Iran USA

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা, খুলতে চলেছে হরমুজ প্রণালী

আন্তর্জাতিক

দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তি চুক্তির পথে হাঁটতে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে হওয়া এই সমঝোতা অনুযায়ী, সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। সব কিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে আগামী শুক্রবার সুইৎজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে।
এই চুক্তি চলমান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার পথও খুলে দিয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সেই দেশের সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে জানিয়েছেন, এই চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। তিনি বলেন, আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে এবং তার পরবর্তী ৬০ দিন ধরে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য আলোচনা চলবে।
গারিবাবাদির দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়ন যেমন শত্রুতার অবসান, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা যাচাই হওয়ার পরই চূড়ান্ত আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে লেবানন-সহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধও অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা করেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। আমি হরমুজ প্রণালীকে টোলমুক্তভাবে খুলে দেওয়ার অনুমোদন দিচ্ছি এবং একইসঙ্গে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের জাহাজগুলো আবার চলতে শুরু করুক, তেল প্রবাহ স্বাভাবিক হোক।’
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ চলাকালীন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইন অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময় লাগবে। ফলে প্রণালীটি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে দুই দেশের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান। ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি মার্কিন সম্মান ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার। ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার। ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা। ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত। ইরানের আর্থিক সম্পদে পূর্ণ প্রবেশাধিকার। কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরানের এনপিটি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত। আলোচনাকালীন নতুন নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক মোতায়েন না করার মার্কিন প্রতিশ্রুতি। মোট ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ মুক্ত করার পরিকল্পনা। 
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চূড়ান্ত আলোচনায় মূলত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা হবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা তথাকথিত অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থনের প্রশ্ন আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।
এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব গ্রুটেস একে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনের পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে প্রস্তুত এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে।
চুক্তির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। টোকিওতে তেলের দাম ৪ শতাংশেরও বেশি কমেছে এবং জাপানের শেয়ারবাজারের সূচক নিক্কেই প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। পাল্টা জবাবে ইরান ইজরায়েল ও মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয়। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করে। দীর্ঘ উত্তেজনার পর অবশেষে এই শান্তিচুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোর নতুন আশা জাগিয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment