আইডিবিআই ব্যাঙ্কের মতো একটি লাভজনক ব্যাঙ্কের সরকারি শেয়ার যেভাবে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংস্থার কাছে বিক্রি করা হয়েছে, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক আগেই সৃষ্টি হয়েছিল। এখন এই প্রক্রিয়াতে যে ব্যাপক বেনিয়ম হয়েছে, তার কিছু তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। গত অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটি আইডিবিআই ব্যাঙ্কের ৬০.৭২শতাংশ শেয়ার (সরকারের ৩০.৪৮শতাংশ এবং এলআইসি-র ৩০.২৪শতাংশ) কানাডা-ভিত্তিক ফেয়ারফ্যাক্স ফাইন্যান্সিয়াল হোল্ডিংসের কাছে ৫২,৮৭৮ কোটি টাকায় (প্রতি শেয়ার ৮১ টাকা মূল্যে) বিক্রি করার অনুমোদন দেয়। এই চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার পরই নিয়ম লঙ্ঘন এবং কম মূল্যে ব্যাঙ্ক বিক্রির গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।
দুর্নীতির মূল অভিযোগগুলো কী কী? সংবাদমাধ্যম ‘বিজনেস ওয়ার্ল্ড’-এর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে যে মূল বিষয়গুলি সামনে এসেছে, তা হলো নিয়ম বদল ও গোপন মূল্য ফাঁসের অভিযোগ। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র খোলার আগেই সরকারের তরফ থেকে ব্যাঙ্কের ন্যূনতম বিক্রয় মূল্য বা ‘রিজার্ভ প্রাইস’ নির্ধারণ করার কথা। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের পূর্বনির্ধারিত রিজার্ভ প্রাইস ছিল প্রতি শেয়ার ৯৪.৪২ টাকা। কিন্তু ফেয়ারফ্যাক্স প্রতি শেয়ার ৮১ টাকা দর দিলে, কর্মকর্তারা নিয়মবহির্ভূতভাবে সেই দরপত্রটি আগে দেখেন এবং পরবর্তীতে রিজার্ভ প্রাইস কমিয়ে ৭৫.৯৯ টাকা করে দেন, যাতে ফেয়ারফ্যাক্সের কম দামের দরপত্রটি সহজেই অনুমোদিত হয়ে যায়। অর্থ মন্ত্রকের অধীন ডিপার্টমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (ডিআইপিএএম)-এর ১০ পাতার অভ্যন্তরীণ নোটে এই প্রক্রিয়ায় একাধিক বেনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। নোট অনুযায়ী, আইডিবিআই’র শেয়ার পিছু প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৪.৪২ টাকা। কিন্তু ফেয়ারফ্যাক্সের সংশোধিত দরপত্র খোলার পর নতুন করে মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই মূল্যায়নে শেয়ারের দাম কমিয়ে আনা হয় ৭৫.৯৯ টাকায়। ফেয়ারফ্যাক্সের প্রস্তাবিত দর ছিল শেয়ারপিছু ৭৫ টাকা। অর্থাৎ, প্রথমে নির্ধারিত মূল্য থেকে অনেকটাই কমিয়ে কার্যত সংস্থাটির প্রস্তাবের কাছাকাছি দরেই ব্যাঙ্ক বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং সিপিআই (এম) সাংসদ জন ব্রিটাস এই তথ্য সামনে আসার পর কেন্দ্রের বিলগ্নিকরণ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সম্পদ দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের কথা। অথচ মোদী সরকার তা কর্পোরেট সংস্থার হাতে জলের দরে তুলে দিচ্ছে। তাঁর দাবি, আইডিবিআই’র শেয়ারের দাম কমিয়ে কানাডার সংস্থা ফেয়ারফ্যাক্সের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। দরদাতার প্রস্তাব জানার পর শেয়ারের মূল্য কমিয়ে দেওয়া নজিরবিহীন ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন জন ব্রিটাস।
সরকারের তরফে এই বিক্রিকে দেশে বিদেশি বিনিয়োগের সাফল্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও দরপত্রের গোপনীয়তা, মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং কার্যত প্রতিযোগিতাহীন অবস্থায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব এখনও মেলেনি। লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হলো, আর কেন ক্রেতার প্রস্তাব জানার পরই সেই মূল্য কমানো হলো—ডিআইপিএএমের নোট সামনে আসার পর এই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।
ইতিমধ্যেই এই বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আইডিবিআই ব্যাঙ্কের অফিসার ও কর্মচারীদের সংগঠন ইউনাইটেড ফোরাম অব আইডিবিআই অফিসার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজ এই বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে এটি অবিলম্বে স্থগিত রাখার এবং সংসদীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে। দেশজুড়ে এই ব্যাঙ্কে দু’দিনের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে ফোরামের পক্ষ থেকে। সবকটি ব্যাঙ্ক কর্মচারী ও আধিকারিকদের আন্দোলনের যৌথ মঞ্চ ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস-এর পক্ষ থেকে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের কর্মীদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানানো হয়েছে। ফোরাম বলেছে, দেশের প্রাক্তন অর্থ মন্ত্রী যশবন্ত সিং সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের সরকারি শেয়ার কখনও হ্রাস করা হবে না। সে ক্ষেত্রে এই ঘটনা দেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
IDBI Disinvestment
আইডিবিআই ব্যাঙ্ক বিক্রিতে চরম বেনিয়ম
×
Comments :0