১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গা ছিল রক্তাক্ত বিভাজন ও হিংসার এক ভয়াবহ অধ্যায়। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও মানুষের মানবিকতা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। বরং কোথাও কোথাও বিপদের মুহূর্তেই তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মীজানুর রহমানের 'কৃষ্ণ ষোলোই' গ্রন্থে তার একাধিক অনন্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে। শান্তির দাবিতে ঐক্যের মিছিল, শান্তি কমিটির উদ্যোগ, হাসপাতাল-সংলগ্ন আশ্রয়স্থলে ইফতারের খাবার ভাগ করে খাওয়া—প্রতিটি ঘটনাই হিংসার বিপরীতে মানুষের সহমর্মিতার স্বাক্ষর। সুরুজবালি মন্টু ও লতিফকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিলেন; আবার লেখকের পরিবারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় ও সহযোগিতার সম্পর্কও ছিল। বিপন্ন একটি পরিবারকে আগেভাগে সতর্ক করে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া, আশ্রয়স্থলে বিপন্ন মানুষদের একত্রে থাকা, সামান্য খাদ্য পরস্পরের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া—এসব ঘটনাও একই মানবিক স্রোতের বহিঃপ্রকাশ। মওলা আলির দরগায় মানত ও শিন্নির মতো লোকায়ত ধর্মাচরণ এবং পাড়া-মহল্লায় দৈনন্দিন পারস্পরিক সহযোগিতার উল্লেখও সেই সামাজিক সহাবস্থানের দীর্ঘ পরম্পরাকে সামনে আনে।
সুরঞ্জন দাসের Communal Riots in Bengal, 1905–1947 গ্রন্থে ঘানির কথা রয়েছে। তিনি বিপন্ন পরিবারগুলিকে বালিগঞ্জে নিরাপদে পৌঁছে দেন এবং তাঁর উদ্যোগে পার্ক সার্কাসের অন্য বাসিন্দারাও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। বৈঠকখানায় প্রায় ৩০০ জন মুচি ট্রামকর্মীদের রক্ষা করেন। গার্চা রোডে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যৌথভাবে পাহারার সিদ্ধান্ত নেন।
অন্বেষা রায়ের Making Peace, Making Riots: Communalism and Communal Violence, Bengal, 1940–1947 গ্রন্থে কংগ্রেসের নেতা সুরেন্দ্র মোহন ঘোষকে আক্রমণকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারক দাসের সহকর্মী ড. আহমেদের বাড়ি লুট করতে আসা জনতাকে বাধা দেওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
এই ঘটনাগুলি দাঙ্গার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে—হিংসা যেমন মানুষকে বিভক্ত করেছিল, তেমনই বিপদের মুহূর্তে বহু মানুষ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অন্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাসের সেই মানবিক মুহূর্তগুলিই কলকাতার দাঙ্গার বিবরণকে কেবল হিংসার ইতিহাস হয়ে থাকতে দেয় না।
Comments :0