অশোক ভট্টাচার্য
বাংলার ইতিহাসে ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যবর্তী সময়কাল ছিল এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের যুগ। এই সময়কালে বাংলা প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের কূটকৌশলের শিকার হয় এবং পরবর্তীকালে স্থানীয় শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের কারণে চূড়ান্ত বিভাজনের মুখে পড়ে। একদা যে সমাজ ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই সমাজই ক্রমশ ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে বাংলার অখণ্ডতা ধ্বংস হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিন্নমূল হয় এবং ইতিহাসে এক অমোচনীয় ক্ষতচিহ্ন রয়ে যায়। ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জির গবেষণা (Chatterji, 1994; 2007) এই প্রক্রিয়াটিকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে, দেশভাগ কোনও অনিবার্য দুর্ঘটনা নয়, বরং নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থরক্ষার সুপরিকল্পিত ফল ও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠন করেন। আসলে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার উদীয়মান রাজনৈতিক সচেতনতা ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা। ব্রিটিশ সরকার ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির মাধ্যমে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে নিষ্কণ্টক করতে চেয়েছিল (Chatterji, 1994)। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলায় যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তা ছিল অভাবনীয়। বাংলার উচ্চবর্ণের শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজ এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, প্রমুখের নেতৃত্বে আন্দোলন সর্বভারতীয় রূপ লাভ করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ও আত্মিক নেতৃত্ব প্রদান করেন। তাঁর আহ্বানে ‘রাখিবন্ধন’ ও ‘অরন্ধন’ উৎসব হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি এক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। স্বদেশি পণ্যের প্রচার এবং ব্রিটিশ পণ্য বয়কট ব্রিটিশ অর্থনীতিতে, বিশেষ করে ম্যানচেস্টারের বস্ত্রশিল্পে প্রবল আঘাত হানে। ভদ্রলোক সমাজের নিরলস প্রচেষ্টা ও ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ফলে ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় বঙ্গভঙ্গ রদ করার ঘোষণা দিতে। সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা গড়ে তুলতে সক্ষম ছিল। কিন্তু এই ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তাবাদী আদর্শ পরবর্তী চার দশকে কীভাবে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ হলো, তা অনুধাবন করতে হলে বাংলার আর্থ-সামাজিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত পরিবর্তনগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য। জয়া চ্যাটার্জির মতে, ভদ্রলোক সমাজের এই পরিবর্তন ছিল ক্ষমতা হারানোর ভয়ের প্রতিক্রিয়া (Chatterji, 1994)।
বেঙ্গল প্যাক্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
১৯২০-এর দশকে বাংলার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রাদেশিক কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করে গভীরভাবে উপলব্ধি করেন যে, বাংলার জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মুসলিম সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূলস্রোতে অন্তর্ভুক্ত না করলে স্বাধীনতা সংগ্রাম সফল হবে না। এই প্রগতিশীল চিন্তার ফসল হিসাবে ১৯২৩ সালে ঐতিহাসিক ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের জন্য ৫৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণ এবং কলকাতা কর্পোরেশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯২৪ সালের কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে স্বরাজ পার্টির বিপুল জয়ের পর দেশবন্ধু মেয়র নির্বাচিত হন এবং গরিবদের জন্য একাধিক জনকল্যাণমূলক নীতি প্রণয়ন করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতৃত্ব এই প্যাক্টকে ‘মুসলিম তোষণ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। জয়া চ্যাটার্জির গবেষণায় স্পষ্ট হয় যে, এখান থেকেই ভদ্রলোক সমাজের জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতায় পশ্চাৎ অপসরণ শুরু হয় (Chatterji, 1994)। যে সমাজ একসময় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই ক্রমশ সঙ্কীর্ণ আর্থ-সামাজিক স্বার্থরক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড) বাংলার রাজনীতিতে এক বড় ধাক্কা দেয়। আইনসভার ২৫০ আসনের মধ্যে মুসলমানদের জন্য ১১৯টি আসন সংরক্ষিত হওয়ায় ভদ্রলোক সমাজের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও ভীতি সৃষ্টি হয়। চ্যাটার্জি বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন যে, শতাব্দী ধরে জমিদারি, মহাজনি ও পেশাগত ক্ষেত্রে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য নতুন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চিরতরে বিলুপ্ত হতে চলেছিল। এই ভীতিই ছিল তাদের জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতায় স্থানান্তরের মূল অনুঘটক (Chatterji, 1994)।