নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ তুলে দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া মঞ্চের সমাবেশ। ইতিমধ্যে সমাবেশের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যাচ্ছেন বিরোধী নেতারা। অন্যদিকে, ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসকে নিশানা করে বিজেপির পাল্টা কর্মসূচি। দুই রাজনৈতিক শিবিরের কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার। যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ও রাস্তা বন্ধ থাকার আশঙ্কায় দীপাবলির আগে উৎসবের মরশুমে ব্যবসায় বড়সড় ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দিল্লির ব্যবসায়ীরা।
রবিবার দিল্লিতে মুখোমুখি দুই রাজনৈতিক শিবিরের কর্মসূচি। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ইন্ডিয়া মঞ্চের পক্ষ থেকে ‘চলো দিল্লি’ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। রামলীলা ময়দানে আয়োজিত এই কর্মসূচি থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হবে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা।
এই কর্মসূচিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি, দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ একাধিক বিরোধী নেতা উপস্থিত। রামলীলা ময়দানের বাইরে ইতিমধ্যেই মিছিলের সমর্থনে পোস্টার পড়েছে। ছাত্র সংগঠন এসএফআই -সহ বিভিন্ন সংগঠনও কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
শনিবার বিরোধীদের একটি কর্মসূচিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ছ'দফা অভিযোগ-সহ প্রতীকী প্রস্তাব পেশ করেন মল্লিকার্জুন খাড়গে। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর ষড়যন্ত্র করছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তালিকা থেকে ১৩.২ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সংসদীয় নজরদারি ছাড়াই ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন এবং ECINET-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার অভিযোগও তুলেছে বিরোধীরা। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে কার্যত বাইরে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সংবাদপত্র ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছে বিরোধীরা।
যদিও বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে কটাক্ষ করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা একে ‘নাটক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ, এই ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বিরোধীরা। নাড্ডার কথায়, গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান দেখাচ্ছে ইন্ডিয়া মঞ্চ। তিনি বলেন, বিরোধীদের এই কর্মসূচি আসলে রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ ছাড়া কিছু নয়।
অন্যদিকে, রবিবারই পশ্চিম দিল্লিতে পাল্টা কর্মসূচি নিয়েছে বিজেপি। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহতদের স্মরণে এই মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে বিজেপির অভিযোগ, দাঙ্গার বর্ষপূর্তির দিনেই বিরোধীরা রাজনৈতিক কর্মসূচি করছে। হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত বিজেপির এই মিছিল হওয়ার কথা। উপস্থিত থাকার কথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্র, এইচ এস ফুলকা, মনজিন্দর সিং সিরসা এবং বিজেপি সাংসদ বাঁসুরি স্বরাজের।
মিছিলের আগে গুরদ্বার শহিদগঞ্জ সাহিবে দাঙ্গার ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার কথা বিজেপি সাংসদ বিক্রমজিৎ সিং সাহনির। হিংসায় নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং জীবিত আক্রান্তদেরও এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা।
দুই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ব্যাপক কড়াকড়ি করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, সিআরপিএফ এবং র্যা পিড অ্যাকশন ফোর্স মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। শুধু রামলীলা ময়দান এবং সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন রয়েছেন ৪ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী। মিন্টো ব্রিজ থেকে রামলীলা ময়দান পর্যন্ত মিছিলের রুটেও বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড, সুপ্রিম কোর্ট এবং নির্বাচন কমিশনের দফতরের আশপাশে বহুস্তরীয় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মধ্য দিল্লির একাধিক রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও পথ পরিবর্তন করা হচ্ছে। আগাম যাতায়াতের পরিকল্পনা করে বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সাধারণ মানুষকে।
দিল্লি পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক রোহিত রাজবীর জানিয়েছেন, গোটা এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে। আয়োজকদেরও নিজস্ব কন্ট্রোল রুম রয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত মাসে ১ নভেম্বরের এই কর্মসূচির ঘোষণা করেছিলেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল। ‘চলো দিল্লি, ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগান দিয়ে তিনি এই আন্দোলনকে নির্বাচনী কারচুপি রোখার কর্মসূচি বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তার অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। রাহুল গান্ধী নির্ভয়ে এই প্রশ্নগুলি তুলে ধরছেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে পারে দিল্লির ব্যবসায়ীদের উপর। দীপাবলির আগে উৎসবের মরশুমে এমনিতেই বাজারে কেনাকাটার চাপ থাকে। তার মধ্যে রাস্তা বন্ধ, যানজট এবং নিরাপত্তার কড়াকড়িতে ক্রেতাদের আনাগোনা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট এবং কাশ্মীরি গেটের ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন।
অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারাং জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারকে তাঁরা সম্মান করেন। কিন্তু প্রতিবাদের স্থান ও সময় নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। তার বক্তব্য, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই, তারা কোনও প্রতিবাদের বিরোধীও নন। কিন্তু উৎসবের মরশুমে এই ধরনের কর্মসূচি ব্যবসার ক্ষতি করতে পারে।
নারাংয়ের দাবি, প্রতিবাদস্থল থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট এবং কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। এই ধরনের বড় মিছিল হলে দিল্লির বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাধারণত তিন দিন আগে এবং তিন দিন পর পর্যন্ত দিল্লিতে আসতে চান না। ফলে পাইকারি ব্যবসায় বড় প্রভাব পড়ে।
অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি রবীন্দর সিং কোহলির কথায়, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিকরা। কুলি, মালবাহক এবং ঠেলাগাড়ি চালকদের দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকার উপর নির্ভরশীল। একদিন কাজ বন্ধ থাকলেই তাদের পরিবারের রোজগারে টান পড়বে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ধরমপাল রাত্রার অনুমান, ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
যদিও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তার বক্তব্য, প্রতিবাদ, মিছিল ও সভার পাশাপাশি দিল্লিতে কেনাকাটাও করতে পারেন কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া মানুষ। তাতে ব্যবসায়ীদেরই লাভ হবে। তার দাবি, এই মিছিলের কারণে ব্যবসায়ীদের কোনও ক্ষতি হবে না। বিজেপিই ভয় পেয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিরোধীদের আন্দোলন, ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা নিয়ে বিজেপির পাল্টা কর্মসূচি এবং উৎসবের মরশুমে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ এই তিনের সংঘাতে রবিবার কার্যত অবরুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা রাজধানী দিল্লিতে। যন্তর মন্তর এবং নির্বাচন কমিশনের দফতরের বাইরে জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে গোটা রাজধানীতেই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
INDIA Alliance
দিল্লিতে ইন্ডিয়ার পাল্টা বিজেপির মিছিল, নিরাপত্তার কড়াকড়ি দিল্লিতে
×
Comments :0