নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের আরএসএস-বিজেপি সরকার অলিখিতভাবে মোটামুটি ঠিকই করে রেখছে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষেত্র, বিশেষ করে তাপবিদ্যুৎ ক্ষেত্রটি মোদী ঘনিষ্ট শিল্পপতি গৌতম আদানিদের জিম্মায় তুলে দেবে। ইতিমধ্যেই অবশ্য দেশের প্রধান ও বড় বিমান বন্দরগুলি এবং সমুদ্র বন্দরগুলি আদানিদের কবজায় চলে গেছে। দেশের খাদ্য ব্যবস্থা, খাদ্য বাণিজ্য এবং খাদ্যের মজুত ভাণ্ডারও মোটামুটি আদানিদের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ মোদী জমানার ১২ বছরে মোদীর সৌজন্যে বন্ধু আদানি গোষ্ঠী ভারতের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়েছে। ফলে আগামী দিনে অর্থনীতি সংক্রান্ত যাবতীয় নীতি নির্ধারণে আদানিদের বাণিজ্যিক ও মুনাফার স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। ১২ বছর আগে মোদী যখন ক্ষমতায় আসেন তখন আদানি গোষ্ঠী ছিল গুজরাটের একটি মাঝারি মাপের সংস্থা। গত এক যুগ ধরে উল্কার গতিতে তাদের তাক লাগানো উত্থান অতীতের সমস্ত নজিরকে ম্লান করে দিয়েছে। স্বাধীনতার আগে বা পরে ভারতের আর কোনও কর্পোরেট সংস্থা এত অল্প সময়ে অতিকায় সংস্থায় রূপান্তরিত হতে পারেনি। তেমনি কোনও শিল্পপতি প্রথম প্রজন্মেই এত বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পেরেছেন ভারতে তার কোনও নজির নেই। আম্বানি গোষ্ঠী অল্প সময়ে বিশাল কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে ঠিকই তবে তাদের সাম্রাজ্যকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন মুকেশ আম্বানির বাবা ধীরুভাই আম্বানি। কিন্তু গৌতম আদানি কার্যত নিজেই নিজের কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
গৌতম আদানি এবং নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব অনেক পুরানো। বস্তুত দুই ভিন্ন ক্ষেত্রে দু’জনের উত্থান ও শীর্ষারোহন সমান্তরালাভাবে হয়েছে। মোদী যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন তখন বন্ধু আদানি নিছকই একজন ছোটখাটো ব্যবসায়ী। মোদীর কল্যাণে গুজরাটের বুকে আদানির ব্যবসা তরতর করে বেড়ে যায়। কার্যত বিনামূল্যে বিঘার পর বিঘা জমি, সহজ সুদে অঢেল পুঁজির গ্যারান্টি, নানা রকমের আর্থিক ও অন্যান্য ছাড় ইত্যাদির সুবাধে অন্যান্য প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে ভারতের শিল্পের আকাশে নতুন নক্ষত্র হয়ে উঠতে থাকে আদানি গোষ্ঠী। মোদী প্রধানমন্ত্রী হবার পর আদানি সাম্রাজ্য গুজরাটের গন্ডি পেরিয়ে সারা দেশে বিস্তার লাভ করে ঝড়ের গতিতে। রাষ্ট্রায়াত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণের সবচেয়ে সুবিধা পেয়েছে আদানিরা। দেশের প্রায় সবক’টি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন সমুদ্র বন্দর একের পর এক তুলে দেওয়া হয় আদানিদের হাতে। তেমনি দেশের বড় ও সর্বাধিক লাভজনক বিমান বন্দরগুলিও মোদী সরকার তুলে দেয় আদানিদের হাতে। জাতীয় সড়কের বিরাট অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আদানিরা। বড় বড় ব্রিজ, টানেল, সড়ক নির্মাণের বরাত জোটে আদানিদেরই কপালে। সম্প্রতি দেশের খাদ্য মজুত ভাণ্ডারের সিংহভাগ এফসিআই থেকে আদানিদের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। এবার বিদ্যুৎ ক্ষেত্রেও আদানিদের বেতাজ বাদশা বানাতে উঠে পড়ে লেগেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলি তাদের আগামী দুই-আড়াই দশকের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ কেনার যে চুক্তি করছে তার বেশিরভাগই হচ্ছে আদানিদের সঙ্গে। ডাবল ইঞ্জিনের সরকারগুলি টেন্ডার শর্তের মারপ্যাঁচে আদানিদের সঙ্গেই চুক্তি করছে। লক্ষ্যণীয় বিষয়, বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কমিয়ে অপ্রচলিত সৌর বিদ্যুতে জোর দেওয়া হলেও সরকার এখন কয়লাতেই ফিরছে। তাই নতুন নতুন কয়লাখনির মালিকানা পাচ্ছে আদানিরা। ডাবল ইঞ্জিনের সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে উঠছে আদানিদের নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সরকার আগামী ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৯৫ গিগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুতের জন্য। সন্দেহ নেই তার সিংহভাগের বরাত মিলবে আদানিদের পক্ষে।
Editorial
আদানিমুখী
×
Comments :0