MUKTADHARA | JOURNEY | GOMUKHA | AVIK CHATTERJEE | 15 AUGUST 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | ভ্রমণ | স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ | অভীক চ্যাটার্জি | ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  JOURNEY  GOMUKHA  AVIK CHATTERJEE  15 AUGUST 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

ভ্রমণ 

স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ 

অভীক চ্যাটার্জি 

১৫ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

 

দশম পর্ব

“বিফলমনোরথ” শব্দটার সঙ্গে হয়তো তখনও অতটা পরিচিত ছিলাম না, কিন্তু সেদিনের আমার মনের অবস্থাকে এর চেয়ে নিখুঁতভাবে আর কোনো শব্দই যেন প্রকাশ করতে পারে না। তেরো বছরের আমি, তখন একবুক কষ্ট আর না পাওয়ার বেদনা নিয়ে পথ চেয়ে বসে থাকলাম, বাবারা কখন ফিরবে, আর গল্প শুনবো ওখানকার। কিন্তু দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে? কিন্তু, বিধাতা আরও সাংঘাতিক নাটকের ক্লাইম্যাক্স লিখে রেখেছেন আমার কপালে। ললাটের লিখন, খণ্ডায় সাধ্য কার!

আমি যখন চুপচাপ পাথরের পাঁচিলের উপর বসে বসে আমার অদৃষ্টের কথা ভাবছি, আমার মাসী আমার পাশে এসে বললেন, "তোর বয়স আছে, তুই আবার আসতে পারবি, কিন্তু আমরা তো আর আসতে পারব না। " এই একটা কথায় আমার মাথা আউলে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি যাব। যত কষ্ট হোক, আমি যাব। যাবই!

মা যত বলে অনেক বেলা হয়ে গেছে, এখন লোক একজন দুজন করে ফিরে আসতে শুরু করেছে, আর আমরা এখন যাব! কিন্তু, আমি সিদ্ধান্তে অনড়, যাবই। শেষে সব ওজর আপত্তি নস্যাৎ করে আমরা চললাম গোমূখের উদ্দেশ্যে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা। আমরা যাব, তখন প্রায় সাড়ে নটা বেজে গেছে।

বেরিয়ে পড়ার পর আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম, পথ ধরে যে চলছি, সেটা নামেই পথ। আদতে সেটা পাথরের একটা লম্বা উপত্যকা ছাড়া কিছুই নয়। ভয়ংকর চড়াই উৎরাই, এবং আমাদের সাথে কোনো গাইড নেই। আমরা চলেছি ঠিক সেই পথটা ধরে, যে পথে লোকজন ফিরছে। আর তারা অবাক বিস্ময়ে দেখছে এখন চলেছি আমরা। উপত্যকা পেরিয়ে আরও এক ঝুরো পাহাড়। লাল পাথরের গুঁড়ো আর হাওয়ার দাপট। আমাদের হাড় হিম হচ্ছে। সেই সাথে আমার কব্জির ব্যথাটা আবার ফিরে আসছে। কিন্তু আমি আজও সেই দিনের আমির কথা ভাবলে অবাক হয়ে যাই, অবলীলায় একটা পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলাম, হয়তো এই সিদ্ধান্ত আজকের আমির নিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। আসলে সেদিন হয়তো মা আমায় বলেছিলেন এখন কেনো যাব? কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার ত্রিসীমানায় এমন কেউ ছিল না, যে আমায় বলবে, "অভীক, তুই পারবি না।" তাই সে কথা আমার মাথাতেই আসেনি।

আজ বুঝি, সেদিনই আমার রক্তে ঢুকে গেছিল ট্রেকিং, যা আজও আমায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় হিমালয়ের বন্ধুর পথে পথে।আমরা আরও মন শক্ত করে এগিয়ে চললাম সেই পাথুরে পথে, কিন্তু পথ আর শেষ হয় না।

কিন্তু এই শেষ না হওয়া পথ হঠাৎ এক মোড় ঘুরতেই শেষ হয়ে গেলো। চোখের সামনে দূরে দেখা গেলো এক ধূসর হিমবাহ। সহস্রাব্দের ধুলো জমে আছে তার গায়ে, তবুও সে স্বমহিমায় বলীয়ান। সে যে গর্ভে ধারণ করেছে আমাদের নদীমাতৃক দেশের প্রধান জলধারাকে। তার জঠর ক্রমাগত পুষ্ট করে চলেছে শস্য শ্যামলা বাংলাকে। সে   কঠিন আবহে ধীরে ধীরে যেনো মিলে গেলো রূপকথাও। যেনো দেখতে পেলাম সেই শিবের জটা, তার থেকে বেরিয়ে আসা স্রোত, আর তাকে পথ দেখিয়ে চলা ভগীরথ। আমরা দেখতে পেলাম নীল আকাশের গায়ে দুই শ্বেত তুষারাবৃত শৃঙ্গের মাঝে গরুর খোলা মুখের মত অর্ধ চন্দ্রকৃতি গিরিগহ্বর। গোমুখ।

চলবে

Comments :0

Login to leave a comment