পশ্চিমবাংলার ইতিহাসে এই প্রথম আরএসএস-বিজেপি’র সরকার গঠনের পরপরই রীতিমতো যুদ্ধকালীন তৎপরতায় হকার ও বস্তিবাসীদের উচ্ছেদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। এতকাল মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিল কবে বাংলায় ডাবল ইঞ্জিনের সরকার হবে এবং মনের আনন্দে রেল স্টেশন, রেল চত্বর এবং রেলের পরিত্যক্ত জমিতে স্মরণাতীতকাল থেকে চলে আসা দোকান, বাজার ও মাথা গোঁজার ঠাঁইগুলি বুলডোজারের আঘাতে নিমেষে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হবে। অবশেষে সেই প্রত্যাশিত মহেন্দ্রক্ষণ এসেছে গত ৪ মে। বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর ৯ মে নতুন বিজেপি সরকারের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরই বুলডোজার চলে যায় নিউ মার্কেটে হকার উচ্ছেদে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেবার আগেই কার নির্দেশে একাজ হয় আজও জানা যায়নি। তবে অত্যুৎসাহী বিজয়ী নেতাদের উদ্যোগে যে এই চরম বেআইনি কাজ হয়েছে সন্দেহ নেই। অতপর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বুলডোজার পাঠিয়ে দেওয়া হয় তিলজলা এলাকায় বেআইনি বাড়ি ভাঙার জন্য। প্রধানত বামপন্থীদের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রবল প্রতিরোধে রণে ভঙ্গ দিতে হয় সরকারকে।
পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে শুভেন্দু সরকার ব্যাটন তুলে দেয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। তারপরই প্রবল বিক্রমে হাজার হাজার রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে মোদী সরকার যুদ্ধে নামে দরিদ্র হকার ও বস্তিবাসীদের বিরুদ্ধে গভীর রাতে রেল স্টেশন এলাকা ঘিরে ফেলে বুলডোজার নামিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে থাকে দিন এনে দিন খাওয়া গরিব হকারদের দোকানগুলি। নিমেষে হকারদের পরিবারের মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় ভাতের থালা। এই অসহায় গরিব মানুষগুলির পাশে দাঁড়ায় সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বামপন্থীরা। রাত জেগে পাহারা দেওয়া, বুলডোজারের সামনে বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া থেকে শুরু করে পুলিশের মার খেয়ে হাসপাতালে যাওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া ইত্যাদি চলতে থাকে মাসাধিককাল ধরে।
দাবি একটাই যে মানুষগুলো আর কোনও কাজ না পেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে রেলে হকারি করতে বাধ্য হয়েছে তাদের এভাবে কুকুর-বেড়ালের মতো তাড়ানো যায় না। একটা গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত সরকারের দায়বদ্ধতা দেশের নাগরিকদের রোজগারের বন্দোবস্ত করা। সেটা না করে তাদের মুখের গ্রাস কাড়ার কোনও অধিকার কোনও সরকারের থাকতে পারে না। রেলের প্রয়োজনে জমি খালি অবশ্যই হবে। কিন্তু যে জায়গায় যুগযুগ ধরে অসংখ্য পরিবার ছোটখাট দোকান চালিয়ে সংসার চালায় তাদের বানের জলে ভাসিয়ে দিয়ে জায়গা খালি করা যায় না। নির্বাচিত সরকার দানবিক হয় না মানবিক হয়।
তাই সাদা কাগজে দুই লাইন লিখে সারা রাজ্যের কয়েক লক্ষ পরিবারকে ভিটে-মাটি ছাড়া, রুজিহারা করা যায় না। সরকারের কাজ মানুষের রুজি কাড়া নয় রুজির বন্দোবস্ত করা। মানুষকে মাথা গোঁজার ঠাঁই থেকে উচ্ছেদ করে গাছতলায় বসানো নয়, তাদের আশ্রয় দেওয়া। হতে পারে রেলের জমি কিন্তু যুগযুগ ধরে গরিব মানুষ সেই জমির কল্যাণে কোনও রকমে খেয়েপরে বেঁচে আছেন। তাদের সরাতে হলে আইনি পথে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগতে হবে। মনে রাখতে হবে হকার, বস্তিবাসীরা গরিব হতে পারে। কিন্তু তারাও মানুষ। এই দেশের নাগরিক। বড়লোকদের মতো সমান নাগরিক ও মানবিক অধিকার তাদেরও আছে। বেছে বেছে গরিবের অধিকার হরণ, তাদের রুজি, মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিয়ে পথে বসানো যায় না। এটা সংবিধান বিরুদ্ধ, বেআইনি। আদালত এইভাবেই উচ্ছেদ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। বলেছে যা করার আইন মেনেই করতে হবে।
Comments :0