপত্তা সামগ্রী ও নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলাও করা হয়।
শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজের বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টার পরিবর্তে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানোর অভিযোগ ছিল এবং অতিরিক্ত সময়ের জন্য ওভারটাইমের অর্থ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ফেরদৌস স্টিলের কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকায় শুধু দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারই নয়, প্রতিষ্ঠানের অন্য শ্রমিকদের জীবনও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মেটালওয়ার্কার্স ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডের বহু শ্রমিক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন এবং অনেকের নিয়মিত শ্রমিক-সুবিধাও নেই।
শিল্পখাতের বৃহত্তর চিত্রও উদ্বেগজনক। সীতাকুণ্ডের শিপব্রেকিং এলাকায় একটি ইয়ার্ডে গড়ে প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করেন বলে ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল।
৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর পর তদন্ত, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বন্ধ হয়ে যাওয়া ইয়ার্ডের অন্য শ্রমিকদের আয়-রোজগারের বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইয়ার্ড বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে কি না—এ প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনার আগে থেকেই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছিল, সেখানে শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করে পুনরায় কাজ শুরুর আগে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে কর্মহীন শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষার ব্যবস্থা করাও জরুরি।

Comments :0

Login to leave a comment