editorial

আবেগের রাত মুনাফার অঙ্ক

সম্পাদকীয় বিভাগ বিশ্বকাপ ২০২৬

২৩তম ফুটবল বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এই প্রতিযোগিতা এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকোতে। নিঃসন্দেহে উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন বিশ্বকাপের বর্ণময় ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য অধীর অপেক্ষা দেশের সীমারেখা পেরিয়ে কোটি কোটি মানুষের এক অনবদ্য, অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। শুধু ফুটবলের জন্য, প্রিয় দল, জার্সি কিংবা খেলোয়াড়ের জন্য রাতের পর রাত জাগাতেও ক্লান্তি নেই মানুষের। ফুটবল বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার দর্শক তাই ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৮-র বিশ্বকাপের মোট দর্শক ছিলেন প্রায় ৩৫৭কোটি। মাত্র আট বছর ব্যবধানে, এবার তা প্রায় ৬০০কোটি হবে বলে ফিফার পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। ‘ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা’ একটি বিশেষ গর্বের পরিচয়, যা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতের বিভেদের ঊর্দ্ধে। তবে যে আবেগের চরিত্র আন্তর্জাতিক, হৃদয়ের সেই গভীরতম অনুভূতিকে ব্যবহার করে ফুটবল হয়ে উঠেছে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থার মুনাফার মাধ্যম। এই টুর্নামেন্ট তাই এখন শুধুই ফুটবল প্রতিযোগিতার আসর নয়। বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড। ফিফা ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপ ২০২৬-এর জন্য প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের স্পনসরশিপ নিশ্চিত করেছে, যা আগের বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি। যে ফুটবলকে নিজেদের প্রাত্যহিক সংগ্রামের অংশ হিসাবে বরণ করেছিল শ্রমজীবীরা, সেই বিশ্বকাপ ক্রমশ বিপুল মুনাফার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মুনাফার চাহিদা কোথায় পৌঁছেছে, তা বলে দিচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের টিকিটের দামের হিসাব। গ্রুপ পর্বে টিকিটের দাম ভারতের মুদ্রায় হিসাবে সর্বনিম্ন প্রায় ৫৮৮২ টাকা, সর্বোচ্চ ৬০,৭৬৫টাকা। আর ফাইনাল ম্যাচে টিকিটের সর্বনিম্ন দাম প্রায় ১লক্ষ ৯৯হাজার টাকা, সর্বোচ্চ প্রায় ৬লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। আমার দেশেই, যেখানে ন্যূনতম মজুরি ৩৩৫টাকা, সেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল মোবাইলের সঙ্কীর্ণ পর্দায় দেখার জন্য অন্তত ৭৯৯টাকা সম্প্রচারকারী সংস্থাকে দিতে হচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের। অর্থাৎ তিনটি দেশের ১৬টি শহরের স্টেডিয়ামগুলির মধ্যে একটি চামড়ার গোলাকার বস্তুকে নিয়ে ২২টি খেলোয়াড়ের নৈপু্ন্যের মধ্যে শুধু এই প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ থাকে না, থাকছে না। 
গত ৯৬ বছর ফুটবলের বিস্তার ঘটেছে বিপুল। ১৯৩০-এ উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দেশ। প্রতিযোগিতা হয়েছিল মন্টেভিডিও’র একটি মাত্র স্টেডিয়ামে। উত্তর আমেরিকার ২টি, দক্ষিণ আমেরিকার ৭টি এবং ইউরোপের ৪টি দল সেবারের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। এবার প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ। ১৯৯৮ থেকে এই প্রতিযোগিতায় ৩২টি দেশকে অংশ নিতেই দেখা গেছে। এবার আছে ইউরোপের ১৬টি দল। তাছাড়া আফ্রিকার ৯টি, এশিয়ার ৮টি, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ৬টি, দক্ষিণ আমেরিকার ৬টি এবং ওশেনিয়ার ১টি দেশ আছে। এবারই প্রথম খেলার কৃতিত্ব অর্জন করেছে উজবেকিস্তান, জর্ডন, কিউরাসাও, কেপ ভার্দে। এবারের এই প্রতিযোগিতা এমন সময়ে হচ্ছে যখন আমেরিকা-ইরান সংঘর্ষ চলছে, আক্রান্ত লেবাননও। সেই ধ্বংসলীলার মাঝেই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে আমেরিকা এবং ইরান। যদি এই দুই দলই নিজের নিজের গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে তবে আগামী ৩ জুলাই ১৬দলের মধ্যে জায়গা পাওয়ার লড়াইয়ে টেক্সাসের আর্লিংটনের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে তারা একে অপরের মুখোমুখি হতে পারে—  এই হিসাবও ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহে কিছুটা মাত্রা যোগ করেছে। এর বাইরেও আছে আবেগের প্রশ্ন। সম্ভবত এই বিশ্বকাপই লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোলান্ডো, লুকা মদ্রিচের মতো খেলোয়াড়দের শেষ বিশ্বকাপ হতে চলেছে। বিশ্বকাপে হাত না ছুঁইয়েই কী শেষ হবে রোনাল্ডো কিংবা মদ্রিচের বিশ্বকাপ-অভিযান? নাকি লামিন ইয়ামালের মতো তরুণ কোনও শিল্পীর বিশ্বকাপ ধরে থাকা মুহূর্তই হয়ে উঠবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত, সেই উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৯জুলাই পর্যন্ত।

Comments :0

Login to leave a comment