Krishak Sabha

১০ আগস্ট দেশজুড়ে 'জেল ভরো' আন্দোলনের ডাক কৃষক সভার

রাজ্য জেলা

সারা ভারত কৃষক সভার ৯০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ময়নাগুড়িতে আয়োজিত জলপাইগুড়ি জেলা কৃষক সভার কর্মীসভায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের জনবিরোধী নীতি, কৃষি সংকট এবং লাগামছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন কৃষক সভার রাজ্য সম্পাদক পরেশ পাল। তিনি কৃষি সংকট, সার ও বীজের কালোবাজারি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জ্বলন্ত ইস্যু তুলে ধরে আগামী ১০ অগস্ট দেশজুড়ে সর্ববৃহৎ আন্দোলন ও 'জেল ভরো' কর্মসূচির জোরালো ডাক দিয়েছেন।
রাজ্যের অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটের পরিসংখ্যান টেনে তিনি বলেন, ৩৬ হাজার কোটি টাকা অন্নপূর্ণা যোজনায় বরাদ্দের কথা বলা হলেও তা দিয়ে প্রতিশ্রুতি মতো ১ কোটি ৩৩ লক্ষ মা-বোনকে ৩০০০ টাকা করে দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪৫০ টাকায় গ্যাস দেওয়ার কথা থাকলেও এখনও সাধারণ মানুষ গ্যাস কিনতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, সারের বাজারে লাগামছাড়া কালোবাজারি—এমআরপি-র চেয়ে বেশি দামে কৃষকরা সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ রাজ্য ও কেন্দ্রের  প্রশাসন এ নিয়ে সম্পূর্ণ নিরুত্তাপ!
গ্রামবাংলার অর্থনীতির বেহাল দশা তুলে ধরে রাজ্য সম্পাদক বলেন, ভারতের ১৪২ কোটি মানুষের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষ গ্রামে বাস করেন। যার ৮০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বর্তমানে কৃষি সম্পূর্ণ অলাভজনক পেশায় পরিণত হওয়ায় কোনো কৃষক পরিবারের সন্তান আর কৃষক হতে চাইছে না।
এরই মধ্যে বিজ্ঞানীরা আগামী ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ব্যাপক খরার পূর্বাভাস দিয়েছেন। বৃষ্টিহীন পরিস্থিতিতে সাধারণ কৃষক ও অন্নদাতাদের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ধানের দাম নেই, আলু চাষিরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, পাটের ন্যায্যমূল্য মেলানো তো দূরের কথা, ফসল ওঠার সময় সরকার বা মাণ্ডি থেকে ধান, আলু বা পাট কেনা হয় না।
কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের দ্বিচারিতা আক্রমণ করে পরেশ পাল বলেন, ডক্টর স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী উৎপাদন খরচের সঙ্গে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বেশি যোগ করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেওয়ার কথা ছিল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার আগে এই প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে কেন্দ্র সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানায় যে তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
একইভাবে রাজ্যে বিজেপি সরকারের নির্বাচনী সংকল্পপত্রে ৩১০০ টাকায় ধান কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও বিরোধী শিবিরের নেতারা নির্বাচনী জনসভায় এই কথা জোর গলায় প্রচার করলেও, বাস্তবে তা রক্ষা করা হয়নি। বিধানসভায় বড় বড় কথা বলা হলেও কার্যক্ষেত্রে ২৪৪১ টাকার সঙ্গে মাত্র ২০০ টাকা যোগ করে এক কুইন্টাল ধানও সমবায় বা মণ্ডি থেকে কেনা হয়নি। আলু চাষিদের জন্য ২০০ টাকা অতিরিক্ত দেওয়ার কথা বলা হলেও তা এ বছরের জন্য প্রযোজ্য নয়, যা কৃষকদের সঙ্গে এক ধরণের প্রতারণা।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরেশ পাল বলেন,বিগত ১৫ বছরের আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের পরে রাজ্যে এক উগ্র সাম্প্রদায়িক, কর্পোরেটপন্থী ও কর্তৃত্ববাদী শক্তির উদয় হয়েছে। সরকার সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে গৈরিকীকরণের চক্রান্ত চালাচ্ছে।
তিনি তরুণ প্রজন্মের সংগ্রামের উদাহরণ টেনে বলেন,গত কয়েকদিন ধরে দিল্লিতে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। বিগত ১০ বছরে সর্বভারতীয় স্তরে ১৫২টি কেন্দ্রীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। শিক্ষা থেকে শুরু করে কৃষি—সর্বত্র এই জঞ্জাল তৈরি হয়েছে।
সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দ হুসেন বলেন,"কী পরিমাণ লুট! আর আমাদের দেশের সরকারের এই লুটটা যাতে নিশ্চিত করতে পারে, তার জন্য সরকার সমস্ত সারের কারখানা গুলোকে বন্ধ করে দিয়ে, কৃষকের সারের ভর্তুকি কমিয়ে দিয়ে, বেসরকারি কোম্পানি গুলোর হাত থেকে, বীজ কিনে কৃষকদের চাষ করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণবঙ্গে চাষের সময় ১২০০ টাকার বীজের দাম বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ লুটের কারণে দেশি ও বিদেশি পুঁজি যত কৃষির ভেতরে ঢুকছে, কৃষক তত গরিব হচ্ছে।
সভা থেকে কৃষক, খেতমজুর, শ্রমিক ও বস্তিবাসীদের জীবন-জীবিকার দাবিতে আগামী ১০ আগস্ট দেশজুড়ে আইন অমান্য ও 'জেল ভরো' আন্দোলন সফল করার আহ্বান জানানো হয়। প্রতিটি জেলা ও মহকুমায় এই কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি সংবিধান ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সর্বস্তরের মেহনতি মানুষকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জেলা সভাপতি আশীষ সরকার কর্মী সভায় সভাপতিত্ব করেন। কৃষক সভার রাজ্য সম্পাদক পরেশ পাল, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দ হুসেন, জেলা সম্পাদক প্রাণগোপাল ভাওয়াল, সলিল আচার্য, জিতেন দাস সহ জেলা নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন।

Comments :0

Login to leave a comment