ভ্রমণ
স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ
অভীক চ্যাটার্জি
মুক্তধারা / ৪র্থ বর্ষ / ১৮ জুলাই ২০২৬
ষষ্ঠ পর্ব
হরশীল থেকে গঙ্গোত্রীর দূরত্ব যদিও পঁচিশ কিলোমিটারের মতো, কিন্তু রাস্তা খারাপ হওয়ার জন্যে সেখানে পৌঁছতে লেগে যায় প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি। তবে রাস্তা ঢাকা পাইন দেওদারের স্নিগ্ধ ছায়ায়। গাছের নিচে শেওলা জমে উঠেছে, তার মধ্যে জন্মেছে মস। পাহাড় কেটে বানানো রাস্তা,পাহাড়ি দেওয়ালে জল চুইয়ে নেমেছে। তাতে জমেছে সুদৃশ্য ফার্ন। শেওলা, ইউক্যালিপটাস, জলের সোঁদা গন্ধ মিলে চারিদিকে এক অদ্ভুত আবহ নির্মাণ করেছে। এই পাহাড় অরণ্যের মাঝে এ গন্ধ খুব মানানসই।
গঙ্গোত্রী উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার এক পবিত্র তীর্থস্থান, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,১৭০ ফুট (৩,১০০ মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত। হিন্দু ধর্মে এটি চারধামের অন্যতম এবং বিশ্বাস করা হয়, এখানেই রাজা ভগীরথের তপস্যায় সাড়া দিয়ে মা গঙ্গা স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। সেই স্মৃতিতেই ভাগীরথী নদীর তীরে গড়ে উঠেছে গঙ্গোত্রী মন্দির।
বরফে ঢাকা হিমালয়, দেওদার ও পাইন বন, আর গর্জন করতে থাকা ভাগীরথী নদী—সব মিলিয়ে গঙ্গোত্রী এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলনভূমি। এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের গোমুখের ট্রেক।
সকাল সাড়ে দশটা নাগাত আমরা পৌঁছই গঙ্গোত্রী। এখানে বেশ কিছু কাজ আছে আমাদের। প্রথমত একটা গাইড জোগাড় করতে হবে, যে আমাদের কুলির কাজও করবে। আর তার সাথে দরকার বন দপ্তরের পারমিট,কারণ এই পথ চলে গঙ্গোত্রী জাতীয় অরণ্যের মধ্যে দিয়ে।
একটা হোটেলে ব্যাগ রেখে আমি আর বাবা বেরোলাম গাইড ঠিক করতে। মেসোমশাই একটু বিশ্রাম নিতে হোটেলেই মা ও মাসীদের সাথে থেকে গেলেন। গঙ্গোত্রী বাসস্ট্যান্ডের কাছেই রয়েছে গাইডদের জটলা, যেখান থেকে আমরা এক ভদ্রলোক কে ঠিক করলাম, যিনি আমাদের একটা রুকস্যাক নিয়ে যাবেন, আর পথ দেখাবেন তিন দিনের জন্য। কথা হলো তিনি আমাদের প্রথম দিন নিয়ে যাবেন ভুজবাসা, যেখানে আমরা লালবাবার আশ্রমে থাকব রাতে। তার পরদিন ভোর বেলায় বেরোবো গোমুখ এর উদ্দেশ্যে। তার পর ফিরে আসবো আবার ভুজবাসায়। তারপর তৃতীয় দিন আমরা ফিরে আসবো গঙ্গোত্রী।
এর পর আমরা চললাম বন দপ্তরের অফিসের দিকে। পারমিট জোগাড় করতে হবে আমাদের। সবার পরিচয় পত্র দেখে ও কপি জমা করে পারমিট পাওয়া গেলো। আমরা ফিরে আসলাম যখন হোটেলে, তখন দুপুরে খাবার সময় হয়ে গেছে। আমরা সবাই মিলে খেতে চললাম পাশের একটা ছোট্ট গুমটি হোটেলে।
সেখানে আমাদের আলাপ হলো আরও একটি বাঙালি ট্রেক গ্রুপের সাথে। তারা চলেছে কেদার তাল দেখতে। গঙ্গোত্রী থেকে শুরু হওয়া এই ট্রেকটি করার ইচ্ছে আমার আজও আছে।ওনারা চারজন ভারী মিশুকে। আমার বড্ড ভালো লেগে গেলো ওনাদের। ওনাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, উনি ভারী মজার কথা বলতেন, আমার মনে পড়ে।
বিকালটা ওনাদের সাথে গল্প করতে করতেই কেটে গেলো। সন্ধ্যা নামতে থাকলো গঙ্গোত্রীতে। আমরা সোজা তাকিয়ে শেষ সূর্যের লাল আলোয় হিমালয়ের রূপে বিমোহিত হয়ে গেলাম। ভাগীরথীর গর্জনে, ঠান্ডা হাওয়ায় আর ছোট ছোট দোকানের কুপির আলোয় জেগে উঠল ছোট্ট জনপদ। আমরা দেখলাম রাতের গঙ্গোত্রী।
রাতে পাহাড়ের উপরে মানুষ খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। আমরা সাড়ে আটটা নাগাত খেয়ে হাঁটতে বেরোলাম। শব্দ বলতে শুধুই ভাগীরথীর নিরবচ্ছিন্ন গর্জন, যা এই ভয়ঙ্কর নীরবতাকে ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে। বাতাসে পাহাড়ি বুনো গন্ধ, হাড় হিম করে দেওয়া ঠান্ডা হাওয়ায় আমরা হেঁটে চলেছি হিমালয়ের পথে। দূরের পাইনের বন আর দেখা যায় না। এক রাস কালো অন্ধকার যেনো জমাট বেঁধে রয়েছে পাহাড়ের গায়ে। রাস্তার পাশে কয়েকজন আগুন জ্বেলে তার তাপে শরীর সেকে নিচ্ছে। কেউ দূরে অজানা ভাষায় কিছু বকাবকি করছে। এক অদ্ভুত ঝিম ধরানো আবহাওয়া চারিদিকে। একটু ঘুরে এবার আমরা ফিরে চললাম হোটেলের পথে। কাল ভোরে উঠে গঙ্গোত্রী মন্দিরে পুজো দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হবে।
চলবে
Comments :0