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে নতুন ভোটাধিকারপ্রাপ্ত দলিত হিন্দু ও মুসলিম কৃষকদের অংশগ্রহণ এবং ধর্মভিত্তিক আসন সংরক্ষণ বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। একে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগের জোট সরকার প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করলে উচ্চবর্ণের কংগ্রেস নেতারা তীব্র বিরোধিতা করেন। ড. সুরঞ্জন দাসের মতো ইতিহাসবিদদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চ্যাটার্জি দেখিয়েছেন যে, এটি মূলত শ্রেণিগত সংগ্রাম ছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
জয়া চ্যাটার্জির গবেষণার বিশ্লেষণ
জয়া চ্যাটার্জির ‘‘Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947” (1994) গ্রন্থটি বাংলার দেশভাগের ইতিহাসকে এক নতুন আলোকে উপস্থাপন করেছে। তাঁর মূল থিসিস হলো যে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য হারানোর ভয়ই বিভাজনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। ১৯৩২ সালের কমিউনাল অ্যাওয়ার্ডের পর তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ থেকে সরে গিয়ে হিন্দু মহাসভা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবি ছিল এই প্রক্রিয়ার সরাসরি ফল। অধ্যাপক সুরঞ্জন দাস তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও কৃষিজমির মালিকানার একটি বড় অংশ ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার ও জোতদার শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে। পূর্ববাংলায় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জনসংখ্যা আনুমানিক ৯ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ঔপনিবেশিক ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, ইংরেজি শিক্ষায় তুলনামূলক অগ্রগতি এবং প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধার ফলে ভূমি, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও নগর অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি।
অন্যদিকে, গ্রামীণ সমাজের বৃহত্তম অংশ—মুসলিম কৃষক এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু কৃষিজীবীরা—প্রধানত প্রজা, ভাগচাষি বা কৃষিশ্রমিক হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তারা জমি চাষ করলেও সেই জমির মালিকানা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের হাতে ছিল না। এই বৈষম্যমূলক ভূমি কাঠামো কেবল অর্থনৈতিক অসমতাই সৃষ্টি করেনি; বরং বাংলার সামাজিক সম্পর্ক, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং কৃষক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
চ্যাটার্জি যুক্তি দেন যে, দেশভাগের জন্য শুধু মুসলিম লিগ বা ব্রিটিশদের দায়ী করা ভুল। ভদ্রলোক সমাজের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া এই বিভাজন এত সহজে সম্ভব হতো না। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘‘The Spoils of Partition” (2007)-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, দেশভাগোত্তর পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। এই বিশ্লেষণ ইতিহাসবিদ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান, কারণ এটি শ্রেণি, ক্ষমতা ও পরিচয়ের জটিল সম্পর্ককে তুলে ধরে।
১৯৪৭ সালের মে মাসে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসুর অখণ্ড স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবে ভাষা ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে একটি সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব, হিন্দু মহাসভা ও ভদ্রলোক সমাজের বিরোধিতায় এটি ব্যর্থ হয়। ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার স্মৃতি হিন্দু সমাজে গভীর ভীতি সৃষ্টি করেছিল।
কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। তেভাগা আন্দোলন ও দাঙ্গা প্রতিরোধে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল সামনের সারিতে। কমিউনিস্ট পার্টি দেশভাগের ঘোর বিরোধী ছিল। তেভাগা আন্দোলনে বর্গাদাররা দুই-তৃতীয়াংশ ফসলের দাবি তোলে এবং হিন্দু-মুসলিম কৃষক ঐক্য গড়ে তোলে। দাঙ্গার সময় জ্যোতি বসু, ভূপেশ গুপ্ত প্রমুখ নেতা শান্তি কমিটি গঠন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্প্রীতি রক্ষা করেন।
বঙ্গীয় আইনসভার ভোট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান অনুসারে ২০ জুনের ভোটে পশ্চিমাংশের বিধায়করা বাংলা ভাগের পক্ষে রায় দেন। র্যা ডক্লিফ লাইন চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ করে। ফলে পাট, কাগজ ও চা শিল্প বিপর্যস্ত হয়। উদ্বাস্তু সঙ্কট ও খাদ্যাভাব দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গকে গ্রাস করে।
বাংলা বিভাগের দাবির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রবক্তা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ১৯৪৭ সালে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ভারত বিভক্ত হোক বা না হোক, হিন্দু-অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চলকে পৃথক প্রদেশ হিসাবে গঠন করা প্রয়োজন। প্রথমে এই দাবি অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উত্থাপিত হলেও পরবর্তীকালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর একটি বড় অংশও পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
বাংলার সেই সময়ের দুটি প্রধান সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল—অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ ও অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পৃষ্ঠপোষকতা ও রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি পরিচালনা করেছিল। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণআন্দোলনে তাদের উল্লেখযোগ্য বা ধারাবাহিক অংশগ্রহণের ইতিহাস দেখা যায় না। বরং ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার রাজনীতিকে উসকে দিয়ে তারা দেশভাগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
অন্যদিকে, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া দীর্ঘ সময় ধরে একটি ঐক্যবদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের বক্তব্য ছিল, বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত জনগণের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক স্বার্থের ভিত্তিতে, ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে নয়।
তবে অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসকে কেবল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাস হিসাবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একই সময়ে বাংলা প্রত্যক্ষ করেছে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের অসংখ্য গণআন্দোলন। তেভাগা আন্দোলনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার ভাগচাষি জমির ন্যায্য অংশের দাবিতে সংগঠিত হয়েছিলেন। শ্রমজীবী মানুষের ধর্মঘট, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন—বিশেষত ইউনাইটেড সেন্ট্রাল রিফিউজি কাউন্সিল (UCRC)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সংগ্রাম—বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
গবেষক জয়া চ্যাটার্জি এবং অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ১৯১১ সালে রদ করতে যে ‘ভদ্রলোক সমাজ’ তীব্র আন্দোলন করে ইংরেজদের বাধ্য করেছিল, ১৯৪৭ সালে এসে সেই একই ভদ্রলোক সমাজ ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগের পক্ষে অবস্থান নেয়। এই গবেষণা আমাদের স্পষ্ট করে দেখায় যে, বাংলা ভাগ ভদ্রলোক সমাজের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক পদক্ষেপের ফল। যে সমাজ একসময় ঐক্যের প্রতীক ছিল, তারাই নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে মাতৃভূমিকে খণ্ডিত করতে কুণ্ঠিত হয়নি। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা এই সিদ্ধান্তের মানবিক মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশভাগ বাংলার ইতিহাসে এক গভীর বেদনাময় অধ্যায়, যা আজও সম্প্রীতি, ঐক্য ও সহাবস্থানের গুরুত্ব শেখায়।
বাংলা ভাগ দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক পদক্ষেপের ফল। যে সমাজ একসময় ঐক্যের প্রতীক ছিল, তারাই নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে মাতৃভূমিকে খণ্ডিত করতে কুণ্ঠিত হয়নি। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা এই সিদ্ধান্তের মানবিক মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশভাগ বাংলার ইতিহাসে এক গভীর বেদনাময় অধ্যায়, যা আজও সম্প্রীতি, ঐক্য ও সহাবস্থানের গুরুত্ব শেখায়।
Comments :0