আরএসএস’র তাত্ত্বিক নেতা রাম মাধব এক নিবন্ধে কিছুদিন আগে জানিয়েছিলেন ১০ জুন মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের ৪৩৯৮ দিন পেরিয়ে ৪৩৯৯ পূর্ণ হবে। তারপর থেকে দলগতভাবে বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার এমনকি রাজ্যে রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকারগুলি দিনটি মহাসমারোহে উদ্যাপনের জন্য নানা পরিকল্পনা ও প্রচারের আয়োজন করে ফেলে। ভারতীয় পরম্পরায় (এমনকি অন্যত্রও) উদ্যাপনের জন্য সাধারণভাবে রজত জয়ন্তী, সুবর্ণ জয়ন্তী, হীরক জয়ন্তী, প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী, শতবর্ষ ইত্যাদি মাইলফলকগুলিকে বেছে নেওয়া হয়। আবার ১০০ দিন, এক হাজার দিন, এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর, দশ বছরকেও বাছা হয়। মোদী সরকার বা মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য আশ্চর্যজনকভাবে এর কোনোটিকেই বাছাই করা হয়নি ধামাকা ধরনের উদ্যাপনের জন্য। বাছা হয়েছে ৪৩৯৯ দিনকে। কেন?
মোদীরা উদ্যাপনের পাঁচ, দশ, বারো বছরকে বাছেননি কারণ তাতে সঙ্কীর্ণ রাজনীতির পরিসর নিতান্তই কম। নিজেদের জাহির করার রসদও কম। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে মোদী জমানার সাফল্য, সংবিধান নির্দেশিত পথে অগ্রগতি, মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রসার, ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতি নির্বিশেষে মানবাধিকার সুরক্ষা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-তে সমান সুযোগ, আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস ইত্যাদি নিয়ে বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলার মতো কিছু নেই। শাসন ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের বিকাশ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করা, বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বলার মতো কিছু নেই। এই অবস্থায় মিথ্যা ভিতে আপন শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠা দিতে ভারত আকাশে প্রবলভাবে দেদীপ্যমান জওহরলাল নেহরুকে যে কোনও প্রকারেই হোক ম্লান করতেই হবে। তাই যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো নেহরুকেই টার্গেট করে তাঁকে অতিক্রম করার নির্বোধ অভিলাষ। অর্থাৎ উচ্চতায় ওঠার সাধ্য যখন নেই তখন যে উচ্চাসনে ইতিমধ্যেই উঠে আছে তাঁকে ছলে বলে কৌশলে নামাতে হবে। সেই লক্ষ্যেই অনেক হিসাব কষে ৪৩৯৯ নিকে আঁকড়ে ধরতে হয়েছে।
১৯৫২ সালে দেশের প্রথম নির্বাচনে জয়ী হয়ে নেহরু প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তী দু’টি নির্বাচনেও জয়ী হন। তিন দফায় তিনি মোট ৪৩৯৮ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মোদী ১০ জুন সেই সংখ্যা অতিক্রম করেছেন। অতএব মোদীর কাছে নেহরু খাটো হয়ে গেছে। মোদীই ভারতের দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৫২ সালে নির্বাচিত সরকার গঠনের আগে পর্যন্ত পাঁচ বছর তো নেহরুই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময় নেহরুর সেই মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী ছিলেন মোদীর অতি প্রিয় নেতা বল্লভভাই প্যাটল এবং বর্তমান বিজেপি’র পূর্বপুরুষ হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। মোদীকে সর্বোচ্চ রেকর্ড দিনের প্রধানমন্ত্রী দেখানোর জন্য নেহরুর প্রথম ৫ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বকে হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে সেটা তো নির্বাচিত সরকার ছিল না। নির্বোধের যুক্তি নির্বাচন না হলে প্রধানমন্ত্রী ধরা হবে না। স্বাধীন হবার পর কোনও দেশেরই প্রথম সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে হয় না। মোদীদের কথা মানতে হলে স্বাধীন ভারতের প্রথম পাঁচ বছরকে ইতিহাস থেকে বাদ দিতে হয় এবং তখন দেশে যা কিছু সরকারি কাজ হয়েছে সব কিছুকে অবৈধ ঘোষণা করতে হয়। উলটো দিকে নেহরু তিন দফায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। মোদী কিন্তু তৃতীয় দফায় জনতার নিরঙ্কুশ সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হননি। হয়েছে অন্য দু’টি দলের সমর্থনের কল্যাণে। যদি ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার কথা হয় তাহলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি তো পরাজিত। তাই প্রশ্নটা কতদিন ক্ষমতায় থাকার নয়। দেশ গড়া, মানুষ গড়া এবং সমগ্র দেশবাসীর সামগ্রিক উন্নয়নই আসল কথা। সেই জায়গায় মোদী সরকারের সাফল্য নেই বললেই চলে। তবে আদানি-আম্বানি সহ বৃহৎ কর্পোরেটের স্বার্থে মোদীর সাফল্য তুলনাহীন। দেশে আয় ও সম্পদের সীমাহীন বৈষম্য বৃদ্ধিতেও তিনি সফল। বেকার বৃদ্ধিতে সফল। সংবিধানকে বাতিলের পর্যায়ে নেওয়ার কাজে সফল। বিদ্বেষ, ঘৃণায় বিভাজিত সমাজ গঠনে সফল।
Editorial
জুমলা রেকর্ড
×
Comments :0