কয়েক মাস আগে দেশের বেকার ছাত্র-যুবদের পরজীবী আখ্যা দিয়ে ককরোচ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন এদের কোনও কাজ নেই বসে বসে শুধু সোশাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ পোস্ট করে। সংবিধানের রক্ষক দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির এহেন অসংবেদনশীল অপমানজনক এবং বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যে দেশের ছাত্র-যুব সমাজ চরম ব্যথিত ও অপমানিতবোধ করেন। গোটা দেশ থেকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমালোচনার ঝড় ওঠে। অভিজিৎ দীপকে তার এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন ‘এই আরশোলারাই যদি সকলে জোট বাঁধে তাহলে কেমন হয়’। কয়েক দিনের মধ্যেই তাতে সাড়া দেয় লক্ষ লক্ষ মানুষ। তারপরই দীপকে তৈরি করেন ককরোচ জনতা পার্টি নাম দিয়ে সোশাল মিডিয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম। দাবানলের মতো তাকে সমর্থনের সংখ্যা ছড়িয়ে পড়ে।
সেই ককরোচ পার্টিই প্রধানত নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে বিপুল জনমত তৈরি করে সশরীরে রাস্তায় নামে এই সব পরীক্ষার পরিচালক সংস্থা এনটিএ তুলে দেবার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে সামনে রেখে। দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হয় আমরণ অনশন ও অবস্থান-বিক্ষোভ কর্মসূচি। আন্দোলনেরই শীর্ষ তরঙ্গে জনজোয়ারে দিল্লির রাজপথ ভেসে যায় সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে। এমন অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয় জনজোয়ার নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনের নতুন ইতিহাস রচনা করে। দিল্লি এবং আশপাশের এমনকি বিভিন্ন রাজ্যের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার তাগিদে ছুটে এসেছে প্রতিবাদ জানাতে। ছাত্র-যুবদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাদের অভিভাবক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী সহ সমস্ত অংশের মানুষ।
এমন শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে মোদী-শা’র নির্দেশে দিল্লি পুলিশ আধা সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে হিংস্রতার বদ্ধভূমিতে পরিণত করেছে। দেশের শিক্ষিত, মার্জিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এভাবে হিংস্র হায়নার মতো পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে সেটা কারও কল্পনাতেও ছিল না। পরবর্তী ঘটনা থেকে পরিষ্কার পুলিশ আগে থেকে পরিকল্পনা করেই ছাত্র-যুবদের উপর চরম অত্যাচার ও নিপীড়ন নামিয়ে আনার ষড়যন্ত্র ছকেছিল। তার অঙ্গ হিসাবে পুলিশের লাঠি হাতে এবিভিপি, বজরঙ দল, ভিএইচপি দুষ্কৃতীদের মোতায়েন করা হয়েছিল প্রতিবাদীদের পেটানোর জন্য। এদের কোথাও দেখা গেছে সাদা পোশাকে, কোথাও ব্যাজ ছাড়া ইউনিফর্মে, কোথাও আবার জুতো ছাড়া হাওয়াই চপ্পলে। নৃশংসতা ও বর্বরতার নমুনা হিসাবে লাঠির মাথায় লাগানো হয় বড় পেরেক, যাতে এক ঘায়ে মৃত্যুর মুখে চলে যায়। তেমনি বিদ্যুৎযুক্ত লাঠি ব্যবহার করা হয়েছিল। পুরুষ পুলিশ ছাত্রদের সঙ্গে চূড়ান্ত কদর্য, নোংরা, অসভ্য ও বর্বর আচরণ করেছিল। অসংখ্য ভিডিও-তে সেই শিউরে ওঠা দৃশ্য মানুষের হাতে ঘুরছে।
আইনজীবীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নিরীহ ছাত্র-যুবদের উপর দিল্লি পুলিশের বর্বরতায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের হস্তক্ষেপের আরজি জানিয়েছিলেন। অত্যন্ত বিস্ময়কর ও দুর্ভাগ্যের প্রধান বিচারপতি আরজি নাকচ করে দেন। আইনজীবীরা ভিডিও দেখাতে চাইলে তিনি জানিয়ে দেন তাঁরই আখ্যা দেওয়া ককরোচদের উপর নৃশংস বর্বরতার ভিডিও দেখে নষ্ট করার মতো সময় তাঁর নেই। এই না হলে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সংবিধান রক্ষক প্রধান বিচারপতি! দেশের প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব নাকি এই বিচারপতিদের হাতে।
Editorial
বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রধান বিচারপতি
×
Comments :